প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, ভাঙাচোরা সড়ক, দুর্বল পয়ঃনিষ্কাশন এবং নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সংকট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। আগামী বর্ষার আগেই দৃশ্যমান ও টেকসই সমাধানের দাবি জানিয়ে তিনি বলেছেন, নগর পানিতে ডুবে যাওয়ার পর জনপ্রতিনিধিদের হাঁটু কিংবা কোমর পানিতে নেমে ছবি-ভিডিও করার দৃশ্য আর দেখতে চান না।
সোমবার (২৪ আগস্ট) চট্টগ্রাম নগরের স্টেশন রোড এলাকার একটি হোটেলে এনসিপির সাংগঠনিক কর্মসূচি শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এসব মন্তব্য করেন সারজিস। নগরের জলাবদ্ধতাকে মৌসুমি আলোচনার বিষয় না বানিয়ে সারা বছর পরিকল্পিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সারজিস বলেন, বর্ষা শেষ হওয়ার পর শরৎ, হেমন্ত ও শীতের সঙ্গে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার কথাও যেন সংশ্লিষ্টদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়। পরবর্তী বর্ষায় আবার নগর ডুবে গেলে জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পানিতে নেমে লোক দেখানো তৎপরতা শুরু হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার ভাষায়, “বর্ষা এলেই হাঁটু বা কোমর পানিতে নেমে শুটিং করার যে নাটক দেখা যায়, ২০২৭ সালে তা আর দেখতে চাই না।”
এনসিপির এই নেতা বিশেষভাবে ক্ষমতাসীন দল, সিটি করপোরেশন, জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উদ্দেশে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের মানুষ তাৎক্ষণিক উপস্থিতি বা ছবি তোলার রাজনীতি নয়, বরং কার্যকর সেবা ও স্থায়ী সমাধান চান।
তার বক্তব্যে উঠে আসে চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক গুরুত্বও। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, বড় শিল্পাঞ্চল এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে চট্টগ্রাম জাতীয় অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এমন একটি শহরের নাগরিকদের বছরের পর বছর জলাবদ্ধতার দুর্ভোগে পড়তে হওয়া গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন সারজিস।
তিনি মনে করেন, বর্তমান সরকারের হাতে এখনও সময় রয়েছে। আগামী বর্ষার আগেই পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব। তবে এজন্য বিচ্ছিন্ন প্রকল্প কিংবা সাময়িক ব্যবস্থা নয়, সমন্বিত নগর পরিকল্পনার প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা অবশ্য নতুন সমস্যা নয়। গত কয়েক বছর ধরে নগরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও ভারী বৃষ্টি হলেই বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে নগরের বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। প্রবর্তক মোড়, চকবাজার, কাতালগঞ্জ, রহমতগঞ্জ, ষোলশহর, মুরাদপুর, আগ্রাবাদ, হালিশহর ও নিউমার্কেটসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সড়ক জলমগ্ন হয়েছিল।
সেসময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা জলাবদ্ধতার জন্য একাধিক কারণের কথা বলেছিলেন। চলমান প্রকল্পের কারণে কিছু খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির বিষয়ও আলোচনায় আসে।
পরদিন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জলাবদ্ধ এলাকা পরিদর্শন করেন। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, নগরের ৩৬টি খালের সংস্কার ও পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করার দায়িত্ব চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছিল। প্রকল্প বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীর প্রকৌশল শাখাও যুক্ত রয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরে জানান, নির্মাণকাজের প্রয়োজনে খালে তৈরি কিছু অস্থায়ী বাঁধ সরিয়ে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করা হয়েছে। জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় ১৬টি কুইক রেসপন্স টিম গঠনের কথাও জানানো হয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটেই সারজিস প্রশ্ন তুলেছেন, একই সমস্যা নিয়ে বর্ষা এলেই কেন নতুন করে আলোচনা শুরু করতে হবে। তার মতে, বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পরপরই পরবর্তী বছরের প্রস্তুতি শুরু হওয়া উচিত।
চট্টগ্রামের রাস্তাঘাটের অবস্থাও তার সমালোচনায় এসেছে। নগরের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিছু সড়কের অবস্থা এতটাই খারাপ যে অসুস্থ ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার পথই নতুন ভোগান্তি তৈরি করতে পারে।
নগর উন্নয়নের আলোচনায় তিনি স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টিও যুক্ত করেন। সারজিস প্রশ্ন তোলেন, দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের মানুষকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কেন ঢাকামুখী হতে হবে।
তার মতে, একটি নগরকে শুধু সড়ক, ফ্লাইওভার কিংবা অবকাঠামো দিয়ে বিচার করলে চলবে না। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পয়ঃনিষ্কাশন এবং জনপরিবহন—সব খাতকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
চট্টগ্রামের জন্য আলাদা বড় পরিসরের উন্নয়ন পরিকল্পনার আহ্বান জানিয়ে সারজিস বলেন, শহরটিকে দেশের অর্থনৈতিক লাইফলাইন হিসেবে বিবেচনা করলে তার উন্নয়নেও একই মাত্রার গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু বর্ষাকালে সংকট মোকাবিলার পরিবর্তে কয়েক বছরের লক্ষ্য ধরে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামকে শুধু বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শহর নয়, আন্তর্জাতিক মানের নগর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং প্রকল্পের সময়সীমা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমানে একাধিক সংস্থা কাজ করছে। সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পৃথক দায়িত্ব রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সমন্বয়ের ঘাটতিই সমস্যা সমাধানের পথে অন্যতম বাধা হিসেবে আলোচিত হয়েছে।
একই খাল কিংবা ড্রেনেজ ব্যবস্থায় একাধিক প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকলে দায়িত্ব নির্ধারণও অনেক সময় জটিল হয়ে পড়ে। কোনো এলাকায় পানি জমলে সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অথবা প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার মধ্যে কার দায় কতটুকু—সেটি নিয়েও নাগরিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
সারজিসের বক্তব্যে সেই সমন্বয়হীনতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ তৈরির চেষ্টা দেখা গেছে। তিনি মনে করেন, ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানকে অজুহাতের পরিবর্তে ফলাফল দেখাতে হবে।
তবে জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ যে একেবারেই হচ্ছে না, এমন চিত্রও সঠিক নয়। সরকারি সংস্থাগুলো বিভিন্ন খাল পুনঃখনন, রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, ড্রেন সম্প্রসারণ এবং পানি চলাচলের প্রতিবন্ধকতা অপসারণের কাজ করছে।
মূল প্রশ্ন হচ্ছে, বিপুল অর্থ ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের পর সেই কাজ নাগরিক জীবনে কতটা স্থায়ী পরিবর্তন আনছে। বর্ষার কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক তলিয়ে গেলে প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
সারজিস আলম তাই সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার মতো করেই আগামী বর্ষার প্রসঙ্গ তুলেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের বর্ষায় একই চিত্র দেখা গেলে তা সরকারের ব্যর্থতা হিসেবেই বিবেচিত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে শুধু নগর সমস্যা নয়, এনসিপির সাংগঠনিক পরিকল্পনার কথাও বলেন সারজিস। দলটি আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানান তিনি। নভেম্বরের মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী ঘোষণার পরিকল্পনাও তুলে ধরেন।
এই সাংগঠনিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রামের সমস্যা নিয়ে তার বক্তব্য রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে নগর ও স্থানীয় সমস্যা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে।
তবে নাগরিকদের কাছে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকবে বাস্তব পরিবর্তন। বর্ষায় ঘরে পানি ঢোকা, দোকানপাট বন্ধ হওয়া, শিক্ষার্থীদের স্কুলে যেতে না পারা কিংবা রোগী নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে সমস্যা—এসব অভিজ্ঞতা শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক দিয়ে শেষ হয় না।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিন ধরে এমনই দৈনন্দিন দুর্ভোগের প্রতীক। প্রকল্প হয়েছে, পরিদর্শন হয়েছে এবং বহুবার আশ্বাসও এসেছে। এবার সারজিস আলমের দাবি, বর্ষার পানিতে দাঁড়িয়ে নতুন আশ্বাস নয়; বরং পানি নামার আগেই স্থায়ী সমাধানের কাজ দৃশ্যমান হোক।
তার বক্তব্যে তাই রাজনৈতিক কটাক্ষের পাশাপাশি একটি নাগরিক প্রত্যাশাও ফুটে উঠেছে—আগামী বর্ষায় যেন চট্টগ্রামবাসী একই পুরোনো দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি না দেখে।