প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু নন, বিভিন্ন মামলায় পলাতক থাকা এবং বিদেশে অবস্থান করা সব আসামিকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে চায় সরকার—এমন মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ। একই সঙ্গে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ না করা, দেশে সার মজুদের পরিস্থিতি এবং সরকারের বর্তমান রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, জুলাই আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত ঘটনা কিংবা তার আগের বিভিন্ন ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, তাদের কাউকেই বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখতে চায় না সরকার।
শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর প্রসঙ্গে আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, বিষয়টি শুধু একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নয়। সরকারের অবস্থান হলো, বাংলাদেশের আদালতে মামলার মুখোমুখি যেসব পলাতক আসামি বিদেশে অবস্থান করছেন তাদের সবাইকে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।
শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত চেয়ে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও গত জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন, বিদ্যমান প্রত্যর্পণ ব্যবস্থার আওতায় শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কেও এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনার মধ্যেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতকদের প্রত্যর্পণের অনুরোধে ভারতের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।
ফলে তথ্যমন্ত্রীর মঙ্গলবারের বক্তব্য সরকারের আগের অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যাচ্ছে। তবে তিনি পরিষ্কার করেছেন, প্রত্যর্পণ প্রশ্নটিকে শুধু শেখ হাসিনাকেন্দ্রিকভাবে দেখছে না সরকার।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একাধিক মামলা ও বিচারিক কার্যক্রম রয়েছে। বিভিন্ন মামলায় তার সঙ্গে আরও বহু ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। একটি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাতেই শেখ হাসিনাসহ ২৮৬ জন আসামির মধ্যে ২৫৯ জনকে পলাতক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এসব মামলার বিচার, প্রত্যর্পণ এবং বিদেশে থাকা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন, সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ আইন এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফলে সরকার রাজনৈতিকভাবে প্রত্যর্পণের দাবি জানালেও প্রতিটি ব্যক্তিকে ফেরানোর প্রক্রিয়া একই রকম নাও হতে পারে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন আন্দালিভ রহমান পার্থ। তিনি পুনরায় বলেন, বর্তমান সরকার গণমাধ্যমকে ‘কন্ট্রোল’ করতে চায় না। বরং প্রয়োজনীয় আইন ও নিয়মের মধ্যে খাতটিকে পরিচালনা এবং রেগুলেট করাই সরকারের লক্ষ্য।
তথ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেও একই অবস্থান জানিয়েছিলেন তিনি। তখন তিনি বলেছিলেন, গণমাধ্যম গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ এবং সরকারের কাজ জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নিয়েও সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন।
সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তথ্যপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে বিশ্বাসযোগ্য ও নিয়মতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির কথাই তিনি সামনে আনছেন।
তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বর্তমান বাস্তবতায় বিতর্কও রয়েছে। মঙ্গলবারই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তিন সাংবাদিককে ২০২৪ সালের আন্দোলনসংক্রান্ত মামলায় বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ওই মামলার প্রকৃতি এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে ‘গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করা হবে না’—তথ্যমন্ত্রীর এই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রয়োগ আগামী দিনে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণে থাকবে।
ব্রিফিংয়ে দেশের গুম পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন তথ্যমন্ত্রী। তার দাবি, গত ছয় মাসে দেশে কোনো গুমের ঘটনা ঘটেনি। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে গুমের অভিযোগ এবং এ নিয়ে গঠিত তদন্ত প্রক্রিয়ার তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতিকে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
তবে এই দাবির সঙ্গে মানবাধিকার সংস্থার তথ্য পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গত জুলাইয়ে মিরাজ শেখ নামের এক জেলের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রথম পরিচিত সম্ভাব্য ‘এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ বা বলপূর্বক গুমের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংগঠনটির দাবি, প্রত্যক্ষদর্শীরা তাকে কোস্ট গার্ড সদস্যদের হেফাজতে নিতে দেখেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে আদালতও তদন্তের নির্দেশ দেয়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রও চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত গুমসংক্রান্ত তথ্য আলাদাভাবে নথিবদ্ধ করেছে। ফলে তথ্যমন্ত্রীর ‘কোনো গুম হয়নি’ মন্তব্যকে সরকারের দাবি হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত; স্বাধীন মানবাধিকার পর্যবেক্ষণে অন্তত একটি গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশে গুমের ইতিহাস দীর্ঘ এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত তদন্ত কমিশন পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার ১,৬০০-এর বেশি অভিযোগ নথিভুক্ত করেছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে ২৫১ জনের অবস্থান এখনও অজানা ছিল।
তাই নতুন সরকারের সময়ে গুম প্রতিরোধের দাবি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয় নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি, স্বাধীন তদন্ত এবং অভিযোগ উঠলে দ্রুত স্বচ্ছ অনুসন্ধানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
সারের বাজার নিয়েও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে এবং জাতীয় পর্যায়ে কোনো প্রকৃত সংকট নেই। তবে কিছু এলাকায় বিতরণে অনিয়ম হচ্ছে বলে স্বীকার করেন তিনি।
সরকারের এই বক্তব্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্যের সঙ্গে মিলছে। কৃষি সচিব মো. সেলিম খান ১৬ আগস্ট রংপুরে এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছিলেন, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুদ ও বরাদ্দ রয়েছে। কৃত্রিম সংকট, অবৈধ মজুত, অতিরিক্ত দাম কিংবা চোরাচালান পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সব জায়গায় একই নয়। বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা নির্ধারিত মূল্যে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। কোথাও কোথাও নতুন ডিলার নিয়োগ এবং বিতরণ নীতিমালা ঘিরে অস্থিরতার খবরও পাওয়া গেছে।
ফলে সরকারের কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ শুধু কেন্দ্রীয় গুদামে পর্যাপ্ত সার রাখা নয়; কৃষকের হাতে নির্ধারিত মূল্যে এবং প্রয়োজনের সময় সেই সার পৌঁছে দেওয়া।
ব্রিফিংয়ে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, কোনো স্বাভাবিক সময়ে এই সরকার ক্ষমতায় আসেনি। দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিস্থিতি মিলিয়ে সরকার একটি ‘স্পর্শকাতর সময়’ পার করছে। মানুষ পাশে থাকলে সরকার এই সময় অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, যারা বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গা থেকে ফ্যাসিবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করা প্রয়োজন। তবে কোনো কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে গেলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও মন্তব্য করেন তথ্যমন্ত্রী।
এ ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। কারণ ‘ফ্যাসিবাদ’ কিংবা ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ শব্দের প্রয়োগ কোন পরিস্থিতিতে করা হচ্ছে, সেটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হতে পারে। সরকার যদি গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে রাজনৈতিক মতের সঙ্গে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের আইনি পার্থক্যও পরিষ্কার রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ কয়েকটি এলাকায় কনসার্ট ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিলের সিদ্ধান্ত নিরাপত্তাজনিত কারণে নেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার পর্যালোচনা করছে।
মাত্র কয়েক দিন আগে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়া আন্দালিভ রহমান পার্থ এখন এমন একটি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যার সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সরকারি তথ্যপ্রবাহ, সম্প্রচারনীতি এবং রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের প্রশ্ন সরাসরি যুক্ত।
প্রথম কয়েক দিনের বক্তব্যে তিনি বারবার গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ না করার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান, বিচারপ্রক্রিয়া এবং জাতীয় বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সরকারি বার্তা তুলে ধরছেন।
মঙ্গলবারের ব্রিফিংয়ে সবচেয়ে আলোচিত হয়েছে পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রশ্ন। শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে সংবেদনশীলতা তৈরি হয়েছে, সেটি এখন আর একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যর্পণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি পলাতক সবার ক্ষেত্রেই একই নীতি অনুসরণ করা হবে। তবে বাস্তবে সেই প্রত্যর্পণ কতটা সম্ভব হবে, সেটি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশের সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার ওপর।
আপাতত ঢাকার রাজনৈতিক বার্তা পরিষ্কার—শুধু শেখ হাসিনা নন, বিদেশে থাকা মামলার সব পলাতক আসামিকেই দেশে ফিরিয়ে বিচারের আওতায় দেখতে চায় সরকার।