ত্যাগীরা দূরে, সুবিধাবাদীরা ক্ষমতার বৃত্তে: নয়ন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৪ বার

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দলের কঠিন সময়ে রাজপথে থাকা ত্যাগী নেতাকর্মীরা এখন অনেক ক্ষেত্রেই অবমূল্যায়িত হচ্ছেন বলে আক্ষেপ করেছেন যুবদল নেতা রবিউল ইসলাম নয়ন। তার অভিযোগ, আন্দোলন-সংগ্রামের সময় যারা ঝুঁকি নিয়ে মাঠে ছিলেন তাদের একটি অংশ এখন দল ও ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে। বিপরীতে দুঃসময়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকা অনেকেই বর্তমানে সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছেছেন।

সোমবার (২৪ আগস্ট) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন নয়ন। আট বছর আগের ঈদের দিনের একটি ছবি শেয়ার করে তিনি বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের পুরোনো সময় স্মরণ করেন। সেই স্মৃতির সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার তুলনা টেনে দলের ভেতরে ত্যাগ ও মূল্যায়নের প্রশ্ন সামনে আনেন তিনি।

নয়নের শেয়ার করা ছবিটি ২০১৮ সালের ১৬ জুনের। দিনটি ছিল ঈদুল ফিতর। ওই সময় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিচারিক আদালতের রায়ের পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। সেই বছরের ঈদুল ফিতরও তাকে কারাগারেই কাটাতে হয়।

নয়ন স্মৃতিচারণ করে জানান, ঈদের দিন সকালে তৎকালীন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী তাকে ফোন করেছিলেন। নেতাকর্মীদের নিয়ে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে যেতে বলেন রিজভী। উদ্দেশ্য ছিল খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে মিছিল করা।

সেদিন ভারী বৃষ্টি হচ্ছিল বলে জানান নয়ন। ঈদের সকাল হওয়ায় নেতাকর্মীদের দ্রুত জড়ো করাও কঠিন ছিল। তারপরও রিজভীর আহ্বানে নেতাকর্মীদের নিয়ে নয়াপল্টনে যান তিনি। বৃষ্টির মধ্যেই মিছিল করেন তারা এবং পরে সড়কে বসে রিজভীর বক্তব্য শোনেন বলে তার পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১৮ সালের সেই ঈদের দিন বিএনপির রাজনৈতিক পরিবেশও ছিল উত্তপ্ত। খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে পুরান ঢাকার কারাগারে গিয়েছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। তবে তারা সাক্ষাতের অনুমতি পাননি। পরে পরিবারের প্রায় ২০ সদস্য কারাগারে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন এবং ঈদের খাবার নিয়ে যান।

নয়নের পোস্টে এই পুরোনো স্মৃতি নতুন তাৎপর্য পেয়েছে রুহুল কবির রিজভীর সাম্প্রতিক দলীয় দায়িত্বের কারণে। গত ২০ আগস্ট বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে রিজভীকে মনোনীত করা হয়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর দলের গঠনতন্ত্রের ৭(খ)(৬) ধারা অনুযায়ী এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাকে।

রিজভীর নতুন দায়িত্ব পাওয়াকে আনন্দের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন নয়ন। তার মতে, আন্দোলনের কঠিন সময়ে রাজপথে নিয়মিত উপস্থিত থাকা একজন নেতা দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসায় পুরোনো কর্মীদের মধ্যে আবেগ তৈরি হয়েছে।

তবে এই আনন্দের পাশাপাশি দলের বর্তমান সাংগঠনিক বাস্তবতা নিয়ে হতাশাও প্রকাশ করেন যুবদল নেতা। তার দাবি, ২০১৮ সালের মতো কঠিন সময়ে রিজভী অনেককে রাজপথে ডাকলেও তাদের একটি অংশকে পাওয়া যায়নি। এখন সেই ব্যক্তিদের কেউ কেউ ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অন্যদিকে বৃষ্টি, মামলা, গ্রেপ্তারের ভয় কিংবা পারিবারিক আনন্দ উপেক্ষা করে যারা রাজপথে ছিলেন তাদের অনেকেই এখন দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা ক্ষমতার বলয় থেকে দূরে—এমন দাবি করেন নয়ন। কেউ কেউ অভিমান করে রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন বলেও তার পোস্টে উল্লেখ রয়েছে।

তবে কোন ব্যক্তিদের তিনি ‘সুবিধাবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন কিংবা কারা ত্যাগী হয়েও বঞ্চিত হয়েছেন—পোস্টে সুনির্দিষ্ট নাম উল্লেখ করেননি নয়ন। ফলে তার বক্তব্যকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন ও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক দলগুলোতে ত্যাগী ও নতুন নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন নিয়ে বিতর্ক বাংলাদেশে নতুন নয়। দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থাকার পর কোনো দল ক্ষমতায় গেলে পদ-পদবি, মনোনয়ন, সাংগঠনিক দায়িত্ব ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার বণ্টন নিয়ে পুরোনো কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিতে পারে। ক্ষমতাসীন বিএনপির ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক সময়ে এমন আলোচনা বিভিন্ন পর্যায়ে সামনে এসেছে।

নয়নের বক্তব্যে সেই অসন্তোষ সরাসরি প্রকাশ পেয়েছে। তিনি ত্যাগী রাজনৈতিক কর্মীদের শ্রমিকের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার ভাষায়, শ্রমিকরা শরীরের ঘাম ঝরিয়ে পণ্য উৎপাদন করলেও সেই পণ্যের ওপর তাদের মালিকানা থাকে না। রাজনীতিতেও অনেক ত্যাগী কর্মীর অবস্থাকে একই রকম বলে মনে করেন তিনি।

তিনি লিখেছেন, রাজপথে জীবন বাজি রেখে আন্দোলন করেন একদল কর্মী। কিন্তু আন্দোলন সফল হওয়ার পর সুবিধা পান এমন অনেকে, যারা কঠিন সময়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন।

নয়নের বহুল আলোচিত মন্তব্য ছিল, “রাজনীতিতে ত্যাগীরা আসলে শ্রমিকের মতো।” আর সুবিধাভোগীদের বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, রাজপথের আন্দোলন থেকে দূরে থেকে “এসি রুমে বসে টিভি দেখা” ব্যক্তিরাই পরে সুবিধা ভোগ করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতিও তির্যক মন্তব্য করেন নয়ন। তার অভিযোগ, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এমন অনেকে নিজেদের আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে তুলে ধরছেন, যারা আগের দীর্ঘ আন্দোলনের সময়ে মাঠে ছিলেন না।

এই অংশেও কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম দেননি তিনি। বরং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীদের পুরোনো আন্দোলনের ইতিহাস জানার আহ্বান জানিয়েছেন।

নয়নের মতে, একটি রাজনৈতিক দলের ইতিহাস শুধু বড় নেতাদের মাধ্যমে তৈরি হয় না। মাঠপর্যায়ের অসংখ্য কর্মীর গ্রেপ্তার, মামলা, হামলা, পারিবারিক ক্ষতি এবং ব্যক্তিগত ত্যাগও সেই ইতিহাসের অংশ। দল ক্ষমতার কাছাকাছি গেলে সেই কর্মীদের অবদান ভুলে যাওয়া উচিত নয় বলে তার বক্তব্যের মূল বার্তা।

২০১৮ সালের ছবিটিকে তিনি সেই ত্যাগের একটি প্রতীক হিসেবে সামনে এনেছেন। ঈদের দিন যখন সাধারণ মানুষ পরিবার নিয়ে আনন্দ করছিলেন, তখন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বৃষ্টির মধ্যে কিছু নেতাকর্মী মিছিল করেছিলেন—এই ঘটনাকে দলের দুঃসময়ের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন নয়ন।

ঐতিহাসিক তথ্যেও নিশ্চিত হওয়া যায়, ২০১৮ সালের ১৬ জুন বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়েছিল এবং খালেদা জিয়া সেদিন কারাগারে ছিলেন। তার বন্দিত্ব ঘিরে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে তখন ক্ষোভ ও হতাশা ছিল।

রিজভীও ওই সময় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন ও রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনায় সক্রিয় ছিলেন। দীর্ঘদিন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর বর্তমানে তিনি দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।

তার এই উত্থানকে নয়ন ত্যাগী রাজনীতির স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি চান একই নীতি দলের অন্য স্তরেও অনুসরণ করা হোক।

ক্ষমতায় থাকা একটি রাজনৈতিক দলের জন্য এই প্রশ্ন আরও সংবেদনশীল। বিরোধী অবস্থায় আন্দোলনকারী কর্মীদের প্রত্যাশা থাকে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে তাদের অবদান সংগঠন স্বীকৃতি দেবে। কিন্তু নেতৃত্বকে একই সঙ্গে নতুন দক্ষ মানুষ, জনপ্রিয় মুখ এবং দীর্ঘদিনের কর্মীদের মধ্যে ভারসাম্যও বজায় রাখতে হয়।

এই জায়গায় দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হলে তা সাধারণত প্রকাশ্যে আসে পদবণ্টন, মনোনয়ন কিংবা সাংগঠনিক পুনর্গঠনের সময়। নয়নের বর্তমান পোস্টে যদিও কোনো নির্দিষ্ট পদ কিংবা মনোনয়ন নিয়ে অভিযোগ নেই, তবু তার বক্তব্যে বিএনপির ভেতরে ত্যাগী বনাম সুবিধাবাদী বিতর্কের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক নেতাদের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পরিণত হয়েছে। আগে যেসব ক্ষোভ দলীয় সভা কিংবা ব্যক্তিগত আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকত, এখন সেগুলো দ্রুত জনসমক্ষে চলে আসে। নয়নের পোস্টও অল্প সময়েই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে।

তবে কোনো রাজনৈতিক কর্মীর ত্যাগ কিংবা সুবিধাবাদী অবস্থান পরিমাপের নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই। আন্দোলনে উপস্থিতি, কারাবরণ কিংবা মামলার মুখোমুখি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও দল পরিচালনায় যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রয়োজনও বিবেচনায় আসতে পারে।

ফলে নয়নের বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক বিতর্ক সামনে আনলেও তার মূল্যায়নই বিএনপির আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়। দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও তার মন্তব্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

তারপরও পোস্টটির আবেগের জায়গাটি স্পষ্ট। দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতির সময় যারা কঠিন পরিস্থিতিতে মাঠে ছিলেন তারা যেন নতুন বাস্তবতায় অদৃশ্য হয়ে না যান—এই আবেদনই বারবার উঠে এসেছে তার লেখায়।

২০১৮ সালের এক বৃষ্টিভেজা ঈদের দিনের ছবির সঙ্গে ২০২৬ সালের ক্ষমতাসীন বিএনপির বাস্তবতা মিলিয়ে নয়ন মূলত একটি পুরোনো রাজনৈতিক প্রশ্নই আবার সামনে এনেছেন—সংগ্রামের সময় যারা সামনে থাকে, সাফল্যের সময় তাদের জায়গা কোথায়?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত