প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ ২১ বছরের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর লিওনেল মেসি জাতীয় দল থেকে বিদায় নেওয়ায় আর্জেন্টিনা ফুটবলে শুরু হয়েছে এক নতুন অধ্যায়। যে দলটি দীর্ঘদিন ধরে মাঠে নামলেই মেসিকে ঘিরে পরিকল্পনা সাজিয়েছে, সেই দলকেই এখন এগিয়ে নিতে হবে তার অনুপস্থিতিতে। ফলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সামনে যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি নতুন প্রজন্মের নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের বিশাল সুযোগও তৈরি হয়েছে।
মেসির বিদায় নিঃসন্দেহে আর্জেন্টিনা ফুটবলের জন্য একটি যুগের অবসান। জাতীয় দলের হয়ে তিনি বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও ফাইনালিসিমার মতো বড় শিরোপা জিতেছেন। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্যও পেয়েছেন তিনি। সেই দলের অধিনায়ক ও সবচেয়ে বড় তারকা হিসেবে মেসির ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।
তবে মেসিকে ছাড়া পথচলার প্রস্তুতি আর্জেন্টিনা অনেক আগেই শুরু করেছিল। কোচ লিওনেল স্কালোনি ২০২২ সালের বিশ্বকাপের পর থেকেই ধীরে ধীরে এমন একটি দল গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন, যেখানে একজন খেলোয়াড়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকবে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেসি চোট কিংবা বিশ্রামের কারণে মাঠের বাইরে থাকলেও আর্জেন্টিনা বেশ কয়েকবার নিজেদের কার্যকর বিকল্প পরিকল্পনার প্রমাণ দিয়েছে।
এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা। পুরো টুর্নামেন্টে চোটের কারণে মেসি নিজের সেরা ছন্দে খেলতে পারেননি। ফাইনালেও দ্বিতীয়ার্ধে চোটের কারণে মাঠ ছাড়তে হয় তাঁকে। কিন্তু অধিনায়কের অনুপস্থিতিতেও আর্জেন্টিনা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে শেষ পর্যন্ত লাউতারো মার্তিনেজের গোলে শিরোপা নিশ্চিত করে।
এর আগে ব্রাজিলের বিপক্ষে বড় ব্যবধানের জয়ের ঘটনাও দেখিয়েছে, মেসি না থাকলেও আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার মতো দলীয় শক্তি অর্জন করেছে। এসব সাফল্য স্কালোনির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এগুলো দলের খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং মেসিবিহীন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাস তৈরি করেছে।
তবে মেসির শূন্যতা পূরণ করা আর মেসিকে ছাড়া ভালো দল হিসেবে খেলা—দুটি এক বিষয় নয়। আর্জেন্টিনার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে, মেসির সৃষ্টিশীলতা, নেতৃত্ব ও ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার ক্ষমতার বিকল্প কে হবেন। একজন খেলোয়াড় দিয়ে এই শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব নয়। বরং স্কালোনিকে পুরো দলকে নতুনভাবে সাজিয়ে দায়িত্ব ভাগ করে দিতে হবে।
এই জায়গাতেই সামনে আসতে পারেন লাউতারো মার্তিনেজ ও হুলিয়ান আলভারেজ। দুজনের খেলায় ভিন্ন বৈশিষ্ট্য থাকলেও গোল করার ক্ষমতা এবং আক্রমণভাগে চাপ তৈরি করার সামর্থ্য তাদের আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে লাউতারো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল করে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন।
মাঝমাঠেও আর্জেন্টিনার হাতে রয়েছে যথেষ্ট প্রতিভা। এনজো ফের্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও অন্যান্য তরুণ-মাঝবয়সী খেলোয়াড়দের ওপর দলের সৃজনশীলতা ও নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ নির্ভর করতে পারে। মেসি যেভাবে মাঝমাঠ ও আক্রমণের মধ্যে সংযোগ তৈরি করতেন, ভবিষ্যতে সেই দায়িত্ব একাধিক খেলোয়াড়ের মধ্যে ভাগ হয়ে যেতে পারে।
রক্ষণভাগেও রয়েছে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মিশ্রণ। ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজের মতো ডিফেন্ডাররা দলের রক্ষণকে নেতৃত্ব দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। ফলে মেসির বিদায়ের পরও আর্জেন্টিনার দলীয় কাঠামো যে একেবারে ভেঙে পড়বে, এমন আশঙ্কার কারণ নেই।
তবে পরিবর্তনের তালিকায় মেসির পাশাপাশি আরও কয়েকজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের ভবিষ্যৎ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিকোলাস ওতামেন্দি বিশ্বকাপের পর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তের বিষয়টি সামনে এনেছেন। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। যদিও ক্লাব ফুটবলে নতুন উদ্যমে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন তিনি, জাতীয় দলে তাঁর অভিজ্ঞতা এখনো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
মাঝমাঠে রদ্রিগো দে পল ও লিয়ান্দ্রো পারেদেসের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের নিয়েও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে টিম ম্যানেজমেন্টকে। বিশ্বকাপজয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হলেও বয়স, ফর্ম এবং নতুন প্রজন্মের উত্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের ভূমিকা কী হবে, সেটি সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে।
স্কালোনির সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তাঁর হাতে থাকা তরুণ প্রতিভার বিশাল ভাণ্ডার। জাতীয় দলের নতুন প্রজন্ম ইতোমধ্যেই নজর কাড়ছে। নিকো পাস, হুলিয়ানো সিমিওনে, কোলো বারকো, লেও বালের্দি, মাক্সিমো পেরোনে, আগুস্তিন গিয়াই, সান্তিয়াগো বেলত্রান, তোমাস আরান্দা, মাতিয়াস সোউলে, ভালেন্তিন কারবোনি, আলেহান্দ্রো গার্নাচো এবং ফ্রাংকো মাস্তান্তুয়োনোর মতো তরুণদের ঘিরে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা তৈরি হতে পারে।
এদের মধ্যে গার্নাচো ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে পরিচিত নাম। তাঁর গতি, একের পর এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতা এবং আক্রমণাত্মক মানসিকতা আর্জেন্টিনাকে মেসি-পরবর্তী যুগে নতুন মাত্রা দিতে পারে। অন্যদিকে মাস্তান্তুয়োনোর মতো উদীয়মান প্রতিভারা ভবিষ্যতের আক্রমণভাগকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলতে পারেন।
তবে তরুণ প্রতিভা থাকলেই যে তারা রাতারাতি মেসির জায়গা পূরণ করবেন, এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ধারাবাহিকতা, বড় ম্যাচের চাপ সামলানো এবং দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারফর্ম করার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে সময় লাগে। তাই স্কালোনির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে অভিজ্ঞদের সঙ্গে তরুণদের সঠিক ভারসাম্য তৈরি করা।
মেসির বিদায়ের পর আর্জেন্টিনার খেলার ধরনও কিছুটা বদলে যেতে পারে। এতদিন আক্রমণের বড় অংশ মেসিকে কেন্দ্র করে তৈরি হলেও এখন দলকে আরও বেশি সমষ্টিনির্ভর ফুটবল খেলতে হতে পারে। একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত দক্ষতার ওপর নির্ভর না করে বল দখল, দ্রুত পাস, প্রেসিং এবং একাধিক খেলোয়াড়ের আক্রমণাত্মক অংশগ্রহণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিবর্তন স্কালোনির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হলেও তাঁর হাতে সেই পরিবর্তন বাস্তবায়নের যথেষ্ট উপকরণ রয়েছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলের অনেক সদস্য এখনো জাতীয় দলের সঙ্গে রয়েছেন। তাদের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের ক্ষুধা যোগ হলে আর্জেন্টিনা আবারও শক্তিশালী দল হয়ে উঠতে পারে।
মেসির অনুপস্থিতি অবশ্যই আর্জেন্টিনার জন্য আবেগেরও বিষয়। বছরের পর বছর জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁকে দেখে অভ্যস্ত সমর্থকদের কাছে নতুন আর্জেন্টিনাকে মানিয়ে নিতে সময় লাগবে। মাঠে মেসির বাঁ-পায়ের জাদু, হঠাৎ পাস, ড্রিবলিং কিংবা ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়া মুহূর্তগুলো আর দেখা যাবে না। কিন্তু ফুটবলের নিয়মই হলো—একটি যুগ শেষ হলে আরেকটি যুগের সূচনা হয়।
আর্জেন্টিনার সামনে তাই এখন মেসিকে খুঁজে বেড়ানোর চেয়ে নিজেদের নতুন পরিচয় তৈরি করাই বড় লক্ষ্য। স্কালোনির হাতে থাকা অভিজ্ঞ ও তরুণ খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে দলটি যদি নতুন কৌশলকে দ্রুত আয়ত্ত করতে পারে, তাহলে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব।
মেসি আর্জেন্টিনাকে যে উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন, সেটি ধরে রাখা সহজ হবে না। কিন্তু তাঁর উত্তরাধিকারও শুধু শিরোপার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এমন একটি দলের অংশ ছিলেন, যারা কঠিন সময় পেরিয়ে আবার বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে ফিরেছে। সেই মানসিকতা যদি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ধরে রাখতে পারে, তাহলে মেসিবিহীন আর্জেন্টিনার গল্পও হতে পারে নতুন কোনো সাফল্যের গল্প।
মহাতারকার বিদায়ে তাই আর্জেন্টিনার পথ থেমে যাচ্ছে না; বরং শুরু হচ্ছে পরীক্ষার নতুন অধ্যায়। এখন দেখার বিষয়, স্কালোনির নতুন দল কত দ্রুত নিজেদের ছন্দ খুঁজে পায় এবং মেসির দীর্ঘ ছায়া পেরিয়ে নিজেদের নামে নতুন ইতিহাস লিখতে পারে কি না।