প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডির দুই দশক পূর্ণ হলেও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রস্তাব বাতিলসহ ঐতিহাসিক ছয় দফা চুক্তির মূল দাবিগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। এর মধ্যে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর উন্মুক্ত খনি নিয়ে দেওয়া মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে শঙ্কা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে। চাষযোগ্য কৃষিজমি, বসতভিটা ও পরিবেশ রক্ষার দাবিতে আবারও একাট্টা হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্দোলনকারীরা।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সঙ্গে করা ছয় দফা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবিতে বুধবার ফুলবাড়ীতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দুই দশক আগের আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে উন্মুক্ত কয়লাখনি বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করতে চান আন্দোলনকারীরা।
জেলা সদর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে ফুলবাড়ী এলাকায় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এশিয়া এনার্জি প্রায় ৫৭২ মিলিয়ন টন উচ্চমানের কয়লার মজুত শনাক্ত করেছিল। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রস্তাব দেয়। এতে চাষযোগ্য কৃষিজমি ও বসতভিটা হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এর প্রতিবাদে ২০০৬ সালে আন্দোলনে নামেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ওই বছরের আন্দোলনের এক পর্যায়ে ছোট যমুনা সেতুর পূর্ব পাশে মিছিলে গুলির ঘটনা ঘটে। এতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম, ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম ও সালেকিন নিহত হন।
এরপর ফুলবাড়ীসহ উত্তরাঞ্চলে শুরু হয় কঠোর হরতাল ও অবরোধ। দীর্ঘ আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছয় দফা চুক্তি করতে বাধ্য হয়। চুক্তিতে এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বহিষ্কার, উন্মুক্ত কয়লাখনি বন্ধ, নিহতদের ক্ষতিপূরণ, আহতদের চিকিৎসা, শহীদ স্মৃতিসৌধ নির্মাণ এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
তবে দুই দশক পরও চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ আন্দোলনকারীদের। তাদের ভাষ্য, কিছু ক্ষতিপূরণ এবং স্মৃতিসৌধ নির্মাণের বরাদ্দ পাওয়া গেলেও উন্মুক্ত খনির প্রস্তাব বাতিলসহ মূল দাবিগুলো এখনো উপেক্ষিত।
তেল-গ্যাস জাতীয় কমিটি ফুলবাড়ী শাখার আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ছয় দফা চুক্তির বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে গড়িমসি করেছে। বর্তমান সরকারের কাছে তিনি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের হাতে জাতীয় সম্পদ তুলে না দেওয়ার দাবি জানান।
খনি আন্দোলনের নেতা এম এ কাইয়ুম আনসারী বলেন, প্রায় ৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকা এবং হাজার হাজার হেক্টর উর্বর কৃষিজমি ধ্বংস করে ফুলবাড়ীতে কোনো কয়লা খনি করতে দেওয়া হবে না। মাটি, মানুষ ও পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান দাবি।
জাতীয় কমিটির নেতারা, স্থানীয় সাবেক মেয়র মাহমুদ আলম লিটন এবং বিএনপি নেতা অধ্যক্ষ মো. খুরশিদ আলম মতিও উন্মুক্ত কয়লাখনির বিরোধিতা করেছেন। তাদের বক্তব্য, ফুলবাড়ীর কৃষিজমি ও পরিবেশ রক্ষা করে ছয় দফা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে হবে। এর বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত স্থানীয় মানুষ মেনে নেবে না।
২০০৬ সালের আন্দোলনের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন আহতদের অনেকে। তাদের মধ্যে সুজাপুর গ্রামের বাবলু রায় অন্যতম। আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর দীর্ঘ চিকিৎসাতেও তিনি আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। শরীরের নিম্নাংশ অবশ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে হুইলচেয়ারে জীবন কাটছে তাঁর। আর্থিক সংকটে তাঁর চিকিৎসা ও সন্তানদের পড়াশোনাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
বাবলু রায়ের প্রত্যাশা, জীবদ্দশাতেই তিনি ছয় দফা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারবেন।
এদিকে ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডির স্মরণে বুধবার বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে শোক র্যালি, শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং গণসমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। সকাল ১০টায় নিমতলা মোড়ে জাতীয় কমিটির উপজেলা আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েলের সভাপতিত্বে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন জাতীয় কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ।