বিশ্বজুড়ে অভিবাসী ভিসা সাক্ষাৎকার স্থগিত যুক্তরাষ্ট্রে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৮ বার
বিশ্বজুড়ে অভিবাসী ভিসা সাক্ষাৎকার স্থগিত যুক্তরাষ্ট্রে

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী ভিসার জন্য নির্ধারিত সাক্ষাৎকার সাময়িকভাবে স্থগিত বা পুনর্নির্ধারণ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোতে শুরু হওয়া একটি বৈশ্বিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভিসা-সেবা সংক্রান্ত অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময়সূচিতে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে কত দিন এই স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকবে কিংবা স্বাভাবিক কার্যক্রম কবে ফিরবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানায়নি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে যেসব আবেদনকারী দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে সাক্ষাৎকারের অপেক্ষায় ছিলেন, তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র মঙ্গলবার জানিয়েছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটে একটি বৈশ্বিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। প্রশিক্ষণের কারণে ভিসা-সেবা সংক্রান্ত অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময়সূচিতে পরিবর্তন করা হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সাক্ষাৎকার থাকা কিছু অভিবাসী ভিসাপ্রার্থী ই-মেইলের মাধ্যমে তাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্থগিত বা পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে জানতে পেরেছেন। নতুন তারিখ পরে জানিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় আবেদন যাচাইয়ের পদ্ধতিকে আরও কঠোর ও বিস্তৃত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশিক্ষণের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো কনস্যুলার কর্মকর্তাদের এমন আবেদনকারী শনাক্ত করতে আরও দক্ষ করে তোলা, যারা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের জনকল্যাণমূলক সুবিধার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে আবেদনকারীদের বিষয়ে মূল্যায়ন যেন আরও সামগ্রিক ও অভিন্ন পদ্ধতিতে করা হয়, সেটিও প্রশিক্ষণের লক্ষ্য।

এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন দেখা বহু মানুষের জন্য অপেক্ষার সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে। অভিবাসী ভিসার ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের সাধারণত বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে হয়। আবেদন, নথিপত্র যাচাই, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর কনস্যুলার সাক্ষাৎকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সেই সাক্ষাৎকারের সময়সূচি হঠাৎ পরিবর্তিত হলে আবেদনকারীদের ভ্রমণ পরিকল্পনা, চাকরি, পারিবারিক পুনর্মিলন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার অন্যান্য প্রস্তুতিও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।

বিশেষ করে পরিবারভিত্তিক অভিবাসনের ক্ষেত্রে এর মানবিক প্রভাব উল্লেখযোগ্য হতে পারে। অনেক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে স্বজনদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। সাক্ষাৎকার পিছিয়ে গেলে তাদের পুনর্মিলনের সময়ও অনির্দিষ্ট হয়ে যেতে পারে। একইভাবে চাকরিভিত্তিক অভিবাসনের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা ও কর্মপ্রত্যাশীদের পরিকল্পনাও বিলম্বিত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অভিবাসননীতির বৃহত্তর পরিবর্তনের মধ্যেই এই নতুন সিদ্ধান্ত এসেছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থায়ও কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ভিসা ও গ্রিন কার্ড বাতিল, আবেদন প্রত্যাখ্যান, অতিরিক্ত যাচাই এবং বিভিন্ন ধরনের নতুন বিধিনিষেধের মাধ্যমে অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও নিয়ন্ত্রিত করার চেষ্টা করছে প্রশাসন।

মার্কিন প্রশাসনের যুক্তি, দেশের নিরাপত্তা এবং সরকারি সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আবেদনকারীদের বিষয়ে আরও সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। তবে সমালোচকেরা বলছেন, অতিরিক্ত কড়াকড়ির ফলে বৈধ অভিবাসনের পথও অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল হয়ে উঠতে পারে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একাংশের অভিযোগ, সাম্প্রতিক কিছু নীতিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং বৈষম্যহীনতার মতো বিষয় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এর মধ্যেই গত শুক্রবার ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ধাক্কা আসে। নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালত বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা ইস্যু স্থগিত রাখার একটি নীতি বাতিল করে দেয়। আদালতের বিচারক জ্যানেট ভার্গাসের রায়ে বলা হয়, ওই নীতি কার্যকর করার ক্ষেত্রে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তার আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছিলেন। আদালতের এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতির বিরুদ্ধে চলমান আইনি চ্যালেঞ্জকে আরও স্পষ্ট করেছে।

তবে ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা ইস্যু স্থগিতের নীতি এবং বর্তমান বৈশ্বিক অ্যাপয়েন্টমেন্ট পরিবর্তনকে একই সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে না। নতুন পদক্ষেপটি কনস্যুলার কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাগরিকদের জাতীয়তার ভিত্তিতে আলাদাভাবে লক্ষ্য করার কথা বলা হয়নি। বরং বিশ্বজুড়ে মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটের ভিসা-সাক্ষাৎকারের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

তবে বাস্তবে আবেদনকারীদের ওপর এর প্রভাব কম নয়। যাদের সাক্ষাৎকার ইতোমধ্যে নির্ধারিত ছিল, তাদের অনেককেই এখন নতুন তারিখের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। নতুন সময়সূচি কবে দেওয়া হবে, তা স্পষ্ট না হওয়ায় আবেদনকারীদের জন্য পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে যাদের ভিসা প্রক্রিয়ার অন্যান্য ধাপ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, তাদের কাছে এই বিলম্ব আরও হতাশাজনক হতে পারে।

বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ওই ৭৫ দেশের তালিকায় ছিল, যাদের অভিবাসী ভিসা ইস্যু নিয়ে আগের নীতিতে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছিল। আদালতের সাম্প্রতিক রায়ের ফলে সেই নীতিতে বড় ধরনের আইনি পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যেই বিশ্বজুড়ে ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট পুনর্নির্ধারণের খবর আসায় বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যেও স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্টের এই পরিবর্তনকে সব ধরনের মার্কিন ভিসা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া হিসেবে ব্যাখ্যা না করা। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মূলত অভিবাসী ভিসার সাক্ষাৎকার ও সংশ্লিষ্ট অ্যাপয়েন্টমেন্ট প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের অ-অভিবাসী ভিসা যেমন পর্যটন, ব্যবসা বা শিক্ষার্থী ভিসার প্রতিটি আবেদন একইভাবে স্থগিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

এই পার্থক্যটি আবেদনকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অভিবাসী ভিসা এবং অ-অভিবাসী ভিসার আইনগত কাঠামো ও প্রক্রিয়া এক নয়। ফলে বিশ্বজুড়ে ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্টে পরিবর্তনের খবরকে সব ধরনের ভিসা কার্যক্রম বন্ধ হিসেবে প্রচার করলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। সমর্থকদের বক্তব্য, অভিবাসন ব্যবস্থায় কঠোর যাচাই জাতীয় নিরাপত্তা ও সরকারি অর্থের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন। অন্যদিকে বিরোধীরা বলছেন, বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থায় অতিরিক্ত বাধা সৃষ্টি করলে পরিবার, ব্যবসা, শিক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। ভিসা আবেদন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আর্থিক সক্ষমতা, সরকারি সুবিধার ওপর সম্ভাব্য নির্ভরতা, নিরাপত্তা এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্যকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা সামনে আসছে। ফলে ভবিষ্যতে ভিসা আবেদনকারীদের জন্য প্রক্রিয়াটি আরও কঠোর হতে পারে।

তবে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শেষ হলে ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্টের স্বাভাবিক সময়সূচি কবে ফিরবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দেয়নি। ফলে যারা ইতোমধ্যে সাক্ষাৎকারের তারিখ পেয়েছিলেন কিংবা নতুন তারিখের অপেক্ষায় রয়েছেন, তাদের সামনে আপাতত অনিশ্চয়তাই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপকে শুধু একটি প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর প্রেক্ষাপটটি আড়াল হয়ে যেতে পারে। এটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশটির অভিবাসনব্যবস্থা নিয়ে একদিকে প্রশাসনিক কড়াকড়ি বাড়ছে, অন্যদিকে আদালতে একের পর এক নীতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। ফলে বিশ্বজুড়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পথ এখন শুধু দীর্ঘ নয়, বরং আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিতও হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত