প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) ঘিরে নতুন করে আর্থিক হিসাব ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন সামনে এসেছে। রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারের দাপ্তরিক খরচের হিসাব নিয়ে আপত্তি তুলে তার কোনো কর্মকাণ্ডের দায় নেবে না বলে জানিয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির। একই সঙ্গে রাকসু নির্বাচন নিয়মিত করা, শিক্ষার্থীদের আবাসন নিশ্চিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামো কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেট চত্বরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল রাকসুর দাপ্তরিক খরচের জন্য অর্থ উত্তোলন ও বিভিন্ন দপ্তরের নামে ব্যয় দেখানোর বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জিএস দাপ্তরিক কাজের কথা উল্লেখ করে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা তুলেছেন। তবে শিবিরের প্রতিনিধিদের হিসাব অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে প্রকৃত খরচ এর তুলনায় অনেক কম হওয়ার কথা।
মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, বিভিন্ন দপ্তরের নামে দেখানো ব্যয়ের পরিমাণ তাদের কাছে বাস্তবসম্মত মনে হয়নি। তার দাবি, সব দপ্তর মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ হওয়ার কথা। ফলে উত্তোলন করা অর্থের ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। কোন দপ্তরে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তার প্রমাণসহ পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার শিবিরের প্যানেলের প্রার্থী ছিলেন না—এ বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, তিনি তাদের প্যানেলের সদস্য না হওয়ায় তার কর্মকাণ্ড কিংবা আর্থিক ব্যবস্থাপনার কোনো দায় ছাত্রশিবির নেবে না। এর মধ্য দিয়ে রাকসুর নেতৃত্ব ও সংগঠনের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে একটি স্পষ্ট দূরত্ব তুলে ধরেছে শিবির।
রাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও সংবাদ সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানানো হয়। শিবিরের পক্ষ থেকে পরবর্তী নির্বাচনের তপশিল দ্রুত ঘোষণা এবং নিয়মিত নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য, বর্তমান রাকসু নির্বাচনের পর ইতোমধ্যে প্রায় ১০ মাস সময় পার হয়ে গেছে। এখন থেকেই পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করা প্রয়োজন, যাতে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হয়।
শিবির সভাপতি রাকসু নির্বাচনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডারের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। তার মতে, প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করতে হলে নির্বাচনকে একটি নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আনতে হবে। এ জন্য একাডেমিক ক্যালেন্ডারে রাকসু নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করা হলে ভবিষ্যতে নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার সুযোগ কমবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
রাকসু নির্বাচনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট নিয়েও দাবি জানানো হয়েছে। শিবির শতভাগ আবাসিকতা নিশ্চিত করার জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে। যেসব শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন না, তাদের জন্য আবাসন ভাতা চালুর দাবিও করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আবাসিক হলের বাইরে থেকে পড়াশোনা করায় তাদের আবাসন ব্যয় ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। এই পরিস্থিতি বিবেচনায় অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য ভাতা চালুর প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ছাত্রশিবির। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক মেডিকেল সেন্টার প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়েছে। বড় একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর চিকিৎসা অবকাঠামো থাকা জরুরি উল্লেখ করে সংগঠনটি এ বিষয়ে প্রশাসনের দ্রুত উদ্যোগ প্রত্যাশা করেছে।
এ ছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট কার্যকর করার দাবিও জানিয়েছে শিবির। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে সিনেটের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করে সংগঠনটি। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো কার্যকর থাকলে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
সংবাদ সম্মেলনে রাকসুর গত ১০ মাসের কার্যক্রম নিয়েও নিজেদের মূল্যায়ন তুলে ধরে শিবির। সংগঠনটির সভাপতি দাবি করেন, ক্যাম্পাসে আগের তুলনায় ট্যাগিং, ফ্রেমিং কিংবা নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানি ও বুলিংয়ের মতো ঘটনা কমেছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে মাদকের বিস্তার আগের মতো নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সহাবস্থান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। একই সঙ্গে আসন বাণিজ্য, গেস্টরুম ও গণরুম সংস্কৃতি বন্ধ হয়েছে বলে উল্লেখ করেন শিবির সভাপতি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলের আসন বণ্টনে এখন মেধা ও সিনিয়রিটিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এটিকে রাকসুর সময়কালের অন্যতম বড় পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তবে এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং আর্থিক হিসাবের পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত। বিশেষ করে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা উত্তোলন এবং তার বিপরীতে প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার নিষ্পত্তির জন্য রাকসু কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত হিসাব প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি রাকসুর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
রাকসুর মতো শিক্ষার্থী প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা, নিয়মিত নির্বাচন এবং জবাবদিহি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ড শুধু ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক বিষয় নয়, বরং বৃহত্তর শিক্ষার্থীসমাজের প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে যুক্ত। ফলে আর্থিক লেনদেন থেকে শুরু করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—সব ক্ষেত্রেই স্পষ্ট তথ্য ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বজায় রাখার প্রত্যাশা থাকে।
রাকসুকে ঘিরে শিবিরের সাম্প্রতিক অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, সংগঠনটি একদিকে বর্তমান জিএসের আর্থিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের দূরত্ব স্পষ্ট করতে চাইছে, অন্যদিকে পরবর্তী নির্বাচন ও শিক্ষার্থীদের মৌলিক সুবিধার বিষয়গুলোকে সামনে আনতে চাইছে। বিশেষ করে নিয়মিত নির্বাচন, আবাসন, চিকিৎসাসেবা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট কার্যকর করার দাবি ভবিষ্যতে রাকসুর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে শিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান, বিভিন্ন হলের নির্বাচিত রাকসু প্রতিনিধি এবং সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। এখন রাকসু কর্তৃপক্ষ দাপ্তরিক ব্যয়ের বিষয়ে কী ব্যাখ্যা দেয় এবং পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আবাসন, চিকিৎসা ও নিয়মিত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবিগুলো বাস্তবায়নে প্রশাসনের উদ্যোগও পর্যবেক্ষণে থাকবে।