প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রংপুরের আলোচিত চার খুন মামলার তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। মামলায় অভিযুক্ত মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের ডোপ টেস্টের ফলাফল নেগেটিভ এসেছে বলে জানিয়েছে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ। একই সঙ্গে পুলিশি রিমান্ডের আবেদন মঞ্জুর না করে আদালত দুই আসামিকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, তদন্তকারী কর্মকর্তারা দুই দিন ধরে প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে কারাগারের ভেতরে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। পুলিশ বলছে, মামলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাই এবং তদন্তের স্বার্থে এই জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। তবে ডোপ টেস্টের ফলাফল নেগেটিভ আসার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা ও প্রশ্ন দেখা দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্কও তৈরি হয়েছে।
সোমবার বিকেলে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের সদস্যদের হত্যা মামলায় অভিযুক্ত মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের নমুনা পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এসেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আসামিদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাধ্যমে তাদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এর আগে আসামিরা আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে ইয়াবা সেবনের কথা উল্লেখ করেছিলেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন। পরে বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য তাদের ডোপ টেস্ট করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে পরীক্ষার ফলাফলে কোনো মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানান।
ডোপ টেস্টের নেগেটিভ ফলাফলকে কেন্দ্র করে তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও পুলিশ বলছে, পরীক্ষার সময় ও নমুনা সংগ্রহের ব্যবধান বিষয়টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তীর ভাষ্য, গ্রেপ্তারের দিন আসামিদের ডোপ টেস্ট করা হয়নি। ঘটনার বেশ কয়েক দিন পর তাদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এতদিন পর পরীক্ষায় মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে।
এ বিষয়ে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতামতও সামনে এসেছে। রংপুর মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মারুফ হোসেন বলেন, মাদক গ্রহণের পর শরীরে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এর উপস্থিতি পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। সাধারণত অল্প সময়ের মধ্যে প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হলে ফলাফলে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কিন্তু কয়েক দিন পর নমুনা সংগ্রহ করা হলে ফলাফল নেগেটিভ আসতে পারে।
তার মতে, পরীক্ষার ফলাফল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কখন মাদক গ্রহণ করা হয়েছিল এবং কখন নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, সেই সময়ের ব্যবধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শুধু একটি নেগেটিভ ফলাফলের ভিত্তিতে ঘটনার অন্যান্য তথ্য বা তদন্তের উপাদান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
এর আগে গত ৩০ আগস্ট রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ ও চিকিৎসকদের একটি দল কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের নমুনা সংগ্রহ করে। পরে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হলে তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
এদিকে, মামলার তদন্তকে ঘিরে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগও তুলেছে পুলিশ। উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তের অগ্রগতি হওয়ার পরও একটি পক্ষ বিষয়টিকে ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ডোপ টেস্টের ফলাফল নেগেটিভ আসার পর পুলিশের আগের বক্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে প্রশাসনকে হেয় করার চেষ্টা চলছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মামলাটি নিয়ে নানা ধরনের বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। পুলিশের দাবি, এসব বক্তব্যের কিছু অংশ যাচাই না করেই প্রচার করা হচ্ছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
তবে একটি আলোচিত হত্যা মামলার তদন্ত নিয়ে জনসাধারণের প্রশ্ন ও আলোচনা থাকাটাও স্বাভাবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে একাধিক মানুষের মৃত্যুর মতো গুরুতর ঘটনায় তদন্তের প্রতিটি ধাপ নিয়ে মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়। এ কারণে তদন্তের স্বচ্ছতা, তথ্য যাচাই এবং আদালতের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের অংশ হিসেবে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হয়েছে। জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের সময় আসামিদের কাছ থেকে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না, সেটিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আদালতের অনুমতি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
এ ঘটনায় রংপুরের রাজনৈতিক অঙ্গনেও নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। রংপুর মহানগর যুবদলের সহ-সভাপতি জহির আলম নয়ন দাবি করেছেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তার বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করার পর মামলার তদন্তে অগ্রগতি আসে।
তিনি আরও কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির অভিযোগ তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন এবং তদন্তের মাধ্যমে সঠিক তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব মাহফুজ উন নবী ডনও ডোপ টেস্টের ফলাফল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর আলোচনা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, তদন্তে কোনো তথ্য গোপন থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে বেরিয়ে আসবে।
গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ড রংপুরে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এমন একটি ঘটনায় দ্রুত বিচার এবং প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করার দাবি সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে। নিহতদের পরিবারের জন্য এই ঘটনা শুধু একটি মামলার বিষয় নয়; এটি তাদের জীবনে অপূরণীয় ক্ষতি ও গভীর শোকের স্মৃতি হয়ে আছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তদন্তকে তথ্য, প্রমাণ এবং আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়া। কোনো ধরনের গুজব, রাজনৈতিক চাপ বা সামাজিক উত্তেজনা যেন তদন্তের গতিপথকে প্রভাবিত করতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
ডোপ টেস্টের নেগেটিভ ফলাফল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ, জব্দ করা আলামত পরীক্ষা এবং অন্যান্য তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে মামলার তদন্ত এগিয়ে যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্ত শেষে সংগৃহীত প্রমাণের ভিত্তিতেই আদালতে মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া নির্ধারিত হবে।
রংপুরের এই আলোচিত চার খুন মামলায় আদালতের অনুমতিতে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের সিদ্ধান্ত তাই তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মামলার প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং নিহতদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তদন্তের প্রতিটি পর্যায় নিরপেক্ষ ও প্রমাণনির্ভর হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
এখন সবার নজর থাকবে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না এবং তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতি কোন দিকে যায়, সেদিকে। একটি আলোচিত ও সংবেদনশীল হত্যা মামলার সত্য উদঘাটনে শেষ পর্যন্ত প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।