‘হ্যাঁ অথবা না বলুন’—হুমায়ুন কবিরকে হাসনাত

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৬ বার

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, সে বিষয়ে সরাসরি ও স্পষ্ট জবাব চেয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তার বক্তব্য, প্রশ্নটির উত্তর খুব সহজ—‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। নাগরিকত্ব ত্যাগ করা হয়ে থাকলে সেই সংক্রান্ত প্রমাণও জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

সোমবার (২৪ আগস্ট) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া পোস্টে হাসনাত এ দাবি জানান। এর আগে একই দিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে হুমায়ুন কবির তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, সে বিষয়ে সরাসরি উত্তর দেননি। বরং নিজের বাংলাদেশি পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কোনো কারণ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, তিনি বাংলাদেশি এবং তার বাংলাদেশিত্ব কিংবা দেশের প্রতি অবস্থান নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলবেন বলে মনে করেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাগরিকত্ব নিয়ে চলা আলোচনার প্রসঙ্গে তিনি পাল্টা জানতে চান, কার এত উদ্বেগ এবং কেন তাকে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীন সময়ের প্রসঙ্গও টেনে আনেন।

এই প্রতিক্রিয়াকেই সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু করেছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তার দাবি, একজন মন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রীর নাগরিকত্বের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। এমন প্রশ্নের উত্তর সাংবাদিকদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ না করে তথ্য ও প্রমাণের মাধ্যমে দেওয়া উচিত।

হাসনাত তার পোস্টে লিখেছেন, হুমায়ুন কবিরের কাছে প্রশ্ন ছিল তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ছেড়েছেন কি না। উত্তর ‘হ্যাঁ’ হলে নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণ দেখানো সম্ভব। কিন্তু সরাসরি জবাব এড়িয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশে ব্যঙ্গাত্মক ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করাকে তিনি জবাবদিহির সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেন না।

হুমায়ুন কবির গত শুক্রবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর আগে তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। মন্ত্রিসভায় সাম্প্রতিক রদবদলের অংশ হিসেবে তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বণ্টন অনুযায়ী, হুমায়ুন কবির দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বিষয়, অনাবাসী বাংলাদেশিসংক্রান্ত কার্যক্রম এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া অন্যান্য দায়িত্ব দেখবেন। ফলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনায় তার দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ।

হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্বের প্রসঙ্গ আলোচনায় আসার পেছনে রয়েছে তার দীর্ঘ যুক্তরাজ্য-জীবন। সিলেটে জন্ম হলেও অল্প বয়সে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে চলে যান তিনি। সেখানে বড় হয়েছেন এবং উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। ব্রিটিশ লেবার পার্টির রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন। ক্রয়ডনের বেনশাম ম্যানর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং ২০১৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ক্রয়ডনের মেয়র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়।

এই অতীতের কারণেই প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে, তিনি মন্ত্রিসভায় প্রবেশের আগে বিদেশি নাগরিকত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ করেছেন কি না। এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে এ বিষয়ে হুমায়ুন কবিরের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তর পাওয়া যায়নি।

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ এ বিতর্কে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে অথবা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার কিংবা সংসদ সদস্য হিসেবে থাকার অযোগ্য হবেন। তবে জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক কেউ বিদেশি নাগরিকত্ব নেওয়ার পর সেই নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে তাকে এই বিধানের আওতায় বিদেশি নাগরিক বলে গণ্য করা হবে না।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য রয়েছে। হুমায়ুন কবির সংসদ সদস্য হিসেবে নয়, টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী, মন্ত্রিসভার একটি সীমিত অংশ সংসদ সদস্য নন এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকেও নিয়োগ করা যায়। তবে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সাংবিধানিক যোগ্যতা এবং বিদেশি নাগরিকত্বের বিষয়টি নিয়ে আইনগত প্রশ্ন ওঠায় বিষয়টি জনআলোচনায় এসেছে।

হাসনাত আবদুল্লাহ তার পোস্টে বলেন, সংবিধান, আইন ও বিধি সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। বিদেশি নাগরিকত্ব থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রের উচ্চ পদে দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করার দাবি জানান তিনি।

এনসিপির একজন নেতাও বিদেশি নাগরিকত্বের কারণে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি বলে উল্লেখ করেন হাসনাত। তার বক্তব্য, তারা সেই ক্ষেত্রে আইন মেনে নিয়েছেন। তাই অন্য কোনো দলের নেতার ক্ষেত্রেও ভিন্ন আচরণ কাম্য নয়।

হাসনাত আরও অভিযোগ করেন, জাতীয় নির্বাচনের সময় বিএনপির কয়েকজন প্রার্থী বিদেশি নাগরিকত্বসংক্রান্ত তথ্য গোপন করেছিলেন। তিনি টিআইবির একটি পর্যবেক্ষণের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তবে তার এই অভিযোগের বিস্তারিত প্রমাণ পোস্টে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এসব বক্তব্য রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।

হুমায়ুন কবিরের বিষয়ে হাসনাত ব্যক্তিগত বিরোধের অভিযোগও নাকচ করেন। তার ভাষ্য, হুমায়ুন কবির তাদের ‘শত্রু’ নন। দীর্ঘ সময় যুক্তরাজ্যে তারেক রহমানের সহযোগী হিসেবে কাজ করার কারণে প্রধানমন্ত্রী তার অতীত ও নাগরিকত্বের বিষয় সম্পর্কে জানতেন কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।

তবে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকলে সেটির আনুষ্ঠানিক প্রমাণ সরকার যাচাই করেছে কি না, সে বিষয়েও প্রকাশ্য কোনো সরকারি তথ্য এখনো সামনে আসেনি।

বিতর্কটি শুধু নাগরিকত্বেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সাংবাদিকদের সঙ্গে হুমায়ুন কবিরের আচরণ নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। বাংলাদেশি জার্নালিস্টস ইন ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া বা বিজেআইএম তার মন্তব্যকে ‘সংঘাতপূর্ণ ও অপেশাদার’ হিসেবে সমালোচনা করেছে। সংগঠনটি মনে করে, সাংবিধানিক যোগ্যতা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে।

হাসনাতও একই প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন। তার মতে, একজন কূটনীতিক কঠিন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেলেও সেটি ভদ্র ও কৌশলী ভাষায় সামাল দিতে পারেন। কিন্তু প্রশ্নকারী সাংবাদিকের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ কিংবা রাজনৈতিক ইঙ্গিত দেওয়া গণমাধ্যমের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

তিনি সতর্ক করেন, এমন পরিবেশ তৈরি হলে সাংবাদিকেরা ভবিষ্যতে ক্ষমতাসীনদের অস্বস্তিকর প্রশ্ন করতে দ্বিধা বোধ করতে পারেন। এর ফলে সংবাদমাধ্যমে স্ব-নিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-সেন্সরশিপের প্রবণতা বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

তবে হুমায়ুন কবির নিজেকে দেশপ্রেমিক হিসেবে তুলে ধরে সাংবাদিকদের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, গণমাধ্যম, নাগরিক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে একসঙ্গে দেশ এগিয়ে নিতে হবে।

এই অবস্থান দুই পক্ষের বিতর্ককে আরও স্পষ্ট করেছে। হুমায়ুন কবির নিজের জাতীয় পরিচয় ও দেশপ্রেমের ওপর জোর দিচ্ছেন। অন্যদিকে হাসনাত বলছেন, প্রশ্নটি দেশপ্রেম নিয়ে নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট আইনগত তথ্য নিয়ে।

ফলে বিষয়টির নিষ্পত্তির সবচেয়ে সহজ পথ হতে পারে নাগরিকত্বসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক অবস্থান পরিষ্কার করা। তিনি যদি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকেন, সেই তথ্য প্রকাশ পেলে বর্তমান বিতর্কের একটি বড় অংশ শেষ হতে পারে।

আর যদি নাগরিকত্ব এখনো বহাল থাকে, তাহলে তার মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব গ্রহণের আইনি ভিত্তি নিয়ে আরও ব্যাখ্যা প্রয়োজন হতে পারে। আইন বিশেষজ্ঞ, নির্বাচন কমিশন কিংবা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আনুষ্ঠানিক অবস্থান তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

হাসনাত তার পোস্টে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও বিদেশি নাগরিকত্ব গোপনের অভিযোগ তুলেছেন। তবে সেই দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিক্রিয়াও বর্তমান আলোচনায় পাওয়া যায়নি। তাই অভিযোগগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন সরকারের কাছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। মন্ত্রীদের সম্পদ, নাগরিকত্ব, যোগ্যতা কিংবা স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন ওঠা একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক নয়। এমন প্রশ্নের দ্রুত ও তথ্যভিত্তিক উত্তর রাজনৈতিক বিতর্ক কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

হুমায়ুন কবিরের ক্ষেত্রেও নাগরিকত্বের প্রশ্ন এখন ব্যক্তি পরিচয়ের বাইরে গিয়ে সরকারি জবাবদিহির ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। তিনি বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্যের কথা বলেছেন। হাসনাত আবার সেই বক্তব্যের বিরোধিতা না করেও একটি আনুষ্ঠানিক তথ্য জানতে চেয়েছেন।

ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে আপাতত একটি প্রশ্নই থেকে যাচ্ছে—হুমায়ুন কবির কি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ করেছেন?

হাসনাত আবদুল্লাহর ভাষায়, এর উত্তর দীর্ঘ ব্যাখ্যার নয়। “হ্যাঁ অথবা না—বলুন।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত