প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’কে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ইতালিভিত্তিক সংগঠন ‘অটিস্টিকি/ইনভেন্তাতি’ এবং ফিলিস্তিনপন্থী ‘মাসার বাদিল’-এর বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত সংগঠনগুলোর অর্থায়ন ও কার্যক্রম বন্ধ করাই এর উদ্দেশ্য। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের ওপর চাপ বাড়াতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট প্যালেস্টাইন অ্যাকশনসহ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে ‘সহিংস উগ্র-বামপন্থী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, এসব গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র তার ‘পূর্ণ অর্থনৈতিক ক্ষমতা’ ব্যবহার করবে। এর ফলে সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বড় ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্যালেস্টাইন অ্যাকশন যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন। সংগঠনটি নিজেদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ইসরাইলের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বন্ধ করা এবং ফিলিস্তিনে ইসরাইলের সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা বলে। বিশেষ করে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির কার্যক্রম আন্তর্জাতিকভাবে আরও বেশি আলোচনায় আসে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরাইলের ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু হলে বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলন জোরালো হয়। ওই সময় প্যালেস্টাইন অ্যাকশন ইসরাইলি অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবাদ ও অভিযান পরিচালনা করে। সংগঠনটির বিরুদ্ধে স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর এবং সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ রয়েছে। সংগঠনটির সমর্থকদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল ইসরাইলের সামরিক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত করা এবং ফিলিস্তিনের প্রতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ বাড়ানো।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এসব কর্মকাণ্ডকে ভিন্নভাবে দেখছে। মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, সহিংসতা ও সম্পদ ধ্বংসের সঙ্গে যুক্ত কর্মকাণ্ডের কারণে সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে সংগঠনটির যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষ অর্থনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের ফলে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের আন্তর্জাতিক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে পারে। বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন বা তাদের জন্য অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে মার্কিন আইনে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। সংগঠনটির সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ জব্দ করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ সীমিত করার পথও এতে উন্মুক্ত হয়। ফলে সিদ্ধান্তটি শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সংগঠনটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ওপরও এর বাস্তব প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যও এর আগে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার পর এর পক্ষে প্রকাশ্য সমর্থন ও বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের নিয়েও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক প্রতিবাদ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
সংগঠনটির এক সহপ্রতিষ্ঠাতা মার্কিন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা মুক্ত মতপ্রকাশ ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করে। তাঁর দাবি, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের পক্ষে এবং ইসরাইলবিরোধী আন্দোলনের ওপর আন্তর্জাতিকভাবে আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান একেবারেই ভিন্ন। ওয়াশিংটনের মতে, কোনো সংগঠন যদি সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে এবং সেই কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষ বা সম্পদের ওপর গুরুতর হুমকি তৈরি করে, তাহলে তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা সীমিত করা জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, সংগঠনগুলোর অর্থায়নের পথ বন্ধ করা গেলে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতাও কমে আসবে।
প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ‘মাসার বাদিল’-এর বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, সংগঠনটি ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইনের বা পিএফএলপির একটি আড়াল হিসেবে কাজ করে। পিএফএলপিকে যুক্তরাষ্ট্র আগেই বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ফলে মাসার বাদিলের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী আর্থিক নীতির ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ইতালিভিত্তিক ‘অটিস্টিকি/ইনভেন্তাতি’-এর বিরুদ্ধেও একই সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সংগঠনটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ এবং নিষেধাজ্ঞার ফলে এর আর্থিক কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সিদ্ধান্তে কয়েকটি সংগঠনকে লক্ষ্যবস্তু করায় ওয়াশিংটন যে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের কিছু অংশের বিরুদ্ধে সমন্বিতভাবে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে, সেটিও স্পষ্ট হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তথাকথিত ‘উগ্র-বামপন্থী’ সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ জোরদারের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। নতুন এই সিদ্ধান্তকে সেই বৃহত্তর নীতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্কিন প্রশাসন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাজনৈতিক সহিংসতা এবং চরমপন্থার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলে আসছে। তবে এই নীতির প্রয়োগ নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীদের একটি অংশ মনে করছেন, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিবাদী কর্মকাণ্ড এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকা জরুরি। তাদের আশঙ্কা, প্রতিবাদের নামে সংঘটিত অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও সব ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলনকে নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধের পর ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় আকার ধারণ করায় এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, কোনো সংগঠন যদি প্রতিবাদের নামে সহিংসতা, হামলা বা সম্পদ ধ্বংসের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সিদ্ধান্তকে তারা সেই নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখছেন। ফলে বিষয়টি শুধু ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; রাজনৈতিক প্রতিবাদ, নাগরিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মধ্যকার সীমারেখা নিয়েও এর ব্যাপক তাৎপর্য রয়েছে।
প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার ফলে সংগঠনটির সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা সীমিত হওয়া, অর্থ সংগ্রহের সুযোগ কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বাধা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠনটির সমর্থকদের জন্যও আইনি ও আর্থিক ঝুঁকি বাড়তে পারে।
গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক বিভাজন যখন তীব্র, তখন যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বিতর্ককে আরও গভীর করতে পারে। ওয়াশিংটন যেখানে এটিকে নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করছে, সেখানে সংগঠনটির সমর্থকেরা এটিকে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের ওপর চাপ হিসেবে দেখছেন। ফলে আগামী দিনে প্যালেস্টাইন অ্যাকশন ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর কার্যক্রম, তাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের ওপর এর প্রভাব বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠবে।