প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানুষের দৌড়ের গতিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা এত দিন পর্যন্ত কল্পবিজ্ঞানের গল্পেই বেশি দেখা গেছে। কিন্তু বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমস’-এ সেই কল্পনাকেই বাস্তবের মঞ্চে নিয়ে এসেছে চীনের তৈরি মানবসদৃশ রোবট ‘তিয়াংগং আল্ট্রা’। লার্জ-সাইজ রোবট বিভাগের ১০০ মিটার স্প্রিন্টের সেমিফাইনালে মাত্র ৮ দশমিক ৮৬ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে প্রযুক্তির সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এই রোবট।
১০০ মিটার দৌড়ে মানুষের ইতিহাসের দ্রুততম সময় ৯ দশমিক ৫৮ সেকেন্ড। ২০০৯ সালে বার্লিন বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে জ্যামাইকান কিংবদন্তি উসাইন বোল্ট এই সময় নিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন। সেই রেকর্ড এখনো মানব অ্যাথলেটিকসের সবচেয়ে আলোচিত কীর্তিগুলোর একটি। কিন্তু ‘তিয়াংগং আল্ট্রা’ সেমিফাইনালে তার চেয়েও ০ দশমিক ৭২ সেকেন্ড কম সময়ে ১০০ মিটার অতিক্রম করেছে। ফলে বেইজিংয়ের এই প্রতিযোগিতা শুধু রোবট প্রযুক্তির প্রদর্শনী নয়, মানুষের শারীরিক সক্ষমতার সঙ্গে যন্ত্রের সক্ষমতার তুলনাকেও নতুন মাত্রা দিয়েছে।
তবে রোবটের এই সময়কে মানুষের বিশ্বরেকর্ডের সঙ্গে সরাসরি একই প্রতিযোগিতামূলক মানদণ্ডে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। উসাইন বোল্টের রেকর্ড মানব অ্যাথলেটিকসের আনুষ্ঠানিক রেকর্ড, আর তিয়াংগং আল্ট্রার সময় একটি রোবট প্রতিযোগিতায় অর্জিত। অর্থাৎ এটি মানুষের ১০০ মিটার বিশ্বরেকর্ড ভেঙে দেয়নি; বরং রোবটদের জন্য আয়োজিত প্রতিযোগিতায় অসাধারণ গতি প্রদর্শন করেছে। তবুও প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে সময়টি নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য।
বেইজিং হিউম্যানয়েড রোবট ইনোভেশন সেন্টারের তৈরি তিয়াংগং আল্ট্রার জন্য এই সাফল্য হঠাৎ আসেনি। প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী দিনেই রোবটটি ৯ দশমিক ৩৯ সেকেন্ডে ১০০ মিটার দৌড়ে নিজের আগের রেকর্ড ভেঙেছিল। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে সেই সময় আরও কমিয়ে ৮ দশমিক ৮৬ সেকেন্ডে নিয়ে আসা হয়েছে। এর অর্থ, রোবটটির গতি, ভারসাম্য, নিয়ন্ত্রণ এবং দৌড়ের অ্যালগরিদমে ধারাবাহিক উন্নতি করা সম্ভব হচ্ছে।
রোবটটির সক্ষমতা শুধু স্বল্প দূরত্বের দৌড়েই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিযোগিতায় এটি বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সক্ষমতার প্রদর্শন করেছে। ৪০০ মিটার দৌড়ে ৩৮ দশমিক ১৫ সেকেন্ড এবং ১ হাজার ৫০০ মিটারে ২ মিনিট ২১ দশমিক ৬৪ সেকেন্ড সময় করার তথ্যও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে হাইজাম্পে ২ দশমিক ৮৮ মিটার উচ্চতা অতিক্রমের নজির গড়েছে রোবটটি। এসব পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে, হিউম্যানয়েড রোবটের উন্নয়ন এখন শুধু হাঁটা বা ভারসাম্য বজায় রাখার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; বরং গতি, শক্তি ও জটিল শারীরিক নড়াচড়ার দিকেও দ্রুত এগোচ্ছে প্রযুক্তি।
তবে দ্রুতগতির এই দৌড়ের শেষটা ছিল বেশ নাটকীয়। ৮ দশমিক ৮৬ সেকেন্ডে ১০০ মিটার অতিক্রম করার পর ফিনিশ লাইনের পরেই রোবটটি গতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। ফলে সামনে থাকা ভারী সুরক্ষামূলক ম্যাটে জোরে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়। সংঘর্ষের পর রোবটটির অভ্যন্তরীণ অংশে সামান্য আগুন ধরে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। দ্রুতগতির যান্ত্রিক ব্যবস্থায় গতি কমানোর প্রযুক্তি ও ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এই ঘটনাটি তার বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
মানবদেহের ক্ষেত্রে দৌড় শেষে একজন অ্যাথলেট স্বাভাবিকভাবেই গতি কমিয়ে থামতে পারেন। কিন্তু একটি রোবটকে একই কাজ করাতে হলে তাকে আগে থেকেই নির্ধারিত অ্যালগরিদম, সেন্সর, মোটর ও ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে গতি কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। উচ্চগতিতে চলার সময় সামান্য নিয়ন্ত্রণগত ত্রুটিও বড় দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। তিয়াংগং আল্ট্রার ফিনিশ লাইনের পরের দুর্ঘটনা তাই শুধু একটি প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং দ্রুতগতির হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির ক্ষেত্রে সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোরও একটি ইঙ্গিত।
চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হিউম্যানয়েড রোবট প্রযুক্তিকে কৌশলগত শিল্প হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত মোটর, সেন্সর, ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর এবং মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির সমন্বয়ে দেশটি এমন রোবট তৈরির দিকে এগোচ্ছে, যেগুলো মানুষের মতো হাঁটা, দৌড়ানো, ভারসাম্য রাখা এবং বিভিন্ন শারীরিক কাজ করতে সক্ষম।
তিয়াংগং আল্ট্রার মতো রোবটের সাফল্যের পেছনে তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, বরং একটি বৃহত্তর শিল্প অবকাঠামোর ভূমিকা রয়েছে। চীনের বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও রোবট নির্মাতারা হিউম্যানয়েড প্রযুক্তির উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি রোবটকে পরিবেশ বুঝতে, সিদ্ধান্ত নিতে এবং শারীরিক নড়াচড়া আরও নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করছে।
এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহারও ব্যাপক। কারখানায় ভারী বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, গুদামে পণ্য পরিবহন, নির্মাণ খাত, দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় উদ্ধারকাজ এবং বিভিন্ন সেবা খাতে হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে। মানুষের জন্য বিপজ্জনক বা দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের শারীরিক শ্রমের প্রয়োজন হয় এমন কাজেও ভবিষ্যতে এ ধরনের রোবট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে কিছু প্রশ্নও সামনে আসছে। রোবটের দাম, ব্যাটারির স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা, সফটওয়্যারের নির্ভরযোগ্যতা এবং মানুষের সঙ্গে একই পরিবেশে কাজ করার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি—এসব বিষয় এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে উচ্চগতির হিউম্যানয়েড রোবট সাধারণ মানুষের আশপাশে ব্যবহৃত হলে তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি অবস্থায় দ্রুত থামানোর ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বেইজিংয়ের এই প্রতিযোগিতা সেই ভবিষ্যতেরই একটি পরীক্ষাগার হিসেবে দেখা যেতে পারে। এখানে রোবটগুলো শুধু দ্রুত দৌড়ানোর সক্ষমতা প্রদর্শন করছে না; বরং মানুষের মতো শারীরিক দক্ষতা অর্জনের পথে কতটা এগিয়েছে, সেটিও দেখাচ্ছে। একসময় যে কাজের জন্য রোবটকে স্থির যন্ত্র বা চাকার প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করতে হতো, এখন সেখান থেকে বেরিয়ে দুই পায়ে দৌড়ানোর পর্যায়ে পৌঁছেছে প্রযুক্তি।
তিয়াংগং আল্ট্রার ৮ দশমিক ৮৬ সেকেন্ডের দৌড় তাই একটি সংখ্যার চেয়েও বেশি কিছু। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিকসের দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতার একটি প্রতীক। যদিও এই সময়কে উসাইন বোল্টের মানব বিশ্বরেকর্ডের আনুষ্ঠানিক প্রতিস্থাপন বলা যাবে না, তবুও একজন মানুষের সর্বোচ্চ গতির কাছাকাছি তো বটেই, তার চেয়েও দ্রুত দৌড়ানোর মতো একটি যান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হয়েছে—এটাই প্রযুক্তির অগ্রগতির বিস্ময়কর দিক।
এখন নজর থাকবে তিয়াংগং আল্ট্রা ও এর মতো হিউম্যানয়েড রোবট ভবিষ্যতে কতটা স্থিতিশীল, নিরাপদ ও ব্যবহারিক হয়ে উঠতে পারে তার ওপর। বেইজিংয়ের ট্র্যাক থেকে শুরু হওয়া এই দৌড় হয়তো শেষ পর্যন্ত মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতার গল্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং কর্মক্ষেত্র, শিল্প ও দৈনন্দিন জীবনে মানুষ ও রোবটের সহাবস্থানের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।