জমি নিয়ে সংঘর্ষে আহত ৯, বাড়িঘরে ভাঙচুর-লুটপাট

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৬ বার
জমি নিয়ে সংঘর্ষে আহত ৯, বাড়িঘরে ভাঙচুর-লুটপাট

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফরিদপুরের সালথায় জমিজমা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত নয়জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের সময় বেশ কয়েকটি বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও উঠেছে। মঙ্গলবার বিকেলে উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের বড় বাংরাইল গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বড় বাংরাইল গ্রামের বাসিন্দা মনির বিশ্বাস ও মিশরু বিশ্বাসের মধ্যে একটি জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। জমির মালিকানা ও দখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে আগে থেকেই উত্তেজনা ছিল। স্থানীয়ভাবে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা থাকলেও তা পুরোপুরি নিরসন হয়নি। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার বিকেলে পরিস্থিতি হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিকেল চারটার দিকে দুই পক্ষের লোকজনের মধ্যে প্রথমে বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়। কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে তা হাতাহাতিতে গড়ায়। পরে উভয় পক্ষের লোকজন দেশি অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের সময় এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ধাওয়া করলে পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাকর হয়ে ওঠে।

বিকেল চারটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত নয়জন আহত হন। আহতদের মধ্যে ছয়জন ধারালো অস্ত্রের আঘাতে জখম হয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্য আহতদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

সংঘর্ষের কারণে বড় বাংরাইল গ্রামের স্বাভাবিক পরিবেশও বিঘ্নিত হয়। হঠাৎ করে দুই পক্ষের লোকজন দেশি অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেকেই নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বাড়ির বাইরে বের হননি। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংঘর্ষের সুযোগে দুই পক্ষের সমর্থকেরা পরস্পরের বাড়িতে হামলা চালান।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার দাবি, সংঘর্ষ চলাকালে অন্তত আটটি বসতবাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। বাড়িঘরের বিভিন্ন মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত ও নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে লুটপাটের ঘটনায় কী পরিমাণ সম্পদের ক্ষতি হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকেও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে গ্রামাঞ্চলে এ ধরনের সংঘর্ষ নতুন নয়। জমির মালিকানা, সীমানা নির্ধারণ, দখল কিংবা উত্তরাধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ অনেক সময় ব্যক্তিগত বিরোধের বাইরে গিয়ে পারিবারিক ও সামাজিক সংঘাতে রূপ নেয়। স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধের দ্রুত ও কার্যকর সমাধান না হলে ছোটখাটো বাগ্‌বিতণ্ডাও বড় ধরনের সংঘর্ষে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সালথার বড় বাংরাইলের ঘটনাটিও সেই ধরনের পরিস্থিতিরই একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

ঘটনার পর দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কায় এলাকায় সতর্ক অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. বাবলুর রহমান খান জানিয়েছেন, সংঘর্ষের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষের সময় বেশ কয়েকটি বসতঘর ভাঙচুর করা হয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে সংঘর্ষের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে কী ধরনের মামলা হয়েছে বা কতজনকে শনাক্ত করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে ঘটনার পর মনির বিশ্বাস ও মিশরু বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সংঘর্ষের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করছেন। ফলে জমি নিয়ে বিরোধের মূল কারণ এবং দুই পক্ষের দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে উভয় পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সংঘর্ষে কারা কীভাবে জড়িত ছিলেন, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সালথার মতো গ্রামীণ এলাকায় জমিজমা নিয়ে বিরোধ শুধু সংশ্লিষ্ট দুই পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; সময়ের সঙ্গে তা আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় সমর্থকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি বসতবাড়ি, সম্পদ ও সামাজিক শান্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মঙ্গলবারের সংঘর্ষেও আহত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি পরিবারের বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এ ধরনের বিরোধের স্থায়ী সমাধানে শুধু সংঘর্ষের পর পুলিশ মোতায়েন করাই যথেষ্ট নয়। বিরোধের মূল কারণ চিহ্নিত করে আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় জমির মালিকানা ও দখলসংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তি করা জরুরি। তা না হলে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি শান্ত হলেও ভবিষ্যতে আবারও সংঘর্ষের আশঙ্কা থেকে যায়।

বিশেষ করে জমি নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে আদালত ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মালিকানা ও সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ থাকলে সেটিও আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে করা যেতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষ, বাড়িঘরে হামলা কিংবা লুটপাটের মতো ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয়।

বর্তমানে বড় বাংরাইল গ্রামের পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছে থানা কর্তৃপক্ষ। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের ফলে নতুন করে সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আহতদের চিকিৎসা চলছে এবং ভাঙচুরের অভিযোগের বিষয়েও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো, স্থানীয় বিরোধ যেন আর বড় কোনো সহিংসতায় রূপ না নেয়। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা এবং সংঘর্ষের জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনা—এই তিনটি বিষয় এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের জমি বিরোধের আইনগত নিষ্পত্তি হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।

পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তদন্তে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা স্পষ্ট হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে জমি নিয়ে বিরোধ থেকে সৃষ্ট এই সংঘর্ষের পরবর্তী পরিস্থিতি এখন নির্ভর করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ এবং বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত