প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা উদ্বেগজনকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ সদরদপ্তর ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীসহ সারাদেশে অন্তত ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্রুপে সদস্য সংখ্যা ৪ হাজার ৩৬২ জন। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও সেবন, হামলা, অস্ত্র প্রদর্শন এবং আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এসব গ্রুপের সদস্যরা।
সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের এমন তৎপরতার শিকার হন কনটেন্ট ক্রিয়েটর মো. হানিফ। গত ২২ আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রায়েরবাজার কমিউনিটি সেন্টারের সামনে এক তরুণ তাঁর পথরোধ করে তাঁকে একটি চিপাগলিতে নেওয়ার চেষ্টা করে। হানিফ সেখানে না গেলে ওই তরুণ তাঁকে ‘পকেটমার’ বলে চিৎকার শুরু করে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে হানিফ তাঁর পরিচিত ব্যবসায়ী ও বন্ধু ওমর ফারুককে ডেকে আনেন। একপর্যায়ে ওই তরুণকে মারধর করা হলে সে সেখান থেকে পালিয়ে যায়। প্রায় ১০ মিনিট পর চারজনকে সঙ্গে নিয়ে সে আবার ফিরে আসে। তাদের কারও হাতে চাপাতি, কারও হাতে সামুরাই ছিল। তারা হানিফ ও ফারুককে খুঁজতে থাকে। আতঙ্কে ফারুক একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। হানিফ ছুটে যান পাশের রায়েরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, মোহাম্মদপুরে দিনদুপুরেও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের এমন তৎপরতা দেখা যায়। হানিফের অভিযোগ, নিজেকে ‘সুমন গ্রুপের সদস্য’ পরিচয় দেওয়া ওই তরুণ ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে তাঁকে চিপাগলিতে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। পরে তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে।
পুলিশ সদরদপ্তরের সাম্প্রতিক তালিকা অনুযায়ী, রাজধানী বাদে দেশের বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় ২২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্রুপে সদস্য সংখ্যা ২ হাজার ৫৫০। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে ৯৮টি, খুলনায় সাতটি, রাজশাহীতে ১৩টি, সিলেটে ১৫টি এবং গাজীপুর মহানগরে ১৩টি গ্রুপ রয়েছে। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে নোয়াখালীতে—২৫টি।
অন্যদিকে ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ১৫৯টি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য সংখ্যা ১ হাজার ৮১২। ঢাকার মধ্যে মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় সবচেয়ে বেশি ২৭টি গ্রুপ রয়েছে। এসব গ্রুপে সদস্য সংখ্যা অন্তত ৩৫০। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পল্লবী, যেখানে ১৬টি গ্রুপে অন্তত ১৬০ সদস্য রয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে পুলিশের তালিকার বাইরেও আরও কিছু কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এসব গ্রুপের সদস্যদের বয়স ১৮ বছরের নিচে হলেও অনেক ক্ষেত্রে তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্করাও এসব দলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
মতিঝিল বিভাগের খিলগাঁও থানা এলাকায় পুলিশের তালিকায় সাতটি গ্রুপ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৯৯৯ গ্রুপ, কেজি ১৯, ০০১ টিকটক গ্রুপ, ০০৭ টিকটক গ্রুপ, আলিফ গ্রুপ ও তারেক গ্রুপ উল্লেখযোগ্য। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে তসলিম গ্রুপ ও রেড লাইন গ্রুপেরও তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব গ্রুপের সদস্যরা দলবদ্ধ হয়ে চাপাতি নিয়ে মহড়া দেয়। কখনো পাকা সড়কে চাপাতি ঘষে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অস্ত্রের মহড়ার ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা হয়। কিছু সদস্য মাদক সেবন ও ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত।
গত ২৮ জুন খিলগাঁওয়ের সি ব্লকে রেড লাইন ও ৯৯৯ গ্রুপের সদস্যরা চাপাতি নিয়ে মহড়া দেওয়ার সময় কলেজছাত্র সৌরভ মাহমুদকে মারধর করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় তাঁর বাবা খিলগাঁও থানায় মামলা করেন। পুলিশ জানায়, ওই ঘটনায় তিন কিশোরকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছিল। পরে তারা জামিনে মুক্তি পায়।
তেজগাঁও বিভাগের ছয় থানায়ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে। ডিএমপির হিসাবে মোহাম্মদপুরে ২৭টি, আদাবরে ছয়টি, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে তিনটি, তেজগাঁও ও শেরেবাংলা নগরে একটি করে এবং হাতিরঝিলে দুটি গ্রুপ রয়েছে। এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তার, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। দেয়ালে নিজেদের গ্রুপের নাম লিখে তারা এলাকায় প্রভাব বিস্তারের জানান দেয়।
মোহাম্মদপুর এলাকায় ডাইল্লা গ্রুপ, পাটালি গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, অ্যালেক্স গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, লও ঠেলা গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, নবী গ্রুপ, ল্যাংড়া নুরু ও কিং শাওনসহ বিভিন্ন নামের গ্রুপ রয়েছে। প্রতিটি গ্রুপে ১০ থেকে ২৫ জন পর্যন্ত সদস্য থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখল এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ভাড়ায় অংশ নেওয়াকে এসব গ্রুপের আয়ের উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরে দুই কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষে অ্যালেক্স গ্রুপের দলনেতা মো. ইমন ওরফে অ্যালেক্স ইমন নিহত হন। এর তিন দিন পর ১৫ এপ্রিল রাতে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে আসাদুল নামে আরেক যুবক নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবুজবাগের বাসাবো ও কদমতলা এলাকাতেও কিশোর গ্যাংয়ের নামে সক্রিয় বিভিন্ন গ্রুপের সন্ধান পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব দলের কিছু সদস্যের বয়স ২৮ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত। তাদের কেউ কেউ মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। কদমতলা এলাকায় শুভ ওরফে চীনা শুভর গ্রুপে অন্তত ১০ জন সদস্য রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
ডেমরা থানা এলাকায় পুলিশের তালিকায় তিনটি কিশোর গ্যাং রয়েছে। তবে স্থানীয়ভাবে রেম্বো সাগর ওরফে ইমন গ্রুপ, নাহিদ গ্রুপ ও হোসেন গ্রুপসহ আরও কয়েকটি গ্রুপের নাম পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর এসব দলের সদস্যরা বিভিন্ন সড়কে আড্ডা দেয় এবং সুযোগ বুঝে পথচারীদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেয়। ভয়ে অনেকে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতেও সাহস পান না।
ডিএমপির মিরপুর বিভাগে সাত থানায় ৩৫টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এর মধ্যে পল্লবীতে ১৬টি, দারুসসালামে ছয়টি, শাহআলীতে চারটি, মিরপুরে তিনটি এবং কাফরুল, ভাসানটেক ও রূপনগরে দুটি করে গ্রুপ রয়েছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা চাঁদাবাজি ও মাদকের মতো বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের মধ্যে ‘হিরোইজম’ দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। এর সঙ্গে আর্থিক সংশ্লিষ্টতা থাকায় তারা সহজেই সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়েছিল। বর্তমানে অভিযান চালিয়ে অনেককে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং মামলা হয়েছে। পুলিশের তৎপরতায় পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলেও তিনি দাবি করেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে কেউ যেন কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার বা পৃষ্ঠপোষকতা করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার পেছনে একাধিক সামাজিক ও পারিবারিক কারণ রয়েছে। অভিভাবকদের উদাসীনতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, মূল্যবোধের সংকট, অসৎ সঙ্গ, বাহাদুরি দেখানোর প্রবণতা, সুস্থ বিনোদনের অভাব, মানসিক হতাশা ও কর্মহীনতা এর অন্যতম কারণ। পাশাপাশি কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতাও কিশোর অপরাধ বাড়িয়ে তুলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত কিশোরদের পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক শিষ্টাচারের প্রতি অনাগ্রহী তরুণরাও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ‘বড় ভাই’ সংস্কৃতির মাধ্যমে রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য পূরণ, আধিপত্য বিস্তার এবং মাদকের বাজার নিয়ন্ত্রণও কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির কারণ।
কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি কিশোরদের অপরাধে ব্যবহারের পেছনে থাকা পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।