প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কোমরব্যথা খুব পরিচিত একটি শারীরিক সমস্যা। দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, ভুল ভঙ্গিতে বসা, ভারী জিনিস তোলা কিংবা শারীরিক পরিশ্রমের কারণে অনেকেরই মাঝেমধ্যে কোমরে ব্যথা হয়। তবে এই ব্যথা যখন কোমর ছাড়িয়ে নিতম্ব, ঊরু হয়ে পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন বিষয়টি শুধু সাধারণ কোমরব্যথা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে মেরুদণ্ডের ডিস্ক, স্নায়ু, পেশি কিংবা বয়সজনিত বিভিন্ন সমস্যার সম্পর্ক থাকতে পারে।
বিশেষ করে পায়ে ঝিনঝিনি, অবশভাব, জ্বালাপোড়া, অসাড়তা বা দুর্বলতার মতো উপসর্গ থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ কোমরের নিচের অংশ থেকে পায়ের দিকে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুগুলোর কোনো একটিতে চাপ বা জ্বালা তৈরি হলে সেই স্নায়ুর পথ ধরে ব্যথা নিতম্ব ও পায়ের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ব্যথার ধরন ও অন্যান্য উপসর্গের ওপর নির্ভর করে এর কারণও ভিন্ন হতে পারে।
কোমরের নিচের মেরুদণ্ড থেকে শরীরের নিচের অংশে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু চলে গেছে। মেরুদণ্ডের কোনো অংশে পরিবর্তন বা স্নায়ুর ওপর চাপ তৈরি হলে কোমরের ব্যথা পায়ের দিকে ছড়িয়ে যেতে পারে। অনেক সময় মেরুদণ্ডের ডিস্কের সমস্যার কারণে এমনটি হয়। ডিস্কের কোনো অংশ সরে গিয়ে স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করলে ব্যথা কোমর থেকে নিতম্ব ও পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সায়াটিক নার্ভে চাপ বা প্রদাহও এ ধরনের ব্যথার অন্যতম পরিচিত কারণ। পাশাপাশি কোমরের পেশিতে টান, মেরুদণ্ডের বয়সজনিত ক্ষয়, স্পাইনাল স্টেনোসিস বা মেরুদণ্ডের ভেতরের জায়গা সরু হয়ে যাওয়া, দীর্ঘ সময় ভুল ভঙ্গিতে বসে থাকা এবং ভারী জিনিস ভুলভাবে তোলার কারণেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
যারা দীর্ঘ সময় গাড়ি চালান কিংবা দিনের বড় একটি সময় বসে কাজ করেন, তাদের ক্ষেত্রেও কোমরের ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ পড়তে পারে। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত ওজন এবং কোমর বা মেরুদণ্ডে আঘাতের ইতিহাসও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কোমর থেকে নিতম্ব হয়ে সাধারণত এক পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়া ব্যথাকে অনেক সময় সায়াটিকা বলা হয়। এ ধরনের ব্যথা কারও ক্ষেত্রে নিতম্ব থেকে ঊরু হয়ে পায়ের নিচের অংশ পর্যন্ত যেতে পারে। ব্যথার সঙ্গে পায়ে ঝিনঝিনি, অবশভাব, জ্বালাপোড়া কিংবা দুর্বলতাও দেখা দিতে পারে।
তবে কোমর থেকে পায়ে ব্যথা হলেই সেটি সায়াটিকা—এমন ধারণা ঠিক নয়। একই ধরনের উপসর্গ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণে দেখা দিতে পারে। তাই দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র ব্যথার ক্ষেত্রে নিজে থেকে রোগ নির্ধারণ না করে চিকিৎসকের মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
এ ধরনের সমস্যায় কোমরে ব্যথা বা শক্তভাবের পাশাপাশি নিতম্বে অস্বস্তি হতে পারে। ব্যথা ধীরে ধীরে ঊরু ও পায়ের দিকে ছড়িয়ে যেতে পারে। কারও পায়ে ঝিনঝিন অনুভূতি হতে পারে, আবার কেউ অবশ বা অসাড়তার কথা বলতে পারেন। অনেকের ক্ষেত্রে পায়ে জ্বালাপোড়া কিংবা বিদ্যুৎ চলার মতো তীব্র ব্যথাও অনুভূত হয়।
স্নায়ুর ওপর চাপ বেশি হলে পায়ের পেশিতে দুর্বলতা তৈরি হতে পারে। হাঁটা বা স্বাভাবিক চলাফেরায় অস্বস্তিও দেখা দিতে পারে। দীর্ঘ সময় বসে থাকার পর ব্যথা বাড়তে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে কাশি বা হাঁচির সময় কোমর ও পায়ের ব্যথা আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
ব্যথা কতদিন ধরে রয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আকস্মিক বা তীব্র ব্যথা অনেক সময় ভারী জিনিস তোলা, পড়ে যাওয়া কিংবা পেশিতে টান লাগার পর শুরু হতে পারে। কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকা ব্যথা উপতীব্র পর্যায়ে থাকতে পারে। আর দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকা বা বারবার ফিরে আসা ব্যথা দৈনন্দিন জীবন, কাজকর্ম ও চলাফেরায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোমরব্যথাকে সময়কাল অনুযায়ী তীব্র, উপতীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী পর্যায়ে বিবেচনা করে। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে কোমরব্যথার প্রকোপও বাড়তে পারে।
দীর্ঘ সময় বসে কাজ করেন এমন ব্যক্তিদের কোমরব্যথার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। একইভাবে একটানা গাড়ি চালানো, নিয়মিত ভারী শ্রম করা কিংবা কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় শারীরিক চাপের মধ্যে থাকাও কোমরের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।
ভুল অঙ্গভঙ্গিতে বসা বা দাঁড়ানো, ব্যায়ামের অভাব এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাও সমস্যা বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত ওজনের কারণে মেরুদণ্ড ও কোমরের ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে মেরুদণ্ডে বিভিন্ন স্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেওয়ায় বয়স্কদের মধ্যেও কোমরব্যথা বেশি দেখা যায়।
ধূমপান এবং অতীতে কোমরব্যথার ইতিহাসও কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কোমরব্যথা যেকোনো বয়সে হতে পারে, তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে এর প্রকোপ বৃদ্ধি পায় এবং মধ্যবয়সে এর বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
কোমর থেকে পায়ে ব্যথা হলেই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ব্যবস্থাপনায় উপসর্গ কমে যেতে পারে। কিন্তু কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
পায়ের দুর্বলতা যদি দ্রুত বাড়তে থাকে, দুই পায়ে তীব্র অবশভাব দেখা দেয়, কিংবা যৌনাঙ্গ ও ঊরুর ভেতরের অংশে নতুন করে অসাড়তা তৈরি হয়, তাহলে অপেক্ষা করা উচিত নয়। একইভাবে প্রস্রাব বা পায়খানা নিয়ন্ত্রণে নতুন সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
গুরুতর আঘাতের পর কোমরব্যথা শুরু হলে, জ্বরের সঙ্গে তীব্র ব্যথা হলে অথবা ব্যথা ক্রমশ বাড়তে থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা থাকলেও বিষয়টি অবহেলা না করে কারণ নির্ণয় করা প্রয়োজন।
চিকিৎসক সাধারণত প্রথমে ব্যথার ইতিহাস জানতে চান। কখন ব্যথা শুরু হয়েছে, কোথা থেকে শুরু হয়ে কোন পথে পায়ের দিকে যাচ্ছে, কতটা তীব্র এবং কোন অবস্থায় ব্যথা বাড়ে বা কমে—এসব বিষয় মূল্যায়ন করা হয়।
এরপর শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে পেশির শক্তি, অনুভূতি ও স্নায়ুর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও কিছু পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে কোমরব্যথা হলেই সবার এক্স-রে বা এমআরআই প্রয়োজন হয় না। উপসর্গ এবং চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে এসব পরীক্ষা করা হয়।
কোমরের ওপর চাপ কমাতে দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে না থাকার অভ্যাস করা দরকার। কাজের মধ্যে নিয়মিত বিরতি নিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করা যেতে পারে। কম্পিউটার বা মোবাইল ব্যবহারের সময় দীর্ঘক্ষণ সামনে ঝুঁকে থাকা এড়িয়ে চলাও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারী জিনিস তোলার সময় শরীরের সঠিক ভঙ্গি বজায় রাখতে হবে। বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার চেষ্টা করা উচিত। তবে ব্যথার কারণ না জেনে নিজে থেকে কঠিন ব্যায়াম শুরু করা ঠিক নয়।
ব্যথা হলেই দীর্ঘদিন সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকা সবসময় সমাধান নয়। ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শে উপযুক্ত ব্যায়াম ও পুনর্বাসন কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে।
সব ধরনের কোমর ও পায়ের ব্যথার চিকিৎসা এক নয়। সমস্যার প্রকৃত কারণ নির্ণয়ের পর চিকিৎসার ধরন ঠিক করা প্রয়োজন। দীর্ঘস্থায়ী প্রাথমিক কোমরব্যথার ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রোগীকে স্বাস্থ্যশিক্ষা, শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা, উপযুক্ত ব্যায়াম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বাসনভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
নিজের ইচ্ছায় দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করাও নিরাপদ নয়। বিশেষ করে পায়ে অবশভাব, ঝিনঝিনি বা দুর্বলতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ ব্যথা সাময়িকভাবে কমে গেলেও এর পেছনের কারণ থেকে যেতে পারে।
কোমর থেকে পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়া ব্যথাকে তাই একেবারে সাধারণ সমস্যা হিসেবে অবহেলা করা উচিত নয়। অনেক ক্ষেত্রে সঠিক বিশ্রাম, শারীরিক সক্রিয়তা, ব্যায়াম ও জীবনযাপনের পরিবর্তনে উপকার পাওয়া যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। ব্যথার সঙ্গে সতর্কসংকেত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। সময়মতো কারণ শনাক্ত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ব্যথা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্বাভাবিক চলাফেরা ও দৈনন্দিন কর্মক্ষমতাও ধরে রাখা সম্ভব।