প্রতিদিন গড়ে ১০ খুনের মামলা, সহিংসতায় বাড়ছে উদ্বেগ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ২ বার

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক সংঘাত এবং মব সহিংসতার ঘটনায় জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনা সেই উদ্বেগ আরও সামনে এনেছে। তবে পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, পরিস্থিতি শুধু কয়েকটি আলোচিত ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছর প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও একাধিক হত্যাকাণ্ডের মামলা নথিভুক্ত হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত তিন মাসে সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৯৩৪টি মামলা হয়েছে। মাসে গড়ে মামলার সংখ্যা ৩১১টির বেশি। দৈনিক হিসাবে সংখ্যাটি ১০টির কিছু বেশি।

চলতি বছরের প্রথম সাত মাসের চিত্রও প্রায় একই প্রবণতা দেখাচ্ছে। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মোট ২ হাজার ৭৬টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি, মার্চে ৩১৭টি এবং এপ্রিলে ২৮৮টি মামলা হয়েছে। এরপর মে মাসে ৩১০টি, জুনে ৩২৬টি এবং জুলাইয়ে ২৯৮টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে।

তবে এসব সংখ্যা হত্যাকাণ্ডের মামলার পরিসংখ্যান। প্রতিটি মামলা মানেই আলাদা একজন নিহত হয়েছেন—এমন ব্যাখ্যা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। কোনো কোনো ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি নিহত হলেও একটি মামলা হতে পারে। ফলে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলামও প্রতি মাসে প্রায় ৩০০ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দস্যুতা, ডাকাতি এবং চুরির মতো কিছু অপরাধ কমলেও হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে সাম্প্রতিক রংপুরের ঘটনা। একটি বাড়ি থেকে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধারের পর দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়।

ওই ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তদন্তকারীরা হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ এবং আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছেন। এমন একটি ঘটনায় একই পরিবারের চার সদস্যের প্রাণহানি সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং মব সহিংসতার পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মব সহিংসতায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ৭৭ জনের প্রাণ গেছে।

রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে প্রায় ৪০০টি। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ২ হাজার ৯৭৪ জন। বিভিন্ন দলের পারস্পরিক সংঘাতের পাশাপাশি দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধও প্রাণহানির কারণ হয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছেন। জামায়াত ও বিএনপির সংঘাতে নয়জন এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১৬ জনের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭৭ জনের মধ্যে অন্তত ৪০ জন দুর্বৃত্তদের হামলা কিংবা গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ২৩ আগস্ট কিশোরগঞ্জের ভৈরবে সাবেক কাউন্সিলর ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের নেতা আল আমিনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাও রাজনৈতিক সহিংসতার আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক বিরোধ ঘিরে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।

অপরাধ বিশ্লেষকেরা হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধির পেছনে একক কোনো কারণ দেখছেন না। রাজনৈতিক বিরোধ, স্থানীয় আধিপত্য, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, মাদক, অবৈধ অস্ত্র এবং ব্যক্তিগত বিরোধ—বিভিন্ন কারণ মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে বলে তাদের মত।

অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক মনে করেন, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করছে। তার মতে, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কিংবা পারিবারিক বিরোধ অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহ ঠেকানো গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাও বড় ধরনের চাপের মধ্যে পড়ে। বিভিন্ন থানায় হামলা, ভাঙচুর এবং অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা ও মনোবল নিয়ে আলোচনা এখনো রয়েছে।

পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১ হাজার ৭৮৯টি মামলা হয়েছে। এর আগের ছয় মাসে একই ধরনের মামলা হয়েছিল ১ হাজার ৭৮০টি। অর্থাৎ দুই সময়ের তুলনায় মামলার সংখ্যা বেড়েছে নয়টি।

এই হিসাব থেকে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা না গেলেও হত্যাকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে—এমন চিত্রও পাওয়া যাচ্ছে না। বরং মাসে প্রায় ৩০০ মামলার ধারাবাহিকতা জননিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে রাখছে।

আরেকটি উদ্বেগজনক জায়গা নারী ও শিশু নির্যাতন। গত ছয় মাসে এ ধরনের ঘটনায় ১১ হাজার ১৬৫টি মামলা হয়েছে। আগের ছয় মাসে সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৯০। সেই হিসাবে মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৭৫টি।

ঢাকার মিরপুরে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও চলতি বছরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ওই মামলায় দ্রুত তদন্ত এবং বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হলেও অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, সব ঘটনায় এমন দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

মানবাধিকারকর্মী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এলিনা খান মনে করেন, নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড কিংবা সহিংসতার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বলেও মত দিয়েছেন তিনি।

পুলিশ অবশ্য বলছে, অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং আইনের আওতায় আনতে নিয়মিত অভিযান চলছে। অতিরিক্ত আইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত অস্থিরতা থেকে সৃষ্ট অনেক হত্যাকাণ্ড আগাম শনাক্ত করা কঠিন। তারপরও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।

মব সহিংসতার পরিস্থিতিও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। প্রথম সাত মাসে এমন ঘটনায় ১৩৪ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র। এর মধ্যে ঢাকায় সর্বাধিক ৫০ জন এবং চট্টগ্রামে ৩১ জন নিহত হয়েছেন।

মব সহিংসতায় আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সন্দেহভাজন কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির ওপর দলবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটে। এ ধরনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পুলিশি হস্তক্ষেপের পাশাপাশি আইনের প্রতি সামাজিক আস্থা শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন।

অপরাধ বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে শুধু অপরাধ সংঘটনের পর গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়। অপরাধ প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি। বিশেষ করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক সংঘাতের আগাম তথ্য সংগ্রহ এবং স্থানীয় বিরোধ সহিংস হওয়ার আগেই হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

পুলিশের গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংঘবদ্ধ অপরাধ কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো আগে শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি থানাভিত্তিক কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম আরও কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের সবগুলো উদ্ধার হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও নিরাপত্তা আলোচনায় বারবার এসেছে। অপরাধীদের হাতে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র থাকলে সাধারণ বিরোধও মুহূর্তে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় আধিপত্য, পদ-পদবি কিংবা স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ ঘিরে বিরোধ যদি সহিংসতায় রূপ নেয়, তাহলে শুধু পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। পুলিশের নথিভুক্ত মামলা অপরাধ পরিস্থিতি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এটিই একমাত্র মানদণ্ড নয়। মামলার নিষ্পত্তি, গ্রেপ্তার, অভিযোগপত্র, বিচার এবং দণ্ডের হারও সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে বিবেচনায় নিতে হয়।

সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা কমানো। পাশাপাশি রাজনৈতিক ও মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখানো প্রয়োজন।

নাগরিকদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বগুলোর একটি। প্রতিদিন গড়ে ১০টির বেশি হত্যাকাণ্ডের মামলা নথিভুক্ত হওয়ার পরিসংখ্যান তাই কেবল সংখ্যার হিসাব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু পরিবার, সামাজিক নিরাপত্তাবোধ এবং আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা।

অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি সহিংসতা তৈরির সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণগুলো মোকাবিলা করা না গেলে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি কঠিন হতে পারে। ফলে আগামী দিনগুলোতে সরকারের পদক্ষেপ, পুলিশের কার্যক্রম এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকার ওপর নজর থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত