প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ে বুধবার সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মিনিটের ব্যবধানে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের একটি বিস্তীর্ণ এলাকা পরিণত হয় ভয়াবহ বিপর্যয়ের দৃশ্যে। পাহাড়ের ওপর থেকে বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল অংশ নিচে নেমে এসে নদীর গতিপথে আঘাত করে। পরে সেই ধসের সঙ্গে পানি, কাদা, বরফ ও পাথর মিশে তৈরি হয় প্রবল স্রোত। মুহূর্তের মধ্যে নদী উপত্যকার জনপদ, সেতু, রাস্তা ও স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
২৬ আগস্টের এই ঘটনায় নেপাল ও তিব্বতে অন্তত ১৬০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। নেপালে ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ, আর তিব্বতে নিহত হয়েছেন অন্তত তিনজন। একই সঙ্গে কয়েকশ মানুষ এখনো নিখোঁজ। নিখোঁজদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দার পাশাপাশি বিদেশি পর্যটক, তীর্থযাত্রী ও বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
প্রাথমিকভাবে এই বিপর্যয়ের উৎস নিয়ে ভূমিকম্পের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের বিশ্লেষণ ও স্যাটেলাইট তথ্য থেকে জানা যায়, পাহাড়ের প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা থেকে হিমবাহের একটি বিশাল অংশ প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় ধসে পড়েছিল। সেই ধস থেকেই ভূকম্পনের মতো শক্তিশালী কম্পন তৈরি হয় এবং পরে তা ভয়াবহ ধ্বংসপ্রবাহে রূপ নেয়।
ঘটনাটি আবারও বিশ্বের সামনে একটি পুরোনো কিন্তু ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—হিমবাহ ধস আসলে কী এবং কেন একটি পাহাড়ের বরফ কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজার মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলতে পারে?
হিমবাহকে বাইরে থেকে স্থির ও নিশ্চল মনে হলেও বাস্তবে এটি একটি চলমান প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। বছরের পর বছর তুষার জমে বিশাল বরফের স্তর তৈরি হয় এবং সেই বরফ নিজস্ব ওজন ও মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে ধীরে ধীরে নিচের দিকে সরে যায়। এই চলাচলের সময় বরফের মধ্যে ফাটল তৈরি হয়, কোথাও বরফ পাতলা হয়ে যায়, আবার কোথাও বরফের নিচে পানি জমে চাপ সৃষ্টি করে। পাহাড়ের ঢাল, পাথরের গঠন, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও বরফের ভেতরে জমে থাকা পানির পরিমাণ—সবকিছু মিলে হিমবাহ কতটা স্থিতিশীল থাকবে তা নির্ধারণ করে।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে হিমবাহের বিশাল অংশ হঠাৎ ভেঙে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে আসে। এর সঙ্গে পাথর ও মাটি যুক্ত হলে ধসের আকার ও শক্তি বহুগুণ বেড়ে যায়। আর যখন এই ধ্বংসাবশেষ নদীতে গিয়ে পড়ে, তখন শুরু হয় আরও বিপজ্জনক একটি প্রক্রিয়া। নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে সাময়িকভাবে প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি করতে পারে। পরে সেই বাঁধ ভেঙে গেলে আটকে থাকা বিপুল পানি একসঙ্গে নিচে নেমে আসে। তখন পানির সঙ্গে বরফ, পাথর, কাদা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ মিশে একটি অত্যন্ত ভারী ও দ্রুতগামী স্রোত তৈরি হয়।
নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় এই ধারাবাহিকতার একটি ভয়াবহ উদাহরণ। লেন্দে খোলা নদীর উপত্যকায় নেমে আসা ধ্বংসপ্রবাহ পরে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়। ত্রিশূলী নদীর পানির উচ্চতা কিছু এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে পাহাড়ি উৎসে শুরু হওয়া একটি ঘটনা নদীপথ ধরে বহু দূরের জনপদেও বিপর্যয় ছড়িয়ে দেয়।
এ ধরনের বিপর্যয়কে বিজ্ঞানীরা অনেক সময় ‘হ্যাজার্ড ক্যাসকেড’ বা ধারাবাহিক বিপর্যয় হিসেবে দেখেন। অর্থাৎ একটি প্রাকৃতিক ঘটনা আরেকটি ঘটনাকে উসকে দেয়। প্রথমে বরফ ও পাথর ধসে পড়ে, এরপর নদী আটকে যায়, তারপর প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে বন্যা হয় এবং শেষ পর্যন্ত কাদা-পাথরের স্রোত জনবসতিতে আঘাত হানে। ফলে বিপদের পরিধি শুধু হিমবাহের নিচের এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না।
ভারতের উত্তরাখণ্ডের চামোলিতে ২০২১ সালের বিপর্যয়ও এমন একটি ধারাবাহিক ধ্বংসের উদাহরণ। ওই বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি রন্টি পিকের উত্তর ঢাল থেকে প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ ঘনমিটার পাথর ও হিমবাহের বরফ ভেঙে নিচে নেমে আসে। ধসটি দ্রুত একটি অত্যন্ত গতিশীল ধ্বংসপ্রবাহে পরিণত হয়ে রন্টি গ্যাড, ঋষিগঙ্গা ও ধৌলিগঙ্গা উপত্যকা দিয়ে ছুটে যায়। এতে দুই শতাধিক মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হন এবং দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইতালির মারমোলাদা হিমবাহের ঘটনাও বিশ্বকে একই ধরনের বিপদের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। ২০২২ সালের ৩ জুলাই ডোলোমাইটস পর্বতমালার মারমোলাদা হিমবাহের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ে। ওই ঘটনায় ১১ জন নিহত হন। পরবর্তী গবেষণায় দেখা যায়, অস্বাভাবিক উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে হিমবাহের ভেতরে বিপুল পরিমাণ গলিত পানি জমেছিল। একটি বড় ফাটলের ভেতরে পানি জমে চাপ বাড়তে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত হিমবাহের একটি অংশ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
মারমোলাদার ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখিয়েছে উষ্ণতা বৃদ্ধি কীভাবে সরাসরি কোনো পাহাড়ের বরফকে ধসিয়ে দিতে পারে তার চেয়েও জটিল প্রক্রিয়ায় কাজ করে। বরফ গলে পানি তৈরি হয়, সেই পানি ফাটলের ভেতর ঢোকে, নিচের স্তরে চাপ সৃষ্টি করে এবং বরফ ও পাথরের মধ্যকার ঘর্ষণ কমিয়ে দেয়। ফলে যে অংশ দীর্ঘদিন স্থিতিশীল ছিল, সেটিই হঠাৎ ভেঙে পড়তে পারে।
সুইজারল্যান্ডের ব্লাটেনেও ২০২৫ সালে ভয়াবহ হিমবাহ ও পাহাড়ি ধসের ঘটনা ঘটে। সেখানে বিপদের আশঙ্কায় আগেই স্থানীয় বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্তূপ গ্রামের বড় অংশ ঢেকে দেয় এবং নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে। ঘটনাটি আবারও দেখিয়েছে, পাহাড়ি অঞ্চলে হিমবাহের পাশাপাশি পাথুরে ঢাল ও দীর্ঘদিন জমে থাকা বরফ বা পারমাফ্রস্টের স্থিতিশীলতাও কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
রাশিয়ার কোলকা হিমবাহের ঘটনা আরও ভয়াবহ। ২০০২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ককেশাস পর্বতমালায় পাথর ও বরফের বিশাল ধস কোলকা হিমবাহে আঘাত করে। এরপর বরফ, তুষার, পাথর ও কাদার ভয়ংকর স্রোত জেনালডন নদীর উপত্যকা দিয়ে নেমে যায়। অন্তত ১২৫ জনের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে। বিপর্যয়টির বিশালতা ও গতি পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ গবেষণার বিষয় হয়ে ওঠে।
হিমবাহ ধসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—এ ধরনের ঘটনা কি আগে থেকে বোঝা সম্ভব? উত্তরটি সহজ নয়। কিছু ক্ষেত্রে বড় ফাটল, বরফের গতি বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বা পানি জমার মতো পরিবর্তন আগাম সংকেত দিতে পারে। কিন্তু অনেক সময় এসব পরিবর্তন খুব ধীরে ঘটে এবং ধসের ঠিক আগে কোনো স্পষ্ট সতর্ক সংকেত পাওয়া যায় না। মারমোলাদা ও কোলকার মতো ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, পাহাড়ের ওপরের পরিস্থিতি যতটা সম্ভব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
এখানেই আধুনিক প্রযুক্তির গুরুত্ব বাড়ছে। দুর্গম পাহাড়ে সব সময় গবেষক বা উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেন না। তাই স্যাটেলাইট, রাডার, ড্রোন, জিপিএস, তাপমাত্রা সেন্সর এবং ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ব্যবহার করে হিমবাহের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোনো হিমবাহ দ্রুত এগোচ্ছে কি না, নতুন ফাটল তৈরি হচ্ছে কি না, আশপাশে পানি জমছে কি না—এসব তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা গেলে ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া সম্ভব।
তবে হিমবাহ ধসের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়েও সতর্কভাবে কথা বলা জরুরি। কোনো নির্দিষ্ট ধসকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসেবে চিহ্নিত করা সব সময় বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। ভূমিকম্প, পাহাড়ের ঢাল, পাথরের গঠন, তুষারপাত, বৃষ্টিপাত ও হিমবাহের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন—অনেক কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
তারপরও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন হিমালয় ও অন্যান্য উচ্চ পর্বত অঞ্চলের ঝুঁকি বদলে দিচ্ছে—এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ রয়েছে। হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ দ্রুত বরফ হারাচ্ছে। হিমবাহ পিছিয়ে যাওয়ার সঙ্গে নতুন হ্রদ তৈরি হতে পারে, গলিত পানি বাড়তে পারে এবং পাহাড়ের কিছু অংশের স্থিতিশীলতা পরিবর্তিত হতে পারে।
নেপালের এবারের বিপর্যয় তাই শুধু একটি পাহাড় ধসের ঘটনা নয়। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, পাহাড়ের চূড়ায় শুরু হওয়া একটি পরিবর্তন কীভাবে নদী, জনপদ ও মানুষের জীবনের ওপর একের পর এক প্রভাব ফেলতে পারে। একটি বরফের অংশ ভেঙে পড়া থেকে শুরু করে নদী আটকে যাওয়া, প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি, বাঁধ ভেঙে বন্যা এবং শেষে কাদা-পাথরের স্রোত—পুরো প্রক্রিয়াটি কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন হতে পারে।
এই বাস্তবতা পাহাড়ি অঞ্চলের জন্য আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। শুধু হিমবাহ পর্যবেক্ষণ করলেই হবে না; নদীর গতিপথ, সম্ভাব্য প্রাকৃতিক বাঁধ, হিমবাহ-হ্রদ, পাহাড়ের ঢাল এবং নদীতীরবর্তী জনবসতিকেও একই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে।
হিমবাহ পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক জলাধার। হাজার বছরের তুষার ও বরফ জমে তৈরি হওয়া এসব হিমবাহ গলিত পানি সরবরাহ করে বহু নদীকে জীবন্ত রাখে। কিন্তু উষ্ণ পৃথিবীতে তাদের চরিত্র বদলাচ্ছে। কোথাও বরফ দ্রুত কমছে, কোথাও নতুন হ্রদ তৈরি হচ্ছে, আবার কোথাও পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।
পাহাড়ের বরফ কখন ধসে পড়বে, তা হয়তো সব সময় থামানো সম্ভব নয়। কিন্তু সেই ধসের আগেই ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, নদীপথের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করা এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্ভাব্য পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব। নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় সেই বার্তাই আবারও সামনে এনেছে—হিমবাহের ওপরের নীরব পরিবর্তনকে অবহেলা করার সুযোগ আর নেই। কারণ পাহাড়ের চূড়ায় শুরু হওয়া একটি ছোট পরিবর্তনও কখনো কখনো নিচে নেমে আসতে পারে মৃত্যুর স্রোত হয়ে।