প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) ১৪৪৮ হিজরি উদযাপন উপলক্ষে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) শুরু হচ্ছে পক্ষকালব্যাপী সিরাতুন্নবী (সা.) অনুষ্ঠানমালা। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ১৫ দিনব্যাপী এই আয়োজনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছে অনুষ্ঠানমালাটি।
বাদ মাগরিব বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পূর্ব সাহানে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হবে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ২৫ আগস্ট থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন সন্ধ্যার পর বিভিন্ন ধর্মীয়, শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত ২০ আগস্ট সংসদ সদস্যদের ভোটে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ২১ আগস্ট বঙ্গভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেন।
রাষ্ট্রপতির উপস্থিতির কারণে এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে সরকারও জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশে বুধবার, ২৬ আগস্ট যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালিত হবে। জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৪৪৮ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল এবার ২৬ আগস্ট পড়েছে।
বায়তুল মোকাররমে পক্ষকালব্যাপী অনুষ্ঠানমালার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ থাকবে ওয়াজ ও নসিহত। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন বাদ মাগরিব থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দেশের প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরাম ও পীর-মাশায়েখরা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, আদর্শ, চরিত্র ও শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করবেন।
এ আয়োজন শুধু ওয়াজ মাহফিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। কিরাত মাহফিল, হামদ-নাত, বিষয়ভিত্তিক সেমিনার, স্বরচিত কবিতা পাঠ এবং ইসলামী ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনীও থাকছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ বেতারের যৌথ উদ্যোগে কয়েকটি সেমিনার আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব সেমিনারের অনুষ্ঠান বাংলাদেশ বেতারে সম্প্রচারের কথাও জানানো হয়েছে।
তরুণ প্রজন্মকে মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে পরিচিত করাতে শিক্ষার্থীদের জন্যও রাখা হয়েছে বিশেষ আয়োজন। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসার শিক্ষার্থীরা ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবেন। এর মাধ্যমে ধর্মীয় জ্ঞান, মূল্যবোধ এবং সৃজনশীলতার সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা থাকবে বলে জানিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
আয়োজন উপলক্ষে প্রকাশ করা হবে সিরাত স্মরণিকা ও বিশেষ ক্রোড়পত্র। মহানবী (সা.)-এর জীবন, মানবিক দর্শন, ন্যায়বোধ, সামাজিক দায়িত্ব, সহমর্মিতা এবং শান্তির শিক্ষা নিয়ে গবেষণামূলক ও চিন্তাশীল লেখা এতে স্থান পাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
একই সঙ্গে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পূর্ব ও দক্ষিণ চত্বরে মাসব্যাপী ইসলামী বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে। ধর্মীয় বই, সিরাতগ্রন্থ, ইসলামী ইতিহাস, গবেষণা, শিশু-কিশোর সাহিত্যসহ বিভিন্ন প্রকাশনা সেখানে পাওয়া যাবে। জাতীয় পর্যায়ের ঈদে মিলাদুন্নবী কর্মসূচিতেও এই মাসব্যাপী বইমেলার বিষয়টি রাখা হয়েছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, পক্ষকালব্যাপী কর্মসূচির কেন্দ্রীয় ভাবনা থাকবে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শকে ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা। বিশেষ করে নৈতিকতা, মানবিকতা, সহনশীলতা, শান্তি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠায় রাসুল (সা.)-এর শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
সরকারের জাতীয় কর্মসূচিতেও ইসলামের শান্তি, ভ্রাতৃত্ব, সহনশীলতা, মানবাধিকার এবং নারীর মর্যাদার শিক্ষা তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দেবেন। দেশের মসজিদগুলোতে বিশেষ দোয়া এবং ধর্মীয় আলোচনা আয়োজনের নির্দেশনাও রয়েছে।
বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও আলোচনা ও দোয়া মাহফিল আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থাও নিজ নিজ এলাকায় কর্মসূচি পালন করবে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি শিশুদের জন্য হামদ-নাত, আলোচনা ও রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করবে। বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোতেও দিনটি পালনের কথা রয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থান সাজানোর কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে। সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সশস্ত্র বাহিনীর স্থাপনাগুলোতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ শহরকেন্দ্রেও ধর্মীয় ও জাতীয় আবহের সাজসজ্জা থাকবে।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) মুসলমানদের কাছে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও শিক্ষাকে স্মরণ করার গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। এই সময়ে তার দয়া, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমাশীলতা, অসহায়ের প্রতি সহমর্মিতা এবং মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার শিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় সেই শিক্ষার প্রয়োগ আরও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন ধর্মীয় আলেম ও গবেষকেরা। পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি, সামাজিক অসহিষ্ণুতা, সহিংসতা কিংবা বিভাজনের বিপরীতে মহানবী (সা.)-এর সহমর্মিতা ও ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক দর্শন মানুষকে ইতিবাচক পথ দেখাতে পারে—এমন বার্তাই এবারের কর্মসূচিতে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষ করে তরুণদের মাঝে ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি মানবিকতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের চর্চা বাড়ানো আয়োজকদের অন্যতম উদ্দেশ্য। এ কারণে প্রচলিত ওয়াজ মাহফিলের পাশাপাশি ক্যালিগ্রাফি, কবিতা, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রম রাখা হয়েছে।
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে সিরাতুন্নবী (সা.) উপলক্ষে পক্ষকালব্যাপী অনুষ্ঠান আয়োজনের ঐতিহ্যও রয়েছে। ২০২৫ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন একই ধরনের ১৫ দিনব্যাপী কর্মসূচি আয়োজন করেছিল। সেখানে ওয়াজ, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, সেমিনার, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, কিরাত, হামদ-নাত এবং ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। বিভাগ ও জেলা পর্যায়েও তখন বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছিল।
এবারও ধর্মপ্রাণ মুসল্লি, আলেম-ওলামা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সংস্কৃতিকর্মী এবং সাধারণ মানুষকে অনুষ্ঠানমালায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। আয়োজকদের প্রত্যাশা, দীর্ঘ ১৫ দিনের কর্মসূচি শুধু আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং মহানবী (সা.)-এর আদর্শ নিয়ে নতুন করে জানার ও ভাবার সুযোগ তৈরি করবে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উদ্বোধনের মাধ্যমে শুরু হওয়া অনুষ্ঠান চলবে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। একই সময়ে মাসব্যাপী ইসলামী বইমেলাও চলবে বায়তুল মোকাররমের পূর্ব ও দক্ষিণ চত্বরে। ধর্মীয় জ্ঞান, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে এবারের আয়োজনকে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণমুখী করার প্রত্যাশা রয়েছে আয়োজকদের।