বাংলাদেশে শেখ হাসিনার শেষ ঠিকানাও হবে না: সারজিস

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩১ বার
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার শেষ ঠিকানাও হবে না: সারজিস

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাঙামাটিতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাংগঠনিক সমন্বয় সভায় শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন দলটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। তিনি বলেছেন, আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার কথা বাদ দিতে হবে; এমনকি তার কবরও বাংলাদেশের মাটিতে হবে না। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানুষের সঙ্গে অন্যায় ও গণহত্যার অভিযোগের পরিণতি তাকে ভোগ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বুধবার (২৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাঙামাটিতে আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তার বক্তব্যের মূল বক্তব্যের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে।

সারজিস আলমের বক্তব্যে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং দেশে তার প্রত্যাবর্তন নিয়ে এনসিপির অবস্থানের একটি কঠোর বার্তা উঠে এসেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে শেখ হাসিনা যে অন্যায় করেছেন এবং যে ধরনের গুরুতর অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন, তার পরিণতি তাকে ভোগ করতে হবে। তার ভাষায়, ডিসেম্বরে দেশে ফেরার প্রসঙ্গ তোলারই প্রয়োজন নেই; বাংলাদেশে তার কবরও হবে না। বক্তব্যের এ অংশটি সভায় উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রসঙ্গেও বক্তব্য রাখেন সারজিস। তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনা এত বেশি অন্যায় করেছেন যে বাংলাদেশে তার বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের কবর থাকলেও শেখ হাসিনার কবর বাংলাদেশে হবে না। তার বক্তব্যে মূলত শেখ হাসিনার সরকারের সময় সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার জন্য রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়ের প্রশ্নটি সামনে আসে। তবে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিচারিক নিষ্পত্তি এবং সংশ্লিষ্ট মামলার আইনগত প্রক্রিয়া পৃথক বিষয়—সারজিসের বক্তব্যকে তাই রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

রাঙামাটির ওই সাংগঠনিক সমন্বয় সভায় শুধু জাতীয় রাজনীতিই নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সমস্যা ও উন্নয়ন নিয়েও কথা বলেন এনসিপির এই নেতা। তিন পার্বত্য জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় জনগণের জন্য সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের দাবি জানান তিনি। তার বক্তব্যে পাহাড়ি ও সমতলের মানুষের মধ্যে উন্নয়ন সুবিধার ভারসাম্য তৈরির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

সারজিস আলম বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগসহ মানুষের দৈনন্দিন জীবনমানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত খাতগুলোতে কার্যকর বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। পাহাড়ের মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে বলেও তিনি মত দেন।

পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর কাঠামো নিয়েও সভায় সরব ছিলেন সারজিস। তিনি অভিযোগ করেন, এসব পরিষদে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিবেচনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং দলীয় লোকজনকে প্রাধান্য দেওয়ার ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তার মতে, স্থানীয় সরকারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে জেলা পরিষদগুলোকে দলীয় প্রভাবের বাইরে এনে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, জেলা পরিষদ গঠনের ক্ষেত্রে শুধু কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া উচিত নয়। স্থানীয় সমাজে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে জেলা পরিষদগুলোতে জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও তার বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তার বক্তব্যের আরেকটি অংশে উঠে এসেছে, নির্বাচিত সংসদ সদস্যের তুলনায় অনির্বাচিত পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের ক্ষমতা বেশি থাকা গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তিনি মনে করেন। এ কারণে জেলা পরিষদগুলোতে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি তুলে ধরেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির তুলনায় কিছুটা ভিন্ন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক এ অঞ্চলের উন্নয়নকে জটিল করে তুলেছে। ফলে এখানকার জনপ্রতিনিধিত্ব, স্থানীয় সরকার এবং সম্পদের বণ্টন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে। সারজিসের বক্তব্যেও এসব বিষয় নতুন করে সামনে এসেছে।

এদিকে শেখ হাসিনাকে ঘিরে সারজিস আলমের মন্তব্য দেশের চলমান রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা হলেও তার প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনগত প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। সারজিসের বক্তব্যে সেই রাজনৈতিক বিতর্কের একটি কঠোর অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে।

তার বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ অবশ্যই শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং কবর নিয়ে করা মন্তব্য। রাজনৈতিক বক্তব্যে এ ধরনের কঠোর ভাষা সাধারণত সমর্থকদের মধ্যে আবেগ তৈরি করলেও একই সঙ্গে তা রাজনৈতিক পরিবেশে উত্তেজনা ও বিতর্কও বাড়াতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে যেকোনো বক্তব্যই ব্যাপক জনআলোচনার জন্ম দিচ্ছে।

রাঙামাটির সভায় সারজিস আলমের বক্তব্যে তাই দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে—একদিকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এনসিপির কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় শাসনব্যবস্থা ও উন্নয়ন নিয়ে দলটির রাজনৈতিক বার্তা। তার বক্তব্যে পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের অধিকার, নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব এবং সুষম উন্নয়নের পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও তীব্র রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে।

তবে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি বাস্তব নীতিগত আলোচনার দাবি রাখে। পাহাড়ের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে এ অঞ্চলের উন্নয়ন আরও টেকসই হতে পারে। আর রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও এসব বিষয়ে জনস্বার্থকেন্দ্রিক আলোচনা ও কার্যকর নীতিনির্ধারণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সারজিস আলমের বক্তব্যের পর শেখ হাসিনার দেশে ফেরা, তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচন, প্রতিনিধিত্বের কাঠামো এবং তিন পার্বত্য জেলায় উন্নয়ন ও সম্পদ বণ্টনের প্রশ্নও রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্ব পেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত