প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ পাঁচ বছরের লড়াই শেষে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার স্বপ্ন দেখছিলেন উপস্থাপক ও অভিনেত্রী সামিয়া আফরিন। কিন্তু সেই স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথেই আবারও কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। মাত্র তিন মাস আগে তাঁর শরীরে দ্বিতীয়বারের মতো ম্যালিগন্যান্ট ধরা পড়েছে। এবার আক্রান্ত হয়েছেন ওভারিয়ান ক্যান্সারে। দ্রুত অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকদের পরামর্শে বর্তমানে কেমোথেরাপি নিচ্ছেন তিনি।
রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন পোস্টে নিজের বর্তমান শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসার কথা জানান সামিয়া। একই সঙ্গে জীবনের কঠিন এই সময়ে কীভাবে নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করছেন, সেই কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় চুল পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও সেটিকে নিয়ে ভেঙে না পড়ে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই অভিনেত্রী।
সামিয়া জানান, তিন মাস আগে চিকিৎসা পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁর শরীরে দ্বিতীয়বারের মতো ম্যালিগন্যান্ট শনাক্ত হয়। এরপর দ্রুত অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকেরা জানান, এটি হাই-গ্রেড কার্সিনোমা। ফলে পরবর্তী চিকিৎসার অংশ হিসেবে তাঁকে কেমোথেরাপি নিতে হচ্ছে। ক্যান্সারের চিকিৎসায় এর আগে যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি গেছেন, এবারের পরিস্থিতি তাঁর জন্য অনেকটাই আলাদা।
ক্যান্সারের সঙ্গে সামিয়ার লড়াই অবশ্য নতুন নয়। প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি এই কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। ২০২২ সালের দিকে প্রথমবার তাঁর শরীরে ক্যান্সার শনাক্ত হয়। পরবর্তী পরীক্ষায় রোগটি চতুর্থ স্টেজে রয়েছে বলে জানতে পারেন তিনি। তখন দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসা নিতে হয়েছে তাঁকে। প্রায় দুই বছর চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ পান সামিয়া।
প্রথমবার ক্যান্সার ধরা পড়লেও সে সময় তাঁকে কেমোথেরাপি নিতে হয়নি। ইমিউনোথেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা নিয়েছিলেন তিনি। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা তাঁর জীবন ও দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন এনেছিল। কঠিন চিকিৎসা, অনিশ্চয়তা এবং সুস্থ হয়ে ফেরার দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর সামিয়া ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগও নেন। একটি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ক্যান্সার রোগীদের সহায়তা ও সচেতনতা তৈরির কাজের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি।
কিন্তু এবার নতুন করে ম্যালিগন্যান্ট শনাক্ত হওয়ার খবর তাঁর জন্য নিঃসন্দেহে কঠিন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর আবারও ক্যান্সারের চিকিৎসায় ফিরতে হয়েছে তাঁকে। তবে সামিয়ার সাম্প্রতিক বক্তব্যে হতাশার চেয়ে মানসিক দৃঢ়তার প্রকাশই বেশি দেখা গেছে। তিনি বুঝতে পারছেন, চিকিৎসার এই পর্যায়ে কিছু শারীরিক পরিবর্তন আসবে এবং সেগুলোকে ভয় না পেয়ে বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করাই তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কেমোথেরাপির কারণে চুল পড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে সামিয়া জানিয়েছেন, চিকিৎসক তাঁকে এ বিষয়ে আগেই সতর্ক করেছেন। কিন্তু চুল পড়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে মন খারাপ করে থাকতে চান না তিনি। বরং জীবনের এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ক্যান্সারের চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত মানুষের জন্য চুল পড়ে যাওয়া অনেক সময় শুধু শারীরিক পরিবর্তন নয়, মানসিকভাবেও বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে অভিনয় ও উপস্থাপনার মতো পেশায় যাঁদের নিয়মিত জনসমক্ষে থাকতে হয়, তাঁদের জন্য চেহারার দৃশ্যমান পরিবর্তন আরও সংবেদনশীল বিষয় হতে পারে। সামিয়া সেই জায়গাতেও নিজের মানসিক শক্তির পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, বাহ্যিক পরিবর্তনের চেয়ে এখন তাঁর কাছে চিকিৎসা শেষ করে সুস্থ জীবনে ফিরে আসাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সামিয়া বলেন, ক্যান্সারের লড়াই কতটা কঠিন, সেটি যারা নিজেরা এই পথ পাড়ি দিয়েছেন, তারাই সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারেন। তবে কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাঁর এই অবস্থান শুধু ব্যক্তিগত সাহসের প্রকাশ নয়, একই সঙ্গে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করা অন্য মানুষদের জন্যও অনুপ্রেরণার হতে পারে।
২০২৫ সালের মার্চে সামিয়া প্রথমবার প্রকাশ্যে তাঁর ক্যান্সারজয়ের গল্প জানিয়েছিলেন। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, ২০২২ সালের দিকে তাঁর শরীরে রোগটি শনাক্ত হয় এবং পরীক্ষায় চতুর্থ স্টেজের কথা জানা যায়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তিনি তখন নিজের জীবনের অন্যতম কঠিন অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। সেই সময়ের লড়াই তাঁকে ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষের কষ্ট আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
সুস্থ হওয়ার পর ক্যান্সার রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর যে উদ্যোগ সামিয়া নিয়েছিলেন, নতুন করে চিকিৎসার মুখোমুখি হওয়ার পর সেই অভিজ্ঞতার গুরুত্বও যেন আরও বেড়ে গেছে। নিজে একজন ক্যান্সারজয়ী হিসেবে তিনি জানেন, রোগের চিকিৎসা শুধু হাসপাতাল, ওষুধ কিংবা পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভয়, উদ্বেগ, অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা এবং প্রতিদিন নিজেকে মানসিকভাবে শক্ত রাখার সংগ্রাম।
এবারের চিকিৎসায় সামিয়াকে কেমোথেরাপির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। ফলে সামনের দিনগুলো তাঁর জন্য সহজ হবে না। কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ব্যক্তি ও চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। শারীরিক দুর্বলতা, ক্লান্তি কিংবা চুল পড়ার মতো পরিবর্তন অনেক রোগীর জন্য কঠিন অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়। সামিয়াও সেই বাস্তবতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছেন।
তবে তাঁর কথায় একটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি ভয়কে নিজের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে দিতে চান না। বরং চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মানসিকভাবে স্থির থাকার চেষ্টা করছেন। দীর্ঘদিনের ক্যান্সারযুদ্ধ তাঁকে যে অভিজ্ঞতা দিয়েছে, সেই অভিজ্ঞতাই হয়তো এবারও তাঁকে কঠিন সময় পার হওয়ার শক্তি দেবে।
সামিয়া তাঁর পোস্টে সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, সৃষ্টিকর্তা যেন তাঁর চিকিৎসার পথ সহজ করে দেন এবং আগেরবারের মতো এবারও যেন তিনি নিজের শক্তি ধরে রাখতে পারেন। দ্রুত চিকিৎসা শেষ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
সামিয়ার এই প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষীর প্রার্থনা। বিনোদন অঙ্গনের পরিচিত মুখ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দর্শকদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। ফলে তাঁর অসুস্থতার খবর প্রকাশ্যে আসার পর অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর দ্রুত সুস্থতা কামনা করছেন।
ক্যান্সার ফিরে আসার খবর যে কোনো মানুষের জন্যই গভীর মানসিক চাপের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে যখন কেউ মনে করেন কঠিন অধ্যায়টি পেছনে ফেলে এসেছেন, তখন আবার নতুন করে রোগ শনাক্ত হওয়া অত্যন্ত কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতা। সামিয়ার ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতা এসেছে। কিন্তু তাঁর বর্তমান বক্তব্যে আত্মসমর্পণের বদলে লড়াই করার মানসিকতাই প্রকাশ পেয়েছে।
জীবনের এই নতুন পরীক্ষায় সামিয়ার সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চিকিৎসা সম্পন্ন করা এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে নিজেকে যতটা সম্ভব শক্ত রাখা। তাঁর আগের অভিজ্ঞতা, চিকিৎসকদের পরামর্শ এবং পরিবারের সমর্থন এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে ক্যান্সার নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতাও অন্যদের জন্য মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।
একসময় ক্যান্সারকে জয় করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছিলেন সামিয়া আফরিন। এখন আবারও তাঁকে সেই কঠিন পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। তবে তাঁর নিজের ভাষায়, সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া এবং কঠিন বাস্তবতাকে গ্রহণ করাই এই মুহূর্তে তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন এই লড়াইয়ে তাঁর লক্ষ্য একটাই—চিকিৎসা শেষ করে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা। সেই প্রত্যাশাতেই এখন সামিয়ার পরিবার, শুভাকাঙ্ক্ষী ও ভক্তদের প্রার্থনা তাঁর সঙ্গে রয়েছে।