সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে বিদেশি অংশীদার খুঁজছে সরকার

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার

প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সংকটে পড়া পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংক একীভূত করে গঠিত রাষ্ট্রমালিকানাধীন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য কৌশলগত অংশীদার খুঁজছে সরকার। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন মুসলিম দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইতিমধ্যে কাতারকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে বিনিয়োগের মাধ্যমে কৌশলগত অংশীদার হওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর কাতার সফরের সময় দেশটির সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে এ প্রস্তাব দেন।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিতুমীর বলেন, কাতারকে কৌশলগত অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে আলোচনা হলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কাতারের সঙ্গে আরও আলোচনা হবে এবং অন্যান্য মুসলিম দেশ ও সংস্থাকেও বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে মূল লক্ষ্য হলো ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তিতুমীর জানান, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে আগে নেওয়া ‘হেয়ারকাট’ সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে এবং আমানতকারীদের পাওনা অর্থ ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধে সরকারের সামনে দুটি পথ রয়েছে। প্রথমত, সরকারি কোষাগার থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করা। দ্বিতীয়ত, কোনো বিদেশি রাষ্ট্র বা সংস্থাকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ব্যাংকের মালিকানায় যুক্ত করা। এ কারণেই মুসলিম দেশ ও সংস্থাগুলোকে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতে কৌশলগত অংশীদার সাধারণ বিনিয়োগকারীর তুলনায় ভিন্ন ভূমিকা পালন করে। তারা সাধারণত ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, ব্যবসার পরিধি সম্প্রসারণ এবং ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি তহবিল বা ইক্যুইটি বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকের মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করার সুযোগ থাকে।

এদিকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াতেও নতুন নিয়ম কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং রেগুলেশন ডিপার্টমেন্টের সাম্প্রতিক এক সার্কুলারে বলা হয়েছে, ব্যাংকটির গ্রাহকেরা তাদের ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্ট বা এফডিআরে থাকা পুরো অর্থ একবারে তুলতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে তারা কোনো মুনাফা পাবেন না।

অন্যদিকে এফডিআর হিসাবধারীরা যদি মুনাফা পেতে চান, তাহলে তাদের ব্যাংক রেজল্যুশন স্কিমের আওতায় থাকতে হবে। তবে কারেন্ট ও সেভিংস হিসাবের গ্রাহকেরা মুনাফাসহ একবারে তাদের মূল অর্থ তুলতে পারবেন।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি হিসাবের গ্রাহকদের মূল আমানত ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম আগামী ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে গ্রাহকেরা তাদের হিসাবে থাকা সম্পূর্ণ মূল অর্থ এককালীন উত্তোলন বা নগদায়ন করতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে মুনাফা প্রযোজ্য হবে না। এ জন্য ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাংকের শাখাগুলোতে আবেদন নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর থেকেই ব্যক্তি হিসাবের স্বাভাবিক লেনদেন পুনরায় চালু হওয়ার কথা। তবে শাখা ও উপশাখাগুলোতে নগদ অর্থের চাহিদা পাঠানো, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ নগদ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন প্রস্তুতির জন্য কয়েক দিন সময় প্রয়োজন হচ্ছে। এ কারণে ৭ সেপ্টেম্বর থেকে আমানত ফেরত কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক সংকটের পেছনে রয়েছে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের দীর্ঘদিনের দুর্বল আর্থিক অবস্থা। এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক এবং আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণাধীন এক্সিম ব্যাংক গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ার পর ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। নবগঠিত ব্যাংকটির মালিকানা পুরোপুরি সরকারের হাতে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর মোট ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের সঞ্চয়ী হিসাবে রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।

অন্যদিকে পাঁচ ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৮৬ শতাংশই খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত মূলধন ঘাটতিও ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি।

সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক হিসেবে গত বছরের নভেম্বরে যাত্রা শুরু করা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার হিসেবে দেওয়ার কথা রয়েছে।

এ অবস্থায় বিদেশি কৌশলগত অংশীদার আনার উদ্যোগ ব্যাংকটির আর্থিক পুনর্গঠন, মূলধন ঘাটতি মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে কাতারসহ সম্ভাব্য অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনার ফলাফল এবং বিনিয়োগ কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত