প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাণিজ্যিক পরিবেশের নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে ভিয়েতনাম। উৎপাদন, নির্মাণ, সেবা, অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং বিনিয়োগ—অর্থনীতির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খাতের ইতিবাচক কর্মদক্ষতায় চলতি বছর দেশটির প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়েও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ২০২৭ সালে ভিয়েতনামের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ১১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
ভিয়েতনামের অর্থনীতির সাম্প্রতিক গতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথমার্ধেই দেশটি প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির জিডিপি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধি বিশ্লেষকদের আগের ৭ শতাংশ পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে ভিয়েতনামের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ।
অর্থনীতির এই দ্রুত সম্প্রসারণের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে শিল্প ও নির্মাণ খাত। উৎপাদন কার্যক্রমে গতি ফেরার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদাও শক্তিশালী হয়েছে। এর ফলে শুধু শিল্প উৎপাদন নয়, পরিবহন, খুচরা বাণিজ্য, সেবা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ভিয়েতনাম দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। চীন ও অন্যান্য উৎপাদননির্ভর অর্থনীতির ওপর বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর নির্ভরতা কমানোর প্রবণতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনার উদ্যোগ ভিয়েতনামের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। দেশটি সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে উৎপাদন, রপ্তানি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ধারাবাহিক অগ্রগতি দেখাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠান ডিএফডিএলের স্ট্যান্ড্রে বেজুইনহাউটের মতে, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন ও সরবরাহ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসকে ভিয়েতনাম বিনিয়োগের নতুন সুযোগে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে। উৎপাদন কার্যক্রম আকর্ষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি নির্ভরযোগ্য গন্তব্য হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করছে।
ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে দেশটির রপ্তানি পরিসংখ্যানে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশটির রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ২৬৬ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলারে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই রপ্তানি ২১ শতাংশ বেশি। রপ্তানি খাতের এমন শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেশটির শিল্প উৎপাদন, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং কর্মসংস্থানের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শুধু রপ্তানি নয়, বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ভিয়েতনাম উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগ ৬১ শতাংশ বেড়ে ৩৪ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিনিয়োগের এই প্রবাহকে দেশটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার অর্থ শুধু নতুন কারখানা বা উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে নতুন কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা এবং স্থানীয় ব্যবসার সম্প্রসারণ। ফলে ভিয়েতনামের অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগের ক্রমবর্ধমান প্রবাহ দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে।
এদিকে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ভিয়েতনামের অর্থনীতি নিয়ে আগের তুলনায় আরও আশাবাদী পূর্বাভাস দিয়েছে। ব্যাংকটির হিসাবে, ২০২৬ সালে ভিয়েতনামের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৯ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে এই প্রবৃদ্ধি আরও বেড়ে ১১ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ আগামী বছরও যদি উৎপাদন, বিনিয়োগ, রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার বর্তমান গতি বজায় থাকে, তাহলে ভিয়েতনাম এশিয়ার অন্যতম দ্রুত সম্প্রসারিত অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে।
ব্যাংকটি একই সঙ্গে ২০২৬ সালের জন্য ভিয়েতনামের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য অর্থনীতিকে সহায়তা করার মতো তুলনামূলক নমনীয় আর্থিক নীতি বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে বিনিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামবিষয়ক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ টিম লীলাহাফানের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বছরের প্রথমার্ধে ভিয়েতনাম অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের শক্তিশালী সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। উৎপাদন ও সেবা খাতের কার্যক্রম বৃদ্ধি, বিনিয়োগের প্রসার এবং অর্থনীতিকে সহায়তা দিতে নেওয়া বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে।
ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হচ্ছে অভ্যন্তরীণ চাহিদা। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সঙ্গে মানুষের আয় ও ব্যয়ের সক্ষমতাও ধীরে ধীরে বাড়ছে। স্থানীয় বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা শক্তিশালী থাকলে রপ্তানি খাতে কোনো সাময়িক ধাক্কা এলেও অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়। এ কারণে অভ্যন্তরীণ ভোগ ও বিনিয়োগের শক্তিশালী অবস্থান ভিয়েতনামের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে।
অবকাঠামো উন্নয়নও দেশটির প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। সড়ক, বন্দর, শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি দেশীয় ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করে। ভিয়েতনাম দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
তবে এই প্রবৃদ্ধির সামনে ঝুঁকিও রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বড় অর্থনীতিগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্ত ভিয়েতনামের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বৈশ্বিক চাহিদা কমে গেলে দেশটির উৎপাদন ও রপ্তানি খাতে চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া দ্রুত প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ও অবকাঠামো সরবরাহ, দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মতো বিষয়গুলোতেও নজর দিতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার পরিবর্তে স্থানীয় শিল্প ও উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়ানোও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তারপরও বর্তমান সূচকগুলো ভিয়েতনামের জন্য আশাব্যঞ্জক। রপ্তানি বৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগের উল্লম্ফন, শিল্প উৎপাদনের গতি, অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকার সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে দেশটির অর্থনীতি এখন শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৭ সালের ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাস্তবে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক উত্থান এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি উদাহরণ। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন, বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগিয়ে একটি দেশ কীভাবে দ্রুত প্রবৃদ্ধির পথে এগোতে পারে, ভিয়েতনামের সাম্প্রতিক অগ্রগতি তারই একটি দৃষ্টান্ত। এখন দেশটির সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই প্রবৃদ্ধিকে শুধু পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে রূপান্তর করা।
২০২৬ সালের প্রথমার্ধের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ফলাফল এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আগ্রহ ভিয়েতনামের সামনে সেই সুযোগ তৈরি করেছে। আগামী কয়েক বছরে দেশটি যদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারে, বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত করে এবং উৎপাদন ও সেবা খাতে দক্ষতা বাড়াতে পারে, তাহলে ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস শুধু একটি উচ্চাভিলাষী সংখ্যা না হয়ে দেশটির অর্থনৈতিক রূপান্তরের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।