প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে (ডিএমসিএইচ) আরও আধুনিক, সহজ ও নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় আনতে ‘ক্যাশলেস ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল’ কার্যক্রম চালু করেছে পূবালী ব্যাংক। রোগী ও তাঁদের স্বজনদের চিকিৎসা ব্যয় ও অন্যান্য আর্থিক লেনদেন সহজ করার পাশাপাশি নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
দেশে ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি দ্রুত বাড়লেও হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল প্রতিষ্ঠানে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা এখনো অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়। প্রতিদিন হাজারো মানুষ চিকিৎসার প্রয়োজনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন। তাঁদের বড় একটি অংশ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা রোগী ও স্বজন। চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে তাঁদের একাধিক আর্থিক লেনদেন করতে হয়। এ সময় নগদ অর্থ বহন, ভাঙতি সংগ্রহ কিংবা কাউন্টারে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা অনেকের জন্য বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নতুন এই উদ্যোগ সেই বাস্তবতায় ডিজিটাল লেনদেনকে আরও সহজলভ্য করার একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পূবালী ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশব্যাপী ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণ এবং ‘এক দেশ এক বাংলা কিউআর’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কার্যক্রমটি নেওয়া হয়েছে। ‘লেনদেন হচ্ছে ক্যাশলেস, এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে হাসপাতালটিতে নগদবিহীন লেনদেনের পরিবেশ তৈরিতে কাজ করবে ব্যাংকটি।
কার্যক্রমটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট-১-এর অতিরিক্ত পরিচালক সাদিয়া খান সম্মানিত অতিথি এবং পূবালী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহনেওয়াজ খান বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক মো. রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন উপমহাব্যবস্থাপক মো. রবিউল আলম ও এন এম ফিরোজ কামালসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অনুষ্ঠানে পূবালী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহনেওয়াজ খান বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের অর্থ পরিশোধ আরও সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ হবে। একই সঙ্গে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে এ ধরনের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
হাসপাতালের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে ক্যাশলেস লেনদেন চালুর গুরুত্ব শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের জন্য সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জরুরি রোগীর স্বজনদের অনেক সময় অল্প সময়ের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অর্থ পরিশোধ করতে হয়। সে ক্ষেত্রে ডিজিটাল পেমেন্টের সুযোগ থাকলে নগদ অর্থ সংগ্রহের জন্য বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে। ফলে চিকিৎসাসেবা গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়ায় কিছুটা হলেও সময় ও শ্রম সাশ্রয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
নগদ অর্থের ব্যবহার কমলে নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে রোগী ও স্বজনদের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ কম থাকলে অর্থ হারানো, চুরি বা ভুল হিসাবের মতো ঝুঁকিও কমানোর সুযোগ থাকে। একই সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধের রেকর্ড সংরক্ষিত থাকায় লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে দেশে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। কিউআরভিত্তিক লেনদেনকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজলভ্য করার মাধ্যমে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কিউআর পেমেন্ট চালু হওয়ার ফলে গ্রাহকদের জন্য মোবাইল বা ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের সুযোগ বাড়ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে ক্যাশলেস কার্যক্রম চালু হওয়া সেই বৃহত্তর ডিজিটাল রূপান্তরেরই একটি অংশ।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দেশের অন্যতম ব্যস্ত সরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে এখানে আসেন। সীমিত আয় বা আর্থিকভাবে সংকটে থাকা অনেক মানুষের জন্য সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে আর্থিক লেনদেনের প্রক্রিয়া যত বেশি সহজ ও নির্ভরযোগ্য করা যায়, রোগী ও স্বজনদের ওপর ততটাই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে ক্যাশলেস ব্যবস্থা সফল করতে শুধু প্রযুক্তি চালু করাই যথেষ্ট নয়। রোগী ও তাঁদের স্বজনদের মধ্যে ডিজিটাল পেমেন্ট সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা এবং লেনদেনের নিরাপত্তা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা অনেক রোগী বা স্বজন ডিজিটাল লেনদেন ব্যবহারে অভ্যস্ত নাও হতে পারেন। তাঁদের জন্য সহজ নির্দেশনা ও সহায়তার ব্যবস্থা থাকলে উদ্যোগটির সুফল আরও ব্যাপকভাবে পৌঁছাতে পারে।
ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সমস্যাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইন্টারনেট সংযোগ, ব্যাংকিং অ্যাপ, কিউআর কোড বা পেমেন্ট সিস্টেমে সাময়িক সমস্যা দেখা দিলে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি তৈরি হতে পারে। তাই ক্যাশলেস কার্যক্রমের পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থা ও দ্রুত সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাও প্রয়োজন। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পেমেন্ট জটিলতা যেন চিকিৎসা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি না করে, সে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
এ উদ্যোগের আরেকটি সম্ভাব্য দিক হলো আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি। নগদ অর্থের পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ পরিশোধ হলে প্রতিটি লেনদেনের একটি ইলেকট্রনিক রেকর্ড তৈরি হয়। এতে হিসাব ব্যবস্থাপনা আরও সংগঠিত করা এবং লেনদেনের তথ্য পরবর্তী সময়ে যাচাই করা সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠান ও সেবাগ্রহীতা—উভয় পক্ষের জন্যই অর্থ পরিশোধের প্রমাণ সংরক্ষিত থাকে।
পূবালী ব্যাংকের এই উদ্যোগকে দেশের বৃহত্তর ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ব্যাংকিং সেবা যখন ক্রমেই শাখাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে মোবাইল ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মনির্ভর হয়ে উঠছে, তখন হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সেবা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে ক্যাশলেস লেনদেন সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ক্যাশলেস ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করে ব্যবহারকারীর আস্থা, সহজ ব্যবহার, নিরাপত্তা এবং নিরবচ্ছিন্ন সেবার ওপর। মানুষ যদি দ্রুত ও নিরাপদে অর্থ পরিশোধ করতে পারেন এবং প্রয়োজনের সময় লেনদেনের প্রমাণ পান, তাহলে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রতি তাঁদের আগ্রহ বাড়ে। ফলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে ক্যাশলেস ব্যবস্থা চালু করার চেয়ে সেটিকে ব্যবহারবান্ধব ও টেকসই করে তোলাই বড় চ্যালেঞ্জ।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই কার্যক্রম চালুর ফলে ভবিষ্যতে হাসপাতালভিত্তিক ডিজিটাল লেনদেনের আরও বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। রোগী ও স্বজনদের দৈনন্দিন ভোগান্তি কমানো, নগদ অর্থের ব্যবহার সীমিত করা এবং আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে উদ্যোগটি কার্যকর হলে দেশের অন্যান্য হাসপাতাল ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানও একই ধরনের ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে পূবালী ব্যাংকের ‘ক্যাশলেস ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল’ উদ্যোগকে শুধু একটি ব্যাংকের প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণ হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ তাৎপর্য ধরা পড়ে না। এটি রোগী ও স্বজনদের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনকে আরও সহজ করার পাশাপাশি দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে জনজীবনের আরও গুরুত্বপূর্ণ পরিসরে নিয়ে যাওয়ার একটি প্রচেষ্টা। যথাযথ নিরাপত্তা, সচেতনতা ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করা গেলে এমন উদ্যোগ নগদবিহীন বাংলাদেশের পথে বাস্তব ও কার্যকর পরিবর্তন আনতে পারে।