প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে ময়নাতদন্তে। মরদেহগুলোর মুখমণ্ডল কালচে ও বিকৃত অবস্থায় পাওয়া গেলেও এসিড কিংবা অন্য কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক। প্রাথমিকভাবে ধর্ষণের আলামতও মেলেনি। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষার ওপর নির্ভর করছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানিয়েছেন, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে ময়নাতদন্তে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। তাদের মুখের অস্বাভাবিক কালচে রূপ কোনো রাসায়নিক পোড়ার কারণে হয়নি। দীর্ঘ সময় মরদেহ পড়ে থাকার পর স্বাভাবিক পচনপ্রক্রিয়ার কারণেই এমন পরিবর্তন ঘটেছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, মৃত্যুর পর শরীরের রক্ত ও টিস্যুতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে। পোশাকের বাইরে থাকা মুখমণ্ডল কিংবা শরীরের উন্মুক্ত অংশ দ্রুত কালচে হয়ে যেতে পারে। ফলে বাইরে থেকে দেখলে পোড়া বা রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের মতো মনে হলেও ময়নাতদন্তে তেমন আলামত পাওয়া যায়নি।
ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ মরদেহ উদ্ধারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় পর্যায়ে এসিড কিংবা কোনো রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে মুখ বিকৃত করার গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। চিকিৎসক সেই ধারণাকে সমর্থন করার মতো কোনো চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাননি বলে জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)। শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে নগরীর মাছুয়াপাড়ার তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
ঘটনার পর থেকেই হত্যাকাণ্ডের ধরন এবং উদ্দেশ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। গণপতির মরদেহ বাড়ির ছাদে পাওয়া যায়। স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ ছিল সিঁড়িতে। ছোট ছেলের মরদেহ পাওয়া যায় ঘরের ভেতরে। মরদেহগুলো পচে যাওয়ায় মুখমণ্ডলসহ কিছু অংশ বিকৃত ছিল।
পুলিশ বলছে, মরদেহ উদ্ধারের প্রায় ৪২ থেকে ৪৪ ঘণ্টা আগে হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই সময় রংপুরে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া থাকায় মরদেহ দ্রুত পচে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এই ব্যাখ্যার সঙ্গে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণও অনেকাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সময়, শরীরে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার হয়েছিল কি না, যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল কি না এবং মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ কারণ নির্ধারণে আরও পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। সিআইডিও এসব প্রশ্ন সামনে রেখে আলামত সংগ্রহ করেছে।
রংপুর সিআইডির কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন ধরনের নমুনা ও আলামত জব্দ করেছেন। এর মধ্যে সিগারেটের টুকরো, ইয়াবা সেবনে ব্যবহৃত হতে পারে এমন ফয়েল এবং অন্যান্য বস্তু রয়েছে। এসব আলামতে কারও ডিএনএ পাওয়া যায় কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হবে।
মরদেহের কাছ থেকে পাওয়া তরল এবং বিভিন্ন স্থানের নমুনাও পরীক্ষার আওতায় আসছে। সিআইডি জানিয়েছে, সংগৃহীত সব আলামত আদালতের অনুমতি পাওয়ার পর ফরেনসিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হবে।
ঘটনায় গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক।
তবে জবানবন্দিতে তারা কী বলেছেন, তার বিস্তারিত তথ্য তদন্তের স্বার্থে প্রকাশ করেনি পুলিশ। ফলে হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনাপ্রবাহ আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে।
পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্য অনুযায়ী, মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের একটি ভবন থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিলেন বলে পুলিশের দাবি। গণপতি বিষয়টি দেখতে পেয়ে বাধা দিলে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। পরে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
এরপর পরিবারের অন্য সদস্যদেরও একে একে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছিল। ঘটনাকে ডাকাতির রূপ দেওয়ার জন্য ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করা এবং কিছু স্বর্ণালংকার নেওয়ার তথ্যও তদন্তকারীরা সামনে এনেছেন।
তবে পুলিশের দেওয়া এই প্রাথমিক বর্ণনা নিয়ে নিহতদের স্বজন, স্থানীয় মানুষ এবং শিক্ষকদের একটি অংশ প্রশ্ন তুলেছেন। তারা আরও গভীর ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। কিছু স্থানীয় বাসিন্দা মনে করছেন, ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ কিংবা আরও ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারেন।
এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই মঙ্গলবার মামলার তদন্তভার কোতোয়ালি থানা থেকে রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অধিকতর তদন্ত এবং পরবর্তী সময়ে অভিযোগপত্র প্রস্তুতের লক্ষ্যেই ডিবিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত সংস্থাগুলো এখন বিশেষভাবে ফরেনসিক পরীক্ষার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কারণ প্রত্যক্ষদর্শী না থাকা কোনো হত্যাকাণ্ডে ঘটনাস্থলের ডিএনএ, আঙুলের ছাপ, ব্যবহৃত কাপড়, ধূমপানের অবশিষ্টাংশ কিংবা অন্য জৈবিক নমুনা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে উঠতে পারে।
গ্রেপ্তার দুই আসামির ডিএনএ নমুনাও সংগ্রহ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে তাদের নমুনা সংগ্রহ করে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। এতে ওই বাড়ির কোন কোন স্থানে কার উপস্থিতি ছিল, তা সম্পর্কে বাড়তি তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
এদিকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর বাড়িটিকে অন্ধকার রাখার উদ্দেশ্যে বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল বলে গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে কোথা থেকে সংযোগ কাটা হয়েছিল এবং এতে অন্য কোনো কারিগরি ঘটনা ঘটেছিল কি না, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে।
ঘটনার আরেকটি আলোচিত দিক হচ্ছে নিহতদের মুখ বিকৃত হওয়া। বাইরে থেকে মরদেহ দেখার পর এসিড ব্যবহারের গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে চিকিৎসক বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানিয়েছেন, এসিডে ঝলসে যাওয়ার ক্ষেত্রে যে ধরনের টিস্যু ক্ষতি কিংবা রাসায়নিক পোড়ার চিহ্ন প্রত্যাশিত, তেমন কিছু তারা পাননি।
একইভাবে দুই নারী ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে যৌন নির্যাতনের আলামত পাওয়া যায়নি বলে চিকিৎসক জানিয়েছেন। তবে মরদেহ পচে যাওয়ার কারণে কিছু পরীক্ষা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই ফরেনসিক ল্যাবের প্রতিবেদন ছাড়া এই বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্যে সতর্ক থাকতে বলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ময়নাতদন্তের পর চারজনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রংপুর নগরের কামাল কাছনা দখীগঞ্জ মহাশ্মশানে পাশাপাশি চারটি চিতায় তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। একটি পরিবারের চারজনের একসঙ্গে শেষযাত্রার দৃশ্য স্বজন ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে গভীর শোক তৈরি করে।
গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের দীর্ঘদিনের শিক্ষক ছিলেন। স্থানীয় শিক্ষক, সাবেক শিক্ষার্থী এবং পরিচিতদের মধ্যে তার ব্যাপক পরিচিতি ছিল। ফলে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি হিসেবে নয়, স্থানীয় শিক্ষাঙ্গনেও গভীর অভিঘাত তৈরি করেছে।
মামলাটিকে ঘিরে এখন মূল প্রশ্ন দুটি—পুলিশের প্রাথমিকভাবে তুলে ধরা হত্যার কারণই চূড়ান্ত তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয় কি না এবং এই দুই আসামি ছাড়া আর কেউ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না।
ডিএনএ ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফল সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। চিকিৎসকের ময়নাতদন্ত একদিকে এসিড ব্যবহারের গুঞ্জনকে নাকচ করেছে, অন্যদিকে শ্বাসরোধে হত্যার প্রাথমিক ধারণাকে শক্তিশালী করেছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত তদন্ত শেষ হচ্ছে না।
তদন্তভার ডিবির হাতে যাওয়ায় এখন ঘটনাস্থলের আলামত, আদালতে দেওয়া জবানবন্দি, ডিজিটাল তথ্য এবং ফরেনসিক ফল একসঙ্গে মিলিয়ে পুরো ঘটনার ধারাবাহিকতা পুনর্গঠনের চেষ্টা চলবে।
চারজনের হত্যাকাণ্ড ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু দাবি ও পাল্টা দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসা ও ফরেনসিক প্রমাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো গুরুতর অপরাধের বিচার শুধু স্বীকারোক্তি কিংবা অনুমানের ওপর নয়, স্বাধীন ও যাচাইযোগ্য বস্তুগত প্রমাণের ওপর দাঁড়ানো প্রয়োজন।
ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্য আপাতত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করেছে—মরদেহের কালচে ও বিকৃত চেহারাকে এসিড হামলার প্রমাণ হিসেবে দেখার চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি। এখন ডিএনএ ও অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদনের অপেক্ষা। সেই ফলই রংপুরের আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের আরও অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।