প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি পোস্টের বিষয়বস্তু নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। একটি দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরকারি ও ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে কী ধরনের কনটেন্ট প্রকাশ করা উচিত, সে বিষয়ে ন্যূনতম ‘কমনসেন্স’ থাকা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
বুধবার (২৬ আগস্ট) বেলা ৩টার দিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি পোস্টে মন্তব্য করতে গিয়ে সারজিস আলম এ কথা বলেন। তার মন্তব্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই পোস্টে বলা হয়, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে অংশ নিয়েছেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলেছেন এবং সাক্ষাৎকারটির লিংক প্রথম কমেন্টে দেওয়া হয়েছে বলে পোস্টে উল্লেখ করা হয়।
সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ধরন নিয়ে সারজিস আলমের আপত্তির মূল জায়গাটি ছিল এই পোস্টের উপস্থাপন। তিনি পোস্টটির মন্তব্যের ঘরে লেখেন, ‘একটা দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেরিফায়েড পেজ থেকে কী পোস্ট করা উচিত সেই বিষয়ে আপনাদের মিনিমাম কমনসেন্স থাকা দরকার।’
সারজিসের এই মন্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা শুরু হয়। একটি সরকারি মন্ত্রণালয়ের ভেরিফায়েড পেজে কী ধরনের তথ্য প্রকাশ করা উচিত, রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের ক্ষেত্রে কনটেন্ট নির্বাচনের মানদণ্ড কী হওয়া প্রয়োজন এবং সরকারি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কোনো গণমাধ্যমের সাক্ষাৎকার প্রচারের যৌক্তিকতা কতটা—এসব প্রশ্ন সামনে আসে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং বিদেশি রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। ফলে মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিটি পোস্টও জনসাধারণের কাছে রাষ্ট্রীয় বার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ কারণে এসব প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত তথ্যের ভাষা, বিষয়বস্তু ও উপস্থাপন নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বর্তমানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাগুলো এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, কর্মসূচি, ঘোষণা, আন্তর্জাতিক বৈঠক, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য সম্পর্কে নাগরিকদের অবহিত করে থাকে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কোনো পোস্ট দ্রুত ব্যাপক মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ায় সেখানে কনটেন্ট নির্বাচনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পোস্টটি নিয়ে সারজিস আলমের মন্তব্যকে ঘিরে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তার বক্তব্য মূলত সরকারি যোগাযোগের পেশাদারিত্ব ও কনটেন্ট ব্যবস্থাপনার প্রশ্নকে সামনে এনেছে।
মন্ত্রণালয়ের পোস্টে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সাক্ষাৎকারের বিষয়টি তুলে ধরা হলেও সাক্ষাৎকারটি কোন বিষয়ে বা কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গ নিয়ে দেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে পোস্টের মূল অংশে বিস্তারিত কিছু উল্লেখ করা হয়নি। বরং সাক্ষাৎকারের লিংক প্রথম কমেন্টে দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। সারজিস আলম সম্ভবত এই উপস্থাপনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
তবে সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি গণমাধ্যমে দেওয়া মন্ত্রীর সাক্ষাৎকার প্রচার করা যাবে কি না, সেটি নির্ভর করতে পারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগনীতি, সাক্ষাৎকারের বিষয়বস্তু এবং সেটিকে রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তার ওপর। তাই শুধু একটি পোস্টের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয়ের সামগ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সমীচীন নয়।
এদিকে সারজিস আলমের মন্তব্যের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই পোস্টে মন্তব্য করার সুযোগ সীমিত করা হয়। কখন এবং কী কারণে মন্তব্যের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে, সে বিষয়ে দেওয়া তথ্যের মধ্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে এ ঘটনায় সরকারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি এখন কেবল তথ্য প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নাগরিকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, সরকারি সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করা এবং বিভিন্ন বিষয়ে রাষ্ট্রীয় অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রেও এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে কোনো পোস্টের ভাষা বা বিষয়বস্তু নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা দ্রুত রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার অংশ হয়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। কারণ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বক্তব্য দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বিদেশি অংশীদারদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। যদিও একটি গণমাধ্যম সাক্ষাৎকারের প্রচারণামূলক পোস্ট সরাসরি কোনো পররাষ্ট্রনীতির ঘোষণা নয়, তবু সরকারি প্ল্যাটফর্মে এর উপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সারজিস আলমের বক্তব্যও মূলত এই বৃহত্তর সরকারি যোগাযোগের মান ও দায়িত্বশীলতার প্রসঙ্গকে সামনে এনেছে। তিনি পোস্টটির বিষয়বস্তু নিয়ে সরাসরি সমালোচনা করেছেন এবং সরকারি ভেরিফায়েড পেজে কী ধরনের পোস্ট থাকা উচিত, সে বিষয়ে আরও সতর্কতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
অন্যদিকে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সারজিস আলমের মন্তব্যের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়েছে কি না, তা প্রকাশিত তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে মন্ত্রণালয় কেন ওই পোস্টটি প্রকাশ করেছে বা পোস্টের উদ্দেশ্য কী ছিল, সে বিষয়ে চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগও এখন সীমিত।
ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টকে ঘিরে হলেও এর মধ্য দিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিজিটাল যোগাযোগের গুরুত্ব আবারও সামনে এসেছে। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিটি পোস্ট মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে তথ্যের যথার্থতা, প্রাসঙ্গিকতা, ভাষার ভারসাম্য এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা—সবকিছু বিবেচনায় রেখেই কনটেন্ট প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সারজিস আলমের মন্তব্য সেই দায়িত্বশীলতার প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এনেছে। এখন বিষয়টি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো ব্যাখ্যা বা নীতিগত অবস্থান আসে কি না, সেটিই দেখার বিষয়। একই সঙ্গে সরকারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ভবিষ্যতে আরও সুস্পষ্ট নীতিমালা ও পেশাদার কনটেন্ট ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা অব্যাহত থাকতে পারে।