প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যে পাল্টা জবাব দিয়েছে কানাডা। দেশটির প্রায় ৭০০ ধরনের মার্কিন পণ্যের ওপর ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে অটোয়া। এসব পণ্যের সম্মিলিত মূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে টানাপোড়েন নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ সেই সম্পর্ককে আরও কঠিন অবস্থার দিকে নিয়ে গেছে। বিশেষ করে গাড়ি, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, কৃষিপণ্য, দুগ্ধজাত পণ্য ও ইলেকট্রনিকসের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কানাডার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেসব হারে কানাডীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছে, নতুন পাল্টা শুল্কও মূলত তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নির্ধারণ করা হয়েছে। অটোয়ার যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা বাণিজ্যিক পদক্ষেপের কারণে কানাডার অর্থনীতি ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলো ক্ষতির মুখে পড়লে দেশটির স্বার্থ রক্ষায় পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া বিকল্প সীমিত হয়ে যায়।
কানাডার অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেইন পরিস্থিতিকে দেশের জন্য নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, কানাডার ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় দেশবাসী ঐক্যবদ্ধ। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, অটোয়া আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকারের বদলে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে।
দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের বর্তমান সংকটের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক আলোচনার ব্যর্থতা। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে নতুন বাণিজ্যিক সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আলোচনা কোনো চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। বরং আলোচনার শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া কিছু শর্ত কানাডার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি।
কার্নির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত চুক্তির কিছু শর্ত কানাডার অর্থনীতির জন্য অন্যায্য ছিল। বিশেষ করে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলোকে প্রতিযোগিতার মুখে ফেলে দেওয়ার মতো কিছু শর্ত নিয়ে অটোয়ার আপত্তি ছিল। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, এমন একটি চুক্তি গ্রহণ করলে দেশের শিল্প খাত প্রকৃত সুবিধার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
গাড়ি শিল্পকে ঘিরে কানাডার উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার অর্থনীতিতে গাড়ি উৎপাদন খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দুই দেশের শিল্পব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। গাড়ির যন্ত্রাংশ সীমান্ত অতিক্রম করে একাধিকবার দুই দেশের কারখানায় যাওয়া-আসা করে। ফলে এই খাতে বড় ধরনের শুল্ক আরোপ হলে শুধু একটি দেশের কোম্পানি নয়, পুরো উত্তর আমেরিকার সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে।
ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম খাতও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কানাডা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এসব পণ্যের অন্যতম সরবরাহকারী। নতুন শুল্কের ফলে কানাডীয় উৎপাদকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য বিক্রি ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। পাল্টা হিসেবে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাত, ধাতু ও অন্যান্য পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করায় মার্কিন উৎপাদক ও রপ্তানিকারকরাও একই ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারেন।
বাণিজ্য বিরোধের প্রভাব কৃষিপণ্যেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য কানাডার বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। পাল্টা শুল্কের ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে এবং আমদানিকারক ও ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে। একইভাবে কানাডীয় কৃষিপণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়লে সীমান্তের দুই পাশের কৃষক ও খাদ্য ব্যবসার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
কানাডার পাল্টা ব্যবস্থা ঘোষণার এক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডাকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তিনি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলার আহ্বান জানান এবং তা না হলে আরও কঠোর পরিণতির হুমকি দেন। ট্রাম্পের বক্তব্যে বোঝা যায়, ওয়াশিংটনও বর্তমান অবস্থান থেকে সহজে সরে আসতে প্রস্তুত নয়।
ট্রাম্প কানাডার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে অন্যায্য সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ করে আসছেন। মার্কিন কৃষকদের ওপর কানাডার শুল্ক নিয়েও তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং নতুন শুল্কনীতি সেই ভারসাম্য পরিবর্তনের একটি উপায়।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান মেনে নেননি। তিনি বলেছেন, কানাডা এমন কোনো বাণিজ্য চুক্তিতে সম্মত হবে না, যা দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে দুর্বল করে দেয়। তাঁর বক্তব্যে বিশেষ করে গাড়ি, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের সুরক্ষার বিষয়টি উঠে এসেছে। ফলে দুই দেশের আলোচনায় এখন শুধু শুল্কের হার নয়, জাতীয় শিল্পনীতি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নও যুক্ত হয়েছে।
দুই দেশের এই সংঘাতের মানবিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অসংখ্য মানুষ ও ব্যবসা দুই দেশের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন হয়। এক দেশের কারখানায় উৎপাদিত যন্ত্রাংশ অন্য দেশের কারখানায় গিয়ে চূড়ান্ত পণ্যে পরিণত হয়। শুল্ক বাড়লে এই সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হতে পারে।
অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়লে ব্যবসায়ীরা সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন। ফলে গাড়ি, ইলেকট্রনিকস, খাদ্যপণ্য কিংবা অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তেও অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে।
তবে কানাডার পাল্টা শুল্কের উদ্দেশ্য শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করা নয়। অটোয়ার প্রত্যাশা, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের ওপর আলোচনায় ফেরার চাপ তৈরি হবে। অর্থাৎ পাল্টা শুল্ককে একটি দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করতে চায় কানাডা। ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে নতুন আলোচনা শুরু হলে শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানোর বিষয়টি সমঝোতার অংশ হতে পারে।
কিন্তু এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। ওয়াশিংটন যদি পাল্টা আরও বেশি শুল্ক আরোপ করে, তাহলে পরিস্থিতি একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। এতে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং ভোক্তা বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অন্যদিকে দুই দেশ যদি অর্থনৈতিক চাপের পর আলোচনায় ফিরে আসে, তাহলে বর্তমান সংকট সমঝোতার পথেও যেতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার অর্থনীতি গভীরভাবে পরস্পরনির্ভরশীল। দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যযুদ্ধ কোনো পক্ষের জন্যই পুরোপুরি লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা কম। দুই দেশের শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা বহু বছর ধরে আন্তঃনির্ভরতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের কাছে তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, পাল্টাপাল্টি শুল্ক কতদূর গড়াবে। অটোয়ার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে বাণিজ্য বিরোধ নতুন মাত্রা পেলেও এটি আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। বরং আগামী কয়েক সপ্তাহে ওয়াশিংটন ও অটোয়ার বক্তব্য এবং নতুন অর্থনৈতিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে পরিস্থিতির গতিপথ।
দুই দেশের সম্পর্কের এই টানাপোড়েন উত্তর আমেরিকার অর্থনীতির বাইরেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দুই অর্থনীতির মধ্যে বাণিজ্য বাধা বাড়লে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা, পণ্যের দাম এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থায় তার প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে শিল্প কাঁচামাল ও উৎপাদন খাতে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি হলে অন্যান্য দেশ ও প্রতিষ্ঠানকেও নিজেদের বাণিজ্য কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।
এখন পর্যন্ত কানাডার বার্তা হলো, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত চায় না, কিন্তু নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত নয়। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানও কঠোর। ফলে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের সামনে একই সঙ্গে সংঘাত ও সমঝোতার দুটি পথ খোলা রয়েছে।
আগামী ৮ সেপ্টেম্বর কানাডার পাল্টা শুল্ক কার্যকর হলে তার বাস্তব প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে। এর আগে দুই দেশের মধ্যে নতুন কোনো সমঝোতা হয় কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ শেষ পর্যন্ত এই বাণিজ্য বিরোধ শুধু সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে কারখানার শ্রমিক, কৃষক, ব্যবসায়ী, পরিবহন খাত এবং দুই দেশের সাধারণ ভোক্তার জীবনেও।