গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে থমকে গেছে হালকা প্রকৌশল খাত

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৪ বার
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে থমকে গেছে হালকা প্রকৌশল খাত

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের হালকা প্রকৌশল শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব ক্রমেই গভীর হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিয়ম, ঘন ঘন লোডশেডিং এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে অনেক কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একই সময়ে জেনারেটর চালানোর অতিরিক্ত ব্যয়, বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের উচ্চমূলন উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। ফলে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়। এতে অনেক ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে পড়েছেন।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর একটি কারখানার চিত্র এ সংকটের বাস্তবতা স্পষ্ট করে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে পানির কল তৈরি করা ফয়সল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ কয়েক মাস ধরেই বাজারের দুর্বল চাহিদা ও কাঁচামালের বাড়তি দামের সঙ্গে লড়ছিল। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক গ্যাস সংকট যুক্ত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ৬০ শতাংশের বেশি কমে গেছে।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সোলায়মান পারসীর ভাষ্য অনুযায়ী, পিতল গলানোর জন্য কারখানায় সার্বক্ষণিক গ্যাসের ফার্নেস চালু রাখতে হয়। কিন্তু গত চার-পাঁচ মাস ধরে গ্যাসের চাপ কমতে কমতে বর্তমানে পরিস্থিতি প্রায় বন্ধ হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে দিনে তিন-চার ঘণ্টার বেশি কারখানা চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি জানান, কারখানা চালু রাখার জন্য দৈনিক প্রায় ১৮ হাজার টাকা ব্যয় হয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এ ব্যয় তুলতে দিনে সাত থেকে আট লাখ টাকার পণ্য উৎপাদন প্রয়োজন হলেও গ্যাস সংকটে উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র তিন থেকে চার লাখ টাকায়। অর্থাৎ উৎপাদন সক্ষমতা কমার পাশাপাশি নির্দিষ্ট ব্যয় বহাল থাকায় প্রতিদিনই আর্থিক চাপ বাড়ছে।

উৎপাদন কমার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানেও। এক বছর আগেও ওই কারখানায় ৩০ জন কর্মী কাজ করতেন। বর্তমানে কর্মীর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১২ জনে। উৎপাদন স্বাভাবিক না হলে কর্মসংস্থানের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।

শুধু একটি কারখানা নয়, যাত্রাবাড়ীর ওই এলাকায় পানির কল উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত প্রায় সাড়ে তিন শ ছোট-বড় কারখানা রয়েছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকের নিজস্ব পিতল গলানোর ব্যবস্থা থাকলেও ছোট উদ্যোক্তারা অন্য কাস্টিং কারখানার ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাসের চাপ কমে কাস্টিং কার্যক্রম ব্যাহত হলে তার প্রভাব পুরো উৎপাদনশীল শৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়ে। একটি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হলে অন্য কারখানার কাজও থমকে যায়।

দেশের অন্যান্য হালকা প্রকৌশল ক্লাস্টারেও একই ধরনের সংকটের খবর পাওয়া যাচ্ছে। কেরানীগঞ্জ, বগুড়া, নারায়ণগঞ্জ, পাবনা এবং রাজধানীর আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের অনিয়ম উদ্যোক্তাদের উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত করছে। যেসব কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়া সরাসরি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে কাস্টিং, মেল্টিং ও হিট ট্রিটমেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

হালকা প্রকৌশল খাত বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার হালকা প্রকৌশল কারখানা রয়েছে। এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষ যুক্ত। কৃষি যন্ত্রপাতি, শিল্পের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, ধাতব পণ্য, প্লাস্টিকের ছাঁচ, পানির কলসহ নানা ধরনের পণ্য উৎপাদনে এসব প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এ কারণে এ খাতে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট শুধু উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়তে পারে কর্মসংস্থান, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় শিল্প উৎপাদনের ওপরও। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য পরিস্থিতি বেশি কঠিন। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় তাদের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ বা কম থাকলে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।

গাজীপুরের শালনায় কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী অ্যাগ্রো মেশিনারি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ক্ষেত্রেও বিদ্যুৎ সংকট উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শেখ সাদী জানিয়েছেন, দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। প্রতিবার বিদ্যুৎ চলে গেলে এক ঘণ্টার আগে তা ফিরে আসে না। এতে স্বাভাবিক উৎপাদন প্রক্রিয়া বারবার থেমে যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে যে কাজ আধা ঘণ্টায় শেষ হওয়ার কথা, সেটি করতে কখনো কখনো অর্ধেক দিন লেগে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। এর প্রভাব পড়েছে ক্রেতাদের অর্ডার সরবরাহেও। সময়মতো পণ্য দিতে না পারায় ব্যবসায়িক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শেখ সাদীর মতে, দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চললে ছোট উদ্যোক্তাদের পক্ষে ব্যবসা ধরে রাখা কঠিন হবে। তিনি কারখানা অন্য এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও ভাবছেন। তবে স্থানান্তর করতে বাড়তি বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের জন্য সহজ নয়। ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও ছোট উদ্যোক্তারা নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন। ফলে নিজেদের সঞ্চয়, ধারদেনা ও সীমিত মূলধন দিয়েই ব্যবসা চালাতে হয়।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকলেও ব্যয় কমছে না, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়ছে। কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক ডাইস বা ছাঁচ তৈরির প্রতিষ্ঠান ব্রাদার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উদ্যোক্তা মো. মফিজুল ইসলাম জানিয়েছেন, লোডশেডিং মোকাবিলায় জেনারেটর চালাতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন হচ্ছে। এতে জেনারেটর পরিচালনার ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি বিদ্যুৎ বিলও আগের তুলনায় বেশি এসেছে।

তার দাবি, গত এক মাসে জেনারেটর পরিচালনার খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ বিল ৩০ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ উদ্যোক্তারা একই সময়ে বেশি খরচ করছেন এবং কম পণ্য উৎপাদন করছেন। ব্যবসার ভাষায় এ পরিস্থিতি একটি প্রতিষ্ঠানের লাভজনকতা দ্রুত কমিয়ে দিতে পারে।

গ্যাস ও বিদ্যুতের এই সংকট এমন সময়ে দেখা দিয়েছে, যখন দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক শিল্পপণ্যের বাজারে চাহিদা আগের তুলনায় দুর্বল। ফলে উদ্যোক্তাদের একসঙ্গে কয়েকটি চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। কাঁচামালের দাম বাড়ছে, ক্রেতার চাহিদা কমছে, উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ব্যাংকঋণের কিস্তি, শ্রমিকদের বেতন এবং অন্যান্য স্থায়ী পরিচালন ব্যয়।

এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, উদ্যোক্তারা নিয়মিত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে তাদের সমস্যার কথা জানাচ্ছেন। সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান অর্ডার পাওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না। এতে তাদের আর্থিক ও ব্যবসায়িক চাপ বাড়ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধেও সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

হালকা প্রকৌশল শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ কেবল উৎপাদনের বিষয় নয়; এটি পুরো শিল্প সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত। একটি কারখানায় ধাতু গলানো থেকে শুরু করে যন্ত্রাংশ তৈরি, ছাঁচ প্রস্তুত, তাপপ্রক্রিয়াকরণ এবং চূড়ান্ত পণ্য তৈরির প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট সময় ও তাপমাত্রা প্রয়োজন হতে পারে। মাঝপথে বিদ্যুৎ বা গ্যাস চলে গেলে অনেক সময় শুধু কাজ থেমে যায় না, আগের উৎপাদনও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

উদ্যোক্তাদের জন্য তাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন ও পূর্বানুমানযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ। তারা কখন বিদ্যুৎ বা গ্যাস পাবেন, তা যদি নিশ্চিতভাবে জানা না থাকে, তাহলে উৎপাদন পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ক্রেতার অর্ডার নেওয়া, শ্রমিকের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং কাঁচামাল ব্যবস্থাপনাও অনিশ্চিত হয়ে যায়।

এই পরিস্থিতিতে শিল্পসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সরকার জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বাস্তব সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। কারণ হালকা প্রকৌশল খাতের হাজারো কারখানা একদিকে যেমন স্থানীয় শিল্পের ভিত্তি শক্ত করে, তেমনি বিপুল মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি করে।

বর্তমান সংকট দ্রুত সমাধান না হলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে। ছোট উদ্যোক্তারা ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবতে পারেন। এতে দীর্ঘমেয়াদে শিল্পায়নের গতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাই গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু সাময়িক উৎপাদন সমস্যা হিসেবে না দেখে শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত একটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। উদ্যোক্তারা বলছেন, বাজারের প্রতিকূলতা তারা নানা উপায়ে সামাল দিতে পারেন; কিন্তু উৎপাদনের মূল জ্বালানি যদি নিয়মিত না থাকে, তাহলে কারখানা সচল রাখাই কঠিন হয়ে পড়ে। আর কারখানার চাকা থেমে গেলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত শ্রমিক, উদ্যোক্তা, ক্রেতা ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরই পড়ে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত