এআই বুমে ফের উত্থান এনভিডিয়ার শেয়ারে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৭ বার
এআই বুমে ফের উত্থান এনভিডিয়ার শেয়ারে

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে যে বিনিয়োগের ঢেউ তৈরি হয়েছে, তা শিগগিরই থেমে যাচ্ছে না—এমন আশাবাদী পূর্বাভাস দিয়েছে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া। কোম্পানিটির এই বার্তার পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে। বিশেষ করে এআই অবকাঠামো তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ আরও কয়েক বছর অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আস্থা তৈরি করেছে।

বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের বাজার খোলার আগে এনভিডিয়ার শেয়ারদর ৬ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। একপর্যায়ে শেয়ারটি ৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ২২৩ দশমিক ৭১ ডলারে পৌঁছায়। এতে কোম্পানিটির বাজারমূল্য প্রায় ৩৪ হাজার কোটি ডলার বাড়ার পথে ছিল। বিশ্বের প্রযুক্তি খাতে এনভিডিয়ার গুরুত্ব বিবেচনায় এই উত্থান শুধু একটি কোম্পানির শেয়ারবাজারের সাফল্য নয়, বরং এআই অর্থনীতিকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশারও একটি বড় প্রতিফলন।

এনভিডিয়ার সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী অর্থবছরে কোম্পানিটির রাজস্ব প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়তে পারে। পাশাপাশি চলতি প্রান্তিকের বিক্রিও ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এই তথ্য বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ মনে করছে, এআই খাতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা এখনো কোম্পানিগুলোর জন্য বাস্তব ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করছে।

এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেনসেন হুয়াংয়ের বক্তব্যও বিনিয়োগকারীদের আশাবাদ বাড়িয়েছে। তাঁর মতে, এআই প্রযুক্তি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পর্যায়ে পৌঁছেছে। এত দিন যেখানে এআইকে অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হতো, এখন সেটি বাস্তব জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক ব্যবহারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে এআই মডেল তৈরি, প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং সক্ষমতার চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে।

এআইয়ের এই অবকাঠামোগত চাহিদার কেন্দ্রে রয়েছে শক্তিশালী চিপ। বৃহৎ ভাষা মডেল, জেনারেটিভ এআই, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং বিভিন্ন ধরনের স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রয়োজন হয়। আর সেই চাহিদা পূরণে এনভিডিয়ার গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

সাম্প্রতিক সময়ে এআইয়ের ব্যবহার বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমা ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হচ্ছে। বিভিন্ন এআই গবেষণাগার, নতুন প্রজন্মের ক্লাউড সেবা প্রতিষ্ঠান এবং অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ফলে এনভিডিয়ার চিপের চাহিদা শুধু একটি নির্দিষ্ট ধরনের গ্রাহকের ওপর নির্ভর করছে না; বরং এআই অর্থনীতির বিস্তৃত পরিসরজুড়ে এর বাজার তৈরি হচ্ছে।

এনভিডিয়ার দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফলও সেই চিত্রই তুলে ধরেছে। ওই প্রান্তিকে কোম্পানিটি ৯৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব করেছে। এর মধ্যে শুধু ডেটা সেন্টার ব্যবসা থেকেই এসেছে প্রায় ৮৯ বিলিয়ন ডলার। এআই প্রযুক্তির জন্য ডেটা সেন্টারগুলোতে যে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হচ্ছে, তার সরাসরি সুফল এনভিডিয়ার ব্যবসায় প্রতিফলিত হচ্ছে।

বিশ্বের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য নিজেদের ডেটা সেন্টারের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এ জন্য প্রয়োজন হচ্ছে বিপুলসংখ্যক উন্নতমানের চিপ, উচ্চক্ষমতার সার্ভার এবং দ্রুতগতির নেটওয়ার্কিং প্রযুক্তি। ফলে এআইয়ের প্রতিটি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে কম্পিউটিং অবকাঠামোর চাহিদাও বাড়ছে। এনভিডিয়া এই প্রবণতার অন্যতম প্রধান সুবিধাভোগী।

তবে সাম্প্রতিক উত্থানের আগে এনভিডিয়ার শেয়ারে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছিল। মে মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠার পর শেয়ারদর প্রায় ১২ শতাংশ কমে যায়। এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের এই প্রবণতা কত দিন ধরে রাখা সম্ভব হবে, সেটিই তখন বিনিয়োগকারীদের অন্যতম বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল। কারণ বিশ্বের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এআই অবকাঠামোতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। এই ব্যয় থেকে কত দ্রুত আয় আসবে এবং বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সুফল কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে বাজারে আলোচনা ছিল।

এনভিডিয়ার নতুন পূর্বাভাস সেই উদ্বেগ অনেকটাই কমিয়েছে। কোম্পানিটির প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী বিক্রয় পূর্বাভাস বাজারকে বোঝাচ্ছে যে এআই অবকাঠামোর চাহিদা এখনো দুর্বল হয়নি। বরং আগামী কয়েক বছরেও এই খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এই সম্ভাবনাই বিনিয়োগকারীদের আবার প্রযুক্তি খাতের দিকে আগ্রহী করে তুলেছে।

এনভিডিয়ার উত্থানের প্রভাব অন্য এআই অবকাঠামো সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারেও পড়েছে। কোরউইভ ও নেবিয়াসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারদরও বেড়েছে। এসব কোম্পানি এআই কম্পিউটিং অবকাঠামো ও ক্লাউড সেবার সঙ্গে যুক্ত। ফলে এনভিডিয়ার শক্তিশালী পূর্বাভাসকে বাজারের একটি অংশ এআই খাতের সামগ্রিক চাহিদার ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছে।

তবে সবকিছুই যে ঝুঁকিমুক্ত, তা নয়। এআই খাতে চাহিদা বাড়লেও প্রয়োজনীয় চিপ ও অন্যান্য প্রযুক্তি সরঞ্জামের সরবরাহ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। এনভিডিয়ার নিজস্ব পূর্বাভাসেও সরবরাহসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে। উন্নত চিপ উৎপাদনের জন্য জটিল সরবরাহব্যবস্থা, বিশেষায়িত উৎপাদন সক্ষমতা এবং বিপুল পরিমাণ প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর প্রয়োজন হয়। কোনো একটি পর্যায়ে সরবরাহ ব্যাহত হলে কোম্পানির বিক্রয় ও মুনাফার ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।

এ ছাড়া এআই শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নিজেদের চিপ ও কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে অন্যান্য চিপ নির্মাতারাও এআই বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে এনভিডিয়ার বর্তমান বাজার-প্রাধান্য ধরে রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তারপরও বর্তমান পরিস্থিতিতে এনভিডিয়ার বার্তা বেশ স্পষ্ট। এআইয়ের জন্য কম্পিউটিং অবকাঠামোয় বিনিয়োগের বড় ঢেউ এখনই শেষ হচ্ছে না। বরং প্রযুক্তিটি পরীক্ষামূলক পর্যায় পেরিয়ে ব্যবসা, গবেষণা, ক্লাউড সেবা ও দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও গভীরভাবে প্রবেশ করায় অবকাঠামোর প্রয়োজনও বাড়তে পারে।

বিনিয়োগকারীদের জন্য তাই এনভিডিয়ার সাম্প্রতিক পূর্বাভাস শুধু একটি কোম্পানির আয় বৃদ্ধির খবর নয়। এটি এআই অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বাজারের প্রত্যাশারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। আগামী কয়েক বছরে এআই প্রযুক্তি কতটা দ্রুত বিস্তৃত হবে, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা অর্থ ব্যয় করবে এবং সেই বিনিয়োগ কতটা লাভজনক হবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে এই উত্থান কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

এই মুহূর্তে অবশ্য বাজারের বার্তা ইতিবাচক। এআইয়ের দৌড় থামেনি, আর সেই দৌড়ের অন্যতম প্রধান চালক হিসেবে এনভিডিয়াও আবার বিনিয়োগকারীদের আস্থার কেন্দ্রে ফিরে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত