শাপলা চত্বর থেকে লালদীঘি, ৫ সেপ্টেম্বর লংমার্চ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৭ বার

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আগামী ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দান পর্যন্ত লংমার্চ করবে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। সকাল ৭টায় কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা। পথে অন্তত ছয় থেকে সাতটি স্থানে পথসভা হবে বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে তিনি লংমার্চের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শাপলা চত্বর থেকে যাত্রা শুরু করে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে কর্মসূচি শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

লংমার্চটি মূলত জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের পূর্বঘোষিত ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবিতে গত ৬ আগস্ট চারটি লংমার্চসহ নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল জোটটি। সেই ঘোষণা অনুযায়ী প্রথম লংমার্চটি হবে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম।

পরবর্তী কর্মসূচির মধ্যে ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেট অভিমুখে লংমার্চ রয়েছে। প্রথম তিনটি সড়কপথে হলেও সিলেটের কর্মসূচিটি রেলপথে আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির পর ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করার ঘোষণাও দিয়েছে ১১ দলীয় ঐক্য।

মিয়া গোলাম পরওয়ার জানিয়েছেন, ৫ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি সফল করতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংলগ্ন বিভিন্ন সাংগঠনিক শাখাকে প্রস্তুত করা হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী ও চট্টগ্রামসহ সংশ্লিষ্ট নয়টি জেলা ও মহানগর শাখার নেতাদের নিয়ে প্রস্তুতি বৈঠক চলছে।

জামায়াতের পাশাপাশি ইসলামী ছাত্রশিবির, শ্রমিক সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংগঠনের নেতারাও প্রস্তুতি কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন। দলটির প্রত্যাশা, ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে যাত্রা শুরুর পর মহাসড়কের বিভিন্ন স্থান থেকে নতুন নতুন যানবাহন ও অংশগ্রহণকারী বহরে যুক্ত হবেন।

গোলাম পরওয়ার দাবি করেছেন, শুরুতেই এক হাজারের বেশি যানবাহন লংমার্চে যুক্ত হতে পারে। পথিমধ্যে আরও বহু গাড়ি যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন তিনি। তবে অংশগ্রহণকারী কিংবা যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা কর্মসূচির দিনই স্পষ্ট হবে।

এর আগে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রস্তুতি বৈঠকে শাপলা চত্বরে লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছিল। সেখান থেকে লংমার্চটি নারায়ণগঞ্জের মদনপুর, কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড এবং চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে পথসভা করার কথা। চট্টগ্রামে পৌঁছানোর আগে আরও কয়েকটি স্থানে পথসভা যোগ হতে পারে বলে মঙ্গলবারের ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন জামায়াত নেতারা।

পথসভাগুলোতে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেবেন। এসব সমাবেশে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক সংস্কারের মতো বিষয় সামনে আসতে পারে। জোটের আগের কর্মসূচিতে এসব দাবিই গুরুত্ব পেয়েছে।

লংমার্চ পরিচালনায় আলাদা আলাদা বিভাগ গঠনের কথাও জানিয়েছেন গোলাম পরওয়ার। অভ্যর্থনা, পরিবহন, চিকিৎসা, স্বেচ্ছাসেবক, প্রচার, তথ্যপ্রযুক্তি, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক যোগাযোগের দায়িত্ব ভাগ করা হয়েছে।

দীর্ঘ প্রায় ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টার সম্ভাব্য কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচল, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসা সহায়তা এবং শৃঙ্খলা রক্ষা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এ কারণে আগেভাগেই বিভিন্ন বিভাগকে গাইডলাইন দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে ১১ দলীয় ঐক্য। ৫ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চসহ চার রুটের কর্মসূচি সম্পর্কে পুলিশকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। নিরাপত্তা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশের সহযোগিতা চেয়ে ২৪ আগস্ট পুলিশ মহাপরিদর্শকের সঙ্গেও বৈঠক করেছে জোটের প্রতিনিধিদল।

বৈঠকের পর গোলাম পরওয়ার সাংবাদিকদের বলেছেন, লংমার্চ ঘিরে তারা কোনো বিশেষ নিরাপত্তা আশঙ্কা দেখছেন না। তিনি কর্মসূচিকে গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে বর্ণনা করেন এবং এটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদ জানান।

জামায়াত নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ ডিআইজি, পুলিশ সুপার, থানা পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে কর্মসূচির রুট ও গুরুত্বপূর্ণ স্পট সম্পর্কে অবহিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবকদেরও পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোথাও উত্তেজনা কিংবা ট্রাফিক সংকট তৈরি হলে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবিলার পরামর্শ দিয়েছেন দলের নেতারা।

বড় উদ্বেগগুলোর একটি হচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে স্বাভাবিক যান চলাচল। দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল করে। হাজারো যানবাহনের রাজনৈতিক বহর যুক্ত হলে বিভিন্ন পয়েন্টে যানজট তৈরির ঝুঁকি রয়েছে।

গোলাম পরওয়ার নিজেও সম্ভাব্য দুর্ভোগের কথা স্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য, মহাসড়কের একটি অংশ দিয়ে লংমার্চ পরিচালনা করে অন্য অংশ সাধারণ যানবাহনের জন্য চালু রাখার চেষ্টা করা হবে।

তবে যাত্রাবিরতি ও পথসভার সময় সাময়িক যানজট তৈরি হতে পারে বলে তিনি আগাম সতর্ক করেছেন। এ কারণে পথের দুই পাশের দোকানদার, রিকশাচালক, ফেরিওয়ালা, দিনমজুর ও সাধারণ যাত্রীদের কাছে দলটির পক্ষ থেকে আগাম দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি।

রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল বাধাগ্রস্ত না করার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে কাঁচপুর, মদনপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা, ফেনী ও মিরসরাইয়ের মতো ব্যস্ত অংশে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বড় পরীক্ষা হতে পারে।

জামায়াত বলছে, কর্মসূচিকে সংঘাতমুক্ত রাখতে তাদের পক্ষ থেকে উসকানিমূলক কার্যক্রম এড়িয়ে চলা হবে। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং ১১ দলীয় ঐক্যের বাইরে থাকা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কাছেও সহযোগিতা চেয়েছে তারা।

গোলাম পরওয়ার বলেন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে লংমার্চ একটি নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি। জোটের রাজনৈতিক দাবিগুলোকে জনগণের দাবি হিসেবে তুলে ধরে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা ও সমর্থন প্রত্যাশা করেন তিনি।

বর্তমান জাতীয় সংসদে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ১১ দলীয় ঐক্যের জন্য এটি নির্বাচনের পর প্রথম বড় মাঠের কর্মসূচিগুলোর একটি। ফলে লংমার্চটি শুধু একটি দাবিভিত্তিক কর্মসূচি নয়, বিরোধী জোটের মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের উপলক্ষ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

আগের প্রস্তুতি সভাগুলোতে জামায়াত নেতারা বলেছেন, স্থানীয় পর্যায়ের দলীয় কর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষকে কর্মসূচিতে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় প্রচার চালানো হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে লংমার্চ, রোডমার্চ ও পদযাত্রার মতো কর্মসূচি ব্যবহার হয়ে আসছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়।

এবারের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চে শাপলা চত্বর ও লালদীঘি—দুটি রাজনৈতিকভাবে প্রতীকী স্থানকে শুরু ও শেষের কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। শাপলা চত্বর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলনের স্মৃতিবহ জায়গা। অন্যদিকে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানও দীর্ঘদিন ধরে বড় রাজনৈতিক সভা ও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

ফলে ৫ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিকে ঘিরে রাজনৈতিক আগ্রহ বাড়ছে। অংশগ্রহণ কত বড় হয়, পথসভাগুলোতে কী বার্তা দেওয়া হয় এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের স্বাভাবিক চলাচল কতটা বজায় রাখা যায়—এসব বিষয়েই নজর থাকবে।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের ঘোষণা অনুযায়ী, ৫ সেপ্টেম্বরের লংমার্চ দিয়ে শুরু হবে কয়েক মাসব্যাপী ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচি। চট্টগ্রামের পর রংপুর, খুলনা ও সিলেট হয়ে সেই কর্মসূচির শেষ ধাপ হিসেবে নভেম্বরে ঢাকায় মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত