গণপতি পরিবার হত্যার রহস্য উন্মোচনে শাহবাগে মানববন্ধন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৫ বার
গণপতি পরিবার হত্যার রহস্য উন্মোচনে শাহবাগে মানববন্ধন

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েসহ পরিবারের চার সদস্যের হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং দ্রুত বিচারের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে মানববন্ধন করেছেন শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকেরা। বুধবার বেলা ১১টার দিকে শাহবাগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী এবং ঢাকায় অবস্থানরত রংপুরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাধারণ শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, একটি পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা কোনোভাবেই সাধারণ একটি অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল এবং পরিকল্পনার সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত ছিল কি না—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত তদন্ত শেষ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। তাঁদের দাবি, তদন্তে কোনো ধরনের প্রভাব, চাপ বা অনুমানের সুযোগ না রেখে প্রতিটি তথ্য ও আলামত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যাচাই করতে হবে।

বক্তারা বলেন, হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে তদন্তকারীদের আরও গভীরে যেতে হবে। বিশেষ করে ঘটনার সময় নিয়ে যে অসঙ্গতির কথা সামনে এসেছে, সেটি দ্রুত পরিষ্কার করা প্রয়োজন। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত পরিবারের সদস্য আগামী চক্রবর্তী ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে এক বান্ধবীকে বাসায় বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়ে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। অথচ আসামিদের পক্ষ থেকে হত্যাকাণ্ড মধ্যরাতে সংঘটিত হওয়ার দাবি করা হয়েছে। ফলে বার্তা পাঠানোর সময়, মোবাইল ফোনের কার্যক্রম এবং হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য সময়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা প্রযুক্তিগতভাবে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

শিক্ষার্থীদের মতে, মোবাইল ফোনের ডেটা, কল রেকর্ড, মেসেজের সময়, অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ করলে ঘটনার সময় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তাই শুধু মৌখিক বক্তব্য বা স্বীকারোক্তির ওপর নির্ভর না করে ডিজিটাল ফরেনসিকের সহায়তায় ঘটনার পূর্ণ টাইমলাইন তৈরি করার আহ্বান জানানো হয়।

ঘটনার রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টিও মানববন্ধনে গুরুত্ব পায়। আন্দোলনকারীরা জানতে চান, ওই এলাকায় কেন দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ ছিল না এবং বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না। একই সঙ্গে পাশের একটি মন্দিরের সিসিটিভি ক্যামেরা ওই সময়ে অকার্যকর হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। তাঁদের মতে, ক্যামেরাটি কখন বন্ধ হয়েছিল, কেন বন্ধ হয়েছিল এবং তার আগে বা পরে কোনো সন্দেহজনক গতিবিধি রেকর্ড হয়েছিল কি না, তা প্রযুক্তিগতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

মানববন্ধনে নিহত আগামী চক্রবর্তীর পূর্ববর্তী আশঙ্কার বিষয়টিও সামনে আনা হয়। আন্দোলনকারীরা জানান, গত মে মাসে আগামী চক্রবর্তী এক বান্ধবীর কাছে থানায় সাধারণ ডায়েরি করার বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি কারও কাছ থেকে কোনো ধরনের হুমকি পেয়েছিলেন কি না, তাঁর মধ্যে কোনো নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল কি না এবং সেই সময় কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তে যাচাই করা দরকার বলে মনে করেন তাঁরা।

নিহত পরিবারটি উদ্ধারের আগে প্রায় দুই দিন নিখোঁজ ছিল বলেও মানববন্ধনে উল্লেখ করা হয়। এই সময়ের মধ্যে পরিবারের সদস্যদের অবস্থান সম্পর্কে প্রতিবেশী, পরিচিতজন কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কিছু জানতেন কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। একই সঙ্গে পরিবারটি নিখোঁজ হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে কোনো তথ্য বা অভিযোগ পৌঁছেছিল কি না এবং তখন কী ধরনের তৎপরতা নেওয়া হয়েছিল, সেটিও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত বলে তাঁরা মনে করেন।

মানববন্ধনে ফরেনসিক আলামতের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগে গণপতি চক্রবর্তী ব্যাংক থেকে প্রায় ১৫ লাখ টাকা তুলেছিলেন বলে যে তথ্য সামনে এসেছে, সেই অর্থের পরবর্তী অবস্থানও তদন্তে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। টাকা তোলার উদ্দেশ্য কী ছিল, অর্থটি কোথায় ছিল এবং হত্যাকাণ্ডের পর সেই অর্থের কোনো হদিস পাওয়া গেছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর ঘটনাটির সম্ভাব্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে বলে মনে করেন তাঁরা।

গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর ছোট ছেলে প্রিয়মকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা ওই গামছা এবং অন্যান্য আলামতের ডিএনএ ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট পরীক্ষা করার দাবি জানান। তাঁদের মতে, ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত প্রতিটি আলামত যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও পরীক্ষা করা হলে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার পাশাপাশি ঘটনাস্থলে অন্য কারও উপস্থিতি ছিল কি না, সে বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং যৌন নির্যাতনের আলামত নিয়ে যেসব প্রশ্ন সামনে এসেছে, সেগুলোরও নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা চান আন্দোলনকারীরা। একই সঙ্গে মৃতদেহের মুখ ঝলসানোর বিষয়েও ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেন। এসব বিষয়ে অনুমাননির্ভর আলোচনা না করে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য নির্ধারণের আহ্বান জানানো হয়।

পরিবারটির সম্পত্তি দখলের কোনো উদ্দেশ্য হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও তদন্তে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে পরিবারের কোনো প্রভাবশালী আত্মীয়, নিকটজন বা পরিচিত ব্যক্তি এই ঘটনায় প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে এসব বিষয়কে সম্ভাব্য তদন্তের দিক হিসেবে দেখার ওপর জোর দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা; কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে প্রমাণ ছাড়া দায়ী না করার কথাও তাঁরা উল্লেখ করেন।

বক্তারা বলেন, এত বড় একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কেবল আসামিদের স্বীকারোক্তির ওপর নির্ভর করে শেষ করা উচিত নয়। স্বীকারোক্তির সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্তের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের রেকর্ড, কল ডিটেইলস, ব্যাংক লেনদেন এবং অন্যান্য ডিজিটাল ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, সেটিই হওয়া উচিত তদন্তের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

তাঁদের মতে, একটি পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ওপর নেমে আসা শোক নয়; এটি সমাজে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগও বাড়িয়ে দেয়। নিহতদের স্বজন ও পরিচিতদের পাশাপাশি তাঁদের সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যেও যে গভীর শোক ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, শাহবাগের কর্মসূচিতে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। শিক্ষক হিসেবে গণপতি চক্রবর্তীর সঙ্গে যাঁদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল, তাঁদের কাছে এই হত্যাকাণ্ড আরও বেশি বেদনাদায়ক বলে জানান অংশগ্রহণকারীরা।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ন্যায়বিচার কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি নিহতদের পরিবার ও সমাজের অধিকার। প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তদন্তের প্রতিটি পর্যায়ে পেশাদারত্ব, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে, যাতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হন এবং কোনো অপরাধীও প্রভাব বা কৌশলের মাধ্যমে আইনের বাইরে থাকতে না পারেন।

শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন হলে শুধু নিহত পরিবারের স্বজনরাই ন্যায়বিচারের আশ্বাস পাবেন না, বরং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তদন্তে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রতিটি আলামত যথাযথভাবে যাচাই করার মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আনা সম্ভব বলে তাঁরা মনে করেন।

শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন শেষে আন্দোলনকারীরা শাহবাগ থেকে রাজু ভাস্কর্য পর্যন্ত মৌন মিছিল করেন। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়াই কর্মসূচি শেষ হয়। মিছিল থেকে নিহত পরিবারের সদস্যদের স্মরণ, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দ্রুত বিচারের দাবি জানানো হয়। এখন আন্দোলনকারীদের প্রত্যাশা, তদন্তকারী সংস্থাগুলো সামনে আসা প্রতিটি প্রশ্ন ও অসঙ্গতি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করবে এবং প্রযুক্তিগত ও ফরেনসিক প্রমাণের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করবে

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত