প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর পল্লবীতে ৬০ বছর বয়সী এক নারীর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং টাকা না দিলে বসতবাড়ি দখল ও পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী আছিয়া পল্লবী থানায় মামলা করেছেন। মামলায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে অভিযুক্তদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
মঙ্গলবার রাতে করা মামলার এজাহার অনুযায়ী, পল্লবী থানার মিরপুর-১১ নম্বর রাবেদা ক্যাম্প এলাকায় আছিয়ার একটি বসতবাড়ি রয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, অভিযুক্তরা বিভিন্ন সময়ে তাঁর বাড়িতে গিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে হলে ১০ লাখ টাকা দিতে হবে বলে চাপ দিয়ে আসছিলেন। টাকা পরিশোধের জন্য তাঁকে এক সপ্তাহের সময়সীমা দেওয়া হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে বাড়িটি দখল করে নেওয়া এবং তাঁকে ও পরিবারের সদস্যদের জানমালের ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
মামলায় রাসেল, ইব্রাহীম, শাহিন, নওশাদ ও অমিত নামে পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের বয়স ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে বলে মামলার তথ্য থেকে জানা যায়। এ ছাড়া ঘটনায় আরও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী। তবে মামলায় করা অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তাধীন এবং অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এজাহারে আছিয়া অভিযোগ করেন, গত ২১ আগস্ট ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে অভিযুক্তরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁর বসতবাড়িতে প্রবেশ করেন। ওই সময় তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের গালিগালাজ করার পাশাপাশি পূর্বে দাবি করা ১০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে বলা হয়। গভীর রাতে একটি দলবদ্ধ লোকের বাড়িতে প্রবেশের ঘটনায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
আছিয়া চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে মামলার এজাহারে এক নম্বর আসামি রাসেল পিস্তল বের করে তাঁকে গুলি করে হত্যার হুমকি দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একপর্যায়ে অভিযুক্তরা তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন এবং দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা লেগে তিনি আহত হন বলেও এজাহারে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসতে শুরু করলে অভিযুক্তরা তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের আরও ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বলে দাবি করেছেন তিনি।
ঘটনার পর থেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে অভিযোগ করেছেন আছিয়া। বিশেষ করে বাড়ি দখলের হুমকি এবং পরিবারের সদস্যদের ক্ষতির আশঙ্কা তাঁকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তাঁর অভিযোগ, ভবিষ্যতে চাঁদার টাকা না দিলে আরও বড় ধরনের হামলা বা ক্ষতির ঘটনা ঘটতে পারে। এ কারণে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা জানিয়েছেন।
এজাহারে আরও দাবি করা হয়েছে, অভিযুক্তদের সঙ্গে থাকা অজ্ঞাতনামা কয়েকজন ব্যক্তি ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁরাও ভয়ভীতি প্রদর্শনে অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন স্থানীয়ভাবে ‘আশিক গ্যাং গ্রুপ’-এর সঙ্গে যুক্ত বলে ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন। তবে কারা ওই গ্রুপের সদস্য এবং এই ঘটনায় তাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।
পল্লবী ও মিরপুর এলাকায় কথিত কিশোর ও অপরাধী চক্রের তৎপরতা নিয়ে অতীতেও বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। বিশেষ করে চাঁদা দাবি, হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। কয়েক বছর আগে পল্লবীতে ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনাতেও ‘আশিক’ নামের একটি কথিত গ্যাংয়ের নাম আলোচনায় এসেছিল। তবে বর্তমান মামলার অভিযুক্তদের সঙ্গে অতীতের কোনো ঘটনার সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটি তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
বর্তমান মামলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ এবং বাড়ি দখলের হুমকি। নগরীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসতবাড়িকে কেন্দ্র করে এ ধরনের অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে একজন প্রবীণ নারীর বাড়িতে রাতের বেলায় দলবদ্ধভাবে প্রবেশ এবং অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগ থাকায় ঘটনার প্রকৃত চিত্র দ্রুত উদ্ঘাটনের প্রয়োজন রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, আশপাশের মানুষের বক্তব্য, সম্ভাব্য সিসিটিভি ফুটেজ এবং অভিযুক্তদের গতিবিধি যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে কথিত চাঁদা দাবির আগে ও পরে অভিযুক্তদের সঙ্গে ভুক্তভোগীর কোনো যোগাযোগ হয়েছিল কি না, ফোনকল বা বার্তার মাধ্যমে কোনো হুমকি দেওয়া হয়েছিল কি না এবং বাড়ি দখলের উদ্দেশ্যে কোনো প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হাসান বাসির মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, আসামিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। পুলিশের এই বক্তব্যের পর এখন তদন্তের অগ্রগতি এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেই নজর থাকবে।
এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অভিযোগের প্রতিটি অংশ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। কারণ একদিকে অভিযোগকারী ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, অন্যদিকে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তিকে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যায় না; তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দায় নির্ধারিত হবে।
আছিয়ার অভিযোগে উঠে আসা বিষয়গুলো তাই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১০ লাখ টাকা দাবির পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল, বাড়ি দখলের হুমকির সঙ্গে কারা জড়িত, ঘটনার রাতে কারা সেখানে উপস্থিত ছিল এবং অস্ত্র প্রদর্শন ও শারীরিকভাবে আহত করার অভিযোগের সত্যতা কতটা—এসব প্রশ্নের উত্তরই মামলার পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণ করবে।
রাজধানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরে কোনো নাগরিককে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ দাবি বা বসতবাড়ি দখলের হুমকি দেওয়া হলে তা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় থাকে না, বরং এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই অভিযোগের দ্রুত তদন্ত ও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত চলছে। অভিযুক্তদের বক্তব্য, তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ সামনে এলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে। আপাতত ৬০ বছর বয়সী আছিয়া ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।