চলতি অর্থবছরেই পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৩ বার

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলতি অর্থবছরের মধ্যেই দেশের পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছেন। নির্বাচনী কার্যক্রমের জন্য বাজেটে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলারের বৈঠক হয়। সেখানে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ আলোচনার বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ—এই পাঁচ স্তরে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে ১৭ আগস্টও তিনি চলতি অর্থবছরের মধ্যে পাঁচ স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করার কথা জানিয়েছিলেন।

তবে সরকার সময়সীমার পরিকল্পনা জানালেও নির্বাচনের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষণা হয়নি। নির্বাচন আয়োজনের সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। ফলে কোন প্রতিষ্ঠানে কখন ভোট হবে কিংবা কোন ক্রমে বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সে সিদ্ধান্ত কমিশনই নেবে।

মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে আগামী সপ্তাহে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে সম্ভাব্য সময়সূচি এবং নির্বাচন আয়োজনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হতে পারে। ইসির সঙ্গে আলোচনার পর মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্রিফিং করবে বলেও জানান তিনি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা বাড়ছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত স্থানীয় প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব নাগরিক সেবা এবং স্থানীয় উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। দীর্ঘ সময় নির্বাচন না হলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়ে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে আসে।

সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চলতি অর্থবছরের মধ্যেই বিপুল সংখ্যক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ভোট আয়োজন করতে হবে। বাংলাদেশের অর্থবছর জুলাই থেকে পরবর্তী বছরের জুন পর্যন্ত গণনা করা হয়। সেই হিসাবে বর্তমান ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে নির্বাচন শেষ করার লক্ষ্য বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনের সামনে সময় এবং ব্যবস্থাপনা—দুই ক্ষেত্রেই বড় কর্মযজ্ঞ অপেক্ষা করছে।

দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজন হবে বিপুল সংখ্যক নির্বাচন কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, ভোটকেন্দ্র এবং নির্বাচনী সরঞ্জাম। একই সময়ে পাঁচ স্তরের সব নির্বাচন না হলেও ধাপে ধাপে ভোট আয়োজন করতে গেলে দীর্ঘ সময় ধরে মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে হবে।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আর্থিক প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। মীর শাহে আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর জন্য বাজেটে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এর আগেও তিনি জানিয়েছিলেন, পাঁচ স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করতে কমবেশি এই পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন হতে পারে।

তবে বরাদ্দ থাকা মানেই নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত হয়ে গেছে—এমন নয়। নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি, ভোটার তালিকা, নির্বাচনী এলাকার প্রশাসনিক পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মেয়াদসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়েই তফসিল নির্ধারণ করতে হবে।

গত জুলাইয়েও মীর শাহে আলম জানিয়েছিলেন, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আগামী এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। মঙ্গলবারের বক্তব্যে সেই সময়সীমা আরও নির্দিষ্ট করে চলতি অর্থবছরের মধ্যে নির্বাচন শেষ করার কথা জানানো হলো।

স্থানীয় নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের দাবি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকেও এসেছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে স্থানীয় পর্যায়ের অনেক সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হলে জনগণের সঙ্গে স্থানীয় সরকারের রাজনৈতিক সংযোগ দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে বলে রাজনৈতিক নেতারা বলে আসছেন।

বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা পর্যায়ে নাগরিকদের দৈনন্দিন অনেক কাজ সরাসরি স্থানীয় সরকারের ওপর নির্ভরশীল। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্র, স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক সংস্কার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

উপজেলা ও জেলা পরিষদের ক্ষেত্রেও উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং স্থানীয় পর্যায়ের সমন্বয়ে নির্বাচিত নেতৃত্বের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে বড় শহরগুলোতে সিটি করপোরেশন সরাসরি নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। সড়ক, বর্জ্য, জনস্বাস্থ্য, আলোকসজ্জা এবং বিভিন্ন নাগরিক সেবার মান নিয়ে মেয়র ও কাউন্সিলরদের জনগণের কাছে জবাবদিহির সুযোগ থাকে।

এ কারণে পাঁচ স্তরের নির্বাচন একই অর্থবছরে আয়োজন করা হলে এটি দেশের অন্যতম বড় নির্বাচনী কার্যক্রম হয়ে উঠবে। নির্বাচন কমিশনকে প্রতিটি স্তরের জন্য আলাদা তফসিল কিংবা একাধিক ধাপ নির্ধারণ করতে হতে পারে।

অবশ্য ভোটের সময়সূচি নিয়ে প্রতিমন্ত্রী নিজেও চূড়ান্ত কোনো ঘোষণা দেননি। তিনি পরিষ্কার করেছেন, তারিখ ও তফসিল নির্ধারণ করবে নির্বাচন কমিশন। সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা এবং আর্থিক প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে।

মঙ্গলবার ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে স্থানীয় নির্বাচন ছাড়াও রাজধানীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় দেশটির সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে ডেনমার্ক বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা দেবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

মীর শাহে আলম জানান, প্রকল্পটির এই পর্যায়ের ব্যয় প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ডেনমার্ক প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেবে। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা অনুদান হিসেবে পাওয়া যাবে। বাকি তিন হাজার কোটি টাকা সরকার আগামী ২০ বছরে পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মেঘনা নদী থেকে প্রতিদিন প্রায় ৯৫ কোটি লিটার পানি শোধন করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। রাজধানীতে নিরাপদ ও টেকসই পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ঢাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে বিকল্প উৎস থেকে পানি সংগ্রহের প্রয়োজন বাড়ছে। মেঘনা নদীর পানি পরিশোধনের সক্ষমতা বৃদ্ধি সেই চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

ডেনমার্কের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সহায়তার বিষয়ও এসেছে। মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সহায়তায় ডেনমার্ক প্রায় ১০০ কোটি টাকা দেবে।

তবে দিনের রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণা ছিল স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন আয়োজন এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্ন আলোচনায় রয়েছে।

এখন সরকারের পরিকল্পনার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হবে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক। সেই বৈঠকেই নির্বাচন কোন স্তর দিয়ে শুরু হতে পারে, কত ধাপে ভোট হবে এবং চলতি অর্থবছরের মধ্যে সব নির্বাচন বাস্তবে শেষ করা সম্ভব কি না—এসব বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, আর্থিক প্রস্তুতি সরকার ইতোমধ্যে রেখেছে। তবে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে শুধু অর্থ কিংবা সময়সূচির ওপর নয়। অবাধ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটারের আস্থা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের তৃণমূল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের সবচেয়ে বিস্তৃত কাঠামো স্থানীয় সরকার। ফলে পাঁচ স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন হলে ইউনিয়ন থেকে মহানগর পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক নাগরিক নতুন জনপ্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

এখন নজর থাকবে নির্বাচন কমিশনের দিকে। আগামী সপ্তাহে সরকারের সঙ্গে কমিশনের প্রত্যাশিত বৈঠকের পরই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য রোডম্যাপ আরও স্পষ্ট হওয়ার কথা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত