জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ড দেখেও অনেকে চোখ বন্ধ করে আছেন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৬ বার
জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ড দেখেও অনেকে চোখ বন্ধ করে আছেন

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনাগুলো দেখেও অনেকে এখনো তা অস্বীকার করছেন বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, ওই সময় ব্যাপক প্রাণহানি ও গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটলেও সমাজের একটি অংশ যেন সেসব বাস্তবতা দেখতে চাইছে না। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে দেশে ফ্যাসিবাদী প্রবণতার পুনরুত্থান ঠেকাতে নাগরিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বুধবার (২৬ আগস্ট) রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ইনস্টিটিউট অব হযরত মোহাম্মদ (সা.) আয়োজিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্য দেন।

জুলাই আন্দোলনের সময়কার পরিস্থিতি তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রায় ২০ দিনের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ গুলিতে নিহত হয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত এবং প্রায় ৩০০ মানুষ বিভিন্নভাবে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কারও হাত, কারও পা এবং কারও শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারানোর কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

আইনমন্ত্রী বলেন, এত প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটলেও চোখে আলো থাকা অনেক মানুষ এখনো এমনভাবে কথা বলছেন, যেন কিছুই ঘটেনি। তাঁর এই বক্তব্যে মূলত জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত ঘটনাগুলোকে অস্বীকার বা উপেক্ষা করার প্রবণতার সমালোচনা উঠে আসে।

তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এক শিক্ষার্থীর উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ওই শিক্ষার্থীর মাথার একটি অংশ নেই। এমন ভয়াবহ ক্ষতির ঘটনাও বাস্তবতার অংশ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারগুলোর দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের বিষয়টিও উঠে আসে।

আইনমন্ত্রী বলেন, মানুষের চেহারা ধারণ করলেও কেউ কেউ মানবিকতার বিপরীতে গিয়ে রাতের অন্ধকারে ক্রসফায়ারের নামে মানুষকে গুলি করে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, এখনো অনেক পরিবারের ভাই, বোন, মা কিংবা স্বামী নিখোঁজ রয়েছেন। এসব পরিবারের অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল নাগরিকদের দায়িত্ববোধ নিয়ে। আইনমন্ত্রী দেশের নাগরিকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে অন্যায় ও অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কেউ অপরাধ করলে নাগরিকদের তা দেখিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে তিনি এটিকে নাগরিকদের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব হিসেবে বর্ণনা করেন।

একই সঙ্গে তিনি দেশে ফ্যাসিবাদী শক্তির পুনর্বাসন ঠেকাতে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, শুধু কোনো একটি রাজনৈতিক বা সামাজিক গোষ্ঠীর বিরোধিতা করাই যথেষ্ট নয়; বরং রাষ্ট্র ও সমাজে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে কর্তৃত্ববাদ, দমন-পীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ তৈরি না হয়।

আইনমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদ যেন দেশে আবারও পুনর্বাসিত হতে না পারে এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন নতুন করে ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্যে একই সঙ্গে অতীতের অপরাধের বিচার এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

তিনি নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যারা অতীতে সংঘটিত হত্যা ও সহিংসতা দেখেও তা দেখতে পাচ্ছেন না, তাদের নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা উচিত। তাঁর বক্তব্যে ‘চোখ খোলা’ এবং ‘অন্তরচক্ষু’ খোলার প্রতীকী আহ্বানের মাধ্যমে বাস্তবতা উপলব্ধি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আইনমন্ত্রী আরও বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনা কিংবা নাগরিক দায়িত্ব পালনের পথে ভুল হতে পারে। তবে ভুল হলে তা স্বীকার করে সংশোধনের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। তাঁর মতে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে ভুলের সংশোধন, জবাবদিহি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপরও জোর দেন তিনি। এমন একটি বাংলাদেশের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দেশকে বাসযোগ্য করে তুলতে এসব মূল্যবোধকে রাষ্ট্র ও সমাজের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

তাঁর বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও ছিল—অতীতের ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে নতুন কোনো কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা যেন তৈরি না হয়। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ যাতে পুনর্বাসিত না হয়, একই সঙ্গে যারা তার বিরোধিতা করছে তারাও যেন ভবিষ্যতে ফ্যাসিস্ট আচরণে জড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

এদিকে অনুষ্ঠানের মূল আয়োজনে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের প্রতিভা বিকাশের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। আইনমন্ত্রী এসব জনগোষ্ঠীর জন্য ইনস্টিটিউট অব হযরত মোহাম্মদের নেওয়া উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, সমাজের প্রান্তিক অবস্থানে থাকা মানুষদেরও সমান অধিকার রয়েছে এবং তাঁদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এ ধরনের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরামর্শও দেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু আইন ও নীতিমালা নয়, বাস্তব জীবনে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও মর্যাদা নিশ্চিত করাও জরুরি।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ফয়েজ আহমেদ, ইনস্টিটিউট অব হযরত মোহাম্মদের সভাপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) এম নুরউদ্দিন খান, ইরান দূতাবাসের প্রথম কাউন্সেলর এসরাফিল আমিরি গোর্জাদ্দিনি, ঢাকা ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওসমান এরশাদ ফয়েজ এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনামুল হক উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক বিভাগে অংশ নেওয়া প্রতিযোগীদের মধ্য থেকে বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয়। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, হামদ, নাতে রাসুল (সা.) এবং রচনা প্রতিযোগিতায় অংশ নেন প্রতিযোগীরা। এবারের প্রতিযোগিতার প্রতিপাদ্য ছিল ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষা’।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে জুলাই আন্দোলনের সময়কার হত্যাকাণ্ড, নিখোঁজ ব্যক্তি ও আহতদের প্রসঙ্গ রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে আবারও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্যে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে আইনের শাসন, গণতন্ত্র, নাগরিক দায়িত্ব ও মানবিক মর্যাদাকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

জুলাইয়ের ঘটনাবলি নিয়ে সমাজে এখনো মতপার্থক্য ও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। তবে আইনমন্ত্রী যে বিষয়টি সামনে এনেছেন, তা হলো—সহিংসতার শিকার মানুষ ও তাঁদের পরিবারের অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা না করে ঘটনাগুলোর সত্যতা, দায়বদ্ধতা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। একটি রাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য অতীতের সহিংসতার যথাযথ অনুসন্ধান এবং ভবিষ্যতে তার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সবশেষে আইনমন্ত্রী প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর প্রত্যাশা, সম্মিলিত দায়িত্ববোধ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে উঠবে, যেখানে অতীতের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি হবে না এবং আগামী প্রজন্ম নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত