মেয়েদের সর্বজনীন উপবৃত্তি ফেরানোর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যন্ত ছাত্রীদের জন্য সর্বজনীন উপবৃত্তি কর্মসূচি পুনরায় চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মেয়েদের ঝরে পড়া কমানো, শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত করা এবং বাল্যবিবাহ নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্য সামনে রেখে সম্ভাব্য ব্যয়, উপকারভোগীর সংখ্যা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি বিশ্লেষণ করে একটি সুস্পষ্ট প্রস্তাব তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের কার্যক্রম নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে ট্রাস্টের চলমান কার্যক্রম, আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি এবং শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন জানিয়েছেন, মেয়েদের সর্বজনীন উপবৃত্তি পুনর্বহালের আগে এর আর্থিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে। কর্মসূচি চালু হলে কত শিক্ষার্থী সুবিধা পাবেন, রাষ্ট্রের কত অর্থ প্রয়োজন হবে এবং কোন পদ্ধতিতে অর্থ বিতরণ করলে স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বজায় থাকবে—এসব বিষয়ও প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

সরকারি সিদ্ধান্ত এখনো উপবৃত্তি পুনর্বহালের চূড়ান্ত ঘোষণা নয়। বরং সম্ভাব্যতা যাচাই এবং কার্যকর মডেল তৈরির প্রথম ধাপ হিসেবে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষণের ফল ইতিবাচক হলে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যন্ত ছাত্রীদের একটি বৃহৎ অংশ নতুন করে আর্থিক সহায়তার আওতায় আসতে পারেন।

বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তির ইতিহাস কয়েক দশকের পুরোনো। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে গ্রামীণ এলাকার মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যে Female Secondary School Assistance Program চালু হয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচিতে নিয়মিত উপস্থিতি, পরীক্ষায় নির্দিষ্ট ফলাফল এবং বিবাহিত না থাকার মতো শর্ত পূরণকারী ছাত্রীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হতো।

পরবর্তী সময়ে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের নারী শিক্ষার অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে দেখা যায়, নব্বইয়ের দশকে চালু হওয়া সর্বজনীন ধরনের নারী উপবৃত্তি কর্মসূচির পর মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের ভর্তি কয়েক গুণ বেড়েছিল এবং নারী-পুরুষ শিক্ষার্থীর সংখ্যায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে।

বিশ্বব্যাংকের আরেক মূল্যায়ন বলছে, মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার এই আর্থিক প্রণোদনা শুধু ভর্তি বাড়ায়নি; বাল্যবিবাহ কমানো এবং শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত করতেও সহায়ক হয়েছিল। তবে বিভিন্ন গবেষণায় এটিও উঠে এসেছে যে বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক সমস্যার সমাধানে শুধু উপবৃত্তিই যথেষ্ট নয়। শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক সিদ্ধান্ত ও স্থানীয় বাস্তবতা একসঙ্গে কাজ করে।

বর্তমান বৈঠকেও সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা আলোচনায় এসেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার সময় চালু হওয়া মেয়েদের সর্বজনীন উপবৃত্তি কর্মসূচির মাধ্যমে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি, শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখা এবং বাল্যবিবাহ নিরুৎসাহিত করার অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে।

বাংলাদেশে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতির পেছনে উপবৃত্তি কর্মসূচির অবদান আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের পর্যালোচনায় বলা হয়েছিল, মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং এক সময় মেয়েরা মোট মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর অর্ধেকেরও বেশি হয়ে উঠেছিল। একই সময়ে দরিদ্র ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক উপবৃত্তি ব্যবস্থাও সম্প্রসারিত হয়।

তারপরও ঝরে পড়ার সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি। বিশ্বব্যাংকের একটি বিশ্লেষণে বাল্যবিবাহ, পারিবারিক দায়িত্ব, দারিদ্র্য, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং বিদ্যালয়কেন্দ্রিক নানা সমস্যাকে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে নতুন করে সর্বজনীন উপবৃত্তি চালু হলে সেটিকে শুধু নগদ সহায়তা হিসেবে না দেখে শিক্ষাজীবন ধরে রাখার বৃহত্তর কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।

বৈঠকে শুধু মেয়েদের উপবৃত্তিই আলোচনায় ছিল না। ছেলেদের শিক্ষায় উৎসাহ বাড়াতে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে উপবৃত্তি দেওয়া যায় কি না, সেটিও পর্যালোচনা করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যৎ শিক্ষাসহায়তা কাঠামোয় একদিকে মেয়েদের জন্য বিস্তৃত সহায়তা এবং অন্যদিকে যোগ্যতার ভিত্তিতে ছেলেদের জন্য নির্দিষ্ট বৃত্তির মতো দুই ধরনের পদ্ধতি থাকতে পারে।

বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক ও সমমান পর্যায়ের দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা অনুদান এবং উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি ও ফেলোশিপও ট্রাস্টের কার্যক্রমের অংশ।

সোমবারের বৈঠকে শিক্ষার্থীদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যকেও শিক্ষার মানের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছে। বিদ্যালয় পর্যায়ে মিড-ডে মিল কর্মসূচির ব্যবস্থাপনা, খাবারের মান, নিরাপদ রান্না এবং সরবরাহ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের দেওয়া খাবার অবশ্যই পুষ্টিকর, নিরাপদ ও মানসম্মত হতে হবে। খাদ্যের মানে কোনো ধরনের আপস না করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যয়, স্থানীয় অংশগ্রহণ, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা এবং মান নিয়ন্ত্রণ বিবেচনায় মিড-ডে মিল পরিচালনার দুটি বিকল্প মডেল নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

দুটি পদ্ধতির কোনটি বেশি কার্যকর, সেটি সরাসরি বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগ না করে প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে যাচাই করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পৃথক দুই জেলায় দুটি ভিন্ন পদ্ধতির পাইলট প্রকল্প চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ফলাফল মূল্যায়নের পর বৃহত্তর কর্মসূচি তৈরির সুযোগ থাকবে।

শিক্ষায় আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়েই ‘কন্ডিশনাল ক্যাশ ট্রান্সফার’ বা শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তার ব্যবহার রয়েছে। বাংলাদেশে মেয়েদের ঐতিহাসিক উপবৃত্তি কর্মসূচিও এর অন্যতম পুরোনো উদাহরণ। নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া এবং শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখার সঙ্গে আর্থিক সুবিধা যুক্ত করার ফলে দরিদ্র পরিবারের সিদ্ধান্তে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশ্বব্যাংক বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করেছে।

তবে সর্বজনীন কর্মসূচি পুনরায় চালু করার ক্ষেত্রে অর্থায়ন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠবে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যন্ত দেশের বিপুলসংখ্যক ছাত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করলে বর্তমান লক্ষ্যভিত্তিক উপবৃত্তির তুলনায় সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। এজন্যই উপকারভোগীর সম্ভাব্য সংখ্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন সক্ষমতা আগে নির্ণয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে উপবৃত্তির অর্থ যেন প্রকৃত শিক্ষার্থীর কাছে সহজে ও স্বচ্ছভাবে পৌঁছায়। অতীতের কর্মসূচিতে ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সরাসরি অর্থ দেওয়ার নজির ছিল। বর্তমান ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামোর কারণে মোবাইল আর্থিক সেবা কিংবা ব্যাংকভিত্তিক সরাসরি অর্থ স্থানান্তরের আরও কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

গ্রাম কিংবা নিম্নআয়ের পরিবারের একটি মেয়ের জন্য সামান্য মাসিক সহায়তাও কখনো বই, যাতায়াত, পোশাক কিংবা পরীক্ষার খরচ বহনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরিবারে আর্থিক চাপ বাড়লে অনেক সময় মেয়েদের শিক্ষাই আগে বাধাগ্রস্ত হয়। উপবৃত্তি সেই সিদ্ধান্ত কিছুটা বদলে দিতে পারে।

তবে অর্থের পাশাপাশি বিদ্যালয়ে নিরাপদ পরিবেশ, মানসম্মত শিক্ষা, পৃথক স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতাও প্রয়োজন। এসব জায়গায় সমন্বিত উদ্যোগ না থাকলে শুধু উপবৃত্তি দিয়ে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।

সোমবারের বৈঠক তাই শিক্ষার্থীদের সহায়তায় একটি বিস্তৃত কাঠামোর সম্ভাবনা সামনে এনেছে। মেয়েদের সর্বজনীন উপবৃত্তির সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন, ছেলেদের মেধাভিত্তিক সহায়তা এবং বিদ্যালয়ে পুষ্টিকর খাবার—তিনটি উদ্যোগই শিক্ষার সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাকে যুক্ত করছে।

বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিন, শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনের ওপর নজর থাকবে। আর্থিক ব্যয়, উপকারভোগী নির্বাচন, সামাজিক ফলাফল এবং বাস্তবায়নের উপযুক্ত মডেল নির্ধারণের পরই পরিষ্কার হবে সর্বজনীন উপবৃত্তি প্রকৃত অর্থে ফিরছে কি না।

কর্মসূচিটি বাস্তবায়িত হলে কয়েক দশক আগে বাংলাদেশের নারী শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা একটি নীতির নতুন সংস্করণ হিসেবে এটি ফিরে আসতে পারে। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তনের কার্যকারিতা নির্ভর করবে শুধু অর্থ বরাদ্দে নয়; স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং মেয়েদের শিক্ষাজীবনের বাস্তব বাধাগুলো একসঙ্গে মোকাবিলা করার ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত