প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সেপ্টেম্বরজুড়ে দেশের আবহাওয়ায় দেখা দিতে পারে নানা ধরনের পরিবর্তন। স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাত কম হওয়ার পূর্বাভাস থাকলেও বঙ্গোপসাগরে এক থেকে তিনটি মৌসুমি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এর মধ্যে একটি লঘুচাপ নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। পাশাপাশি ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে দেশের দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বেশি থাকতে পারে। ফলে মাসের বিভিন্ন সময়ে দুই থেকে তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সময়ে বজ্রঝড়, ভারি বৃষ্টি এবং স্থানীয়ভাবে আকস্মিক জলাবদ্ধতার পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
সেপ্টেম্বরের আবহাওয়া পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস প্রদানসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ কমিটির নিয়মিত সভায় এসব তথ্য উঠে আসে। বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, মৌসুমি বৃষ্টিপাতের সামগ্রিক পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে দেশের সব এলাকায় বৃষ্টিপাত কম হবে। বরং স্বল্প সময়ের মধ্যে কোনো কোনো অঞ্চলে ভারি বৃষ্টি হতে পারে, যা নদী-নালা ও নিম্নাঞ্চলে পানি বাড়িয়ে স্থানীয়ভাবে বন্যার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক ও মৌসুমি বৃষ্টিনির্ভর দেশে সেপ্টেম্বর মাসের আবহাওয়া কৃষি, জনজীবন এবং নদী ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষা মৌসুমের শেষভাগে এসে অনেক এলাকায় নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করলেও উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং স্থানীয় ভারি বৃষ্টিপাত পরিস্থিতিকে দ্রুত পরিবর্তন করে দিতে পারে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষ এ ধরনের আকস্মিক পরিস্থিতির সঙ্গে প্রায়ই পরিচিত।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে সেপ্টেম্বর মাসে এক থেকে তিনটি মৌসুমি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে অন্তত একটি নিম্নচাপে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ বাংলাদেশের আবহাওয়ার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মেঘলা আকাশ, দমকা হাওয়া এবং ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে।
আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, চলতি মাসে দুই থেকে তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। মৃদু তাপপ্রবাহের সময় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। আর মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহে তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
বর্ষার শেষভাগে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার এমন পরিস্থিতি জনজীবনে অস্বস্তি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে কর্মজীবী মানুষ, পথচারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য গরমের প্রভাব বেশি অনুভূত হতে পারে। অন্যদিকে কৃষি খাতেও আবহাওয়ার এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। কোথাও অতিরিক্ত বৃষ্টি, আবার কোথাও দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হওয়া—দুই ধরনের পরিস্থিতিই ফসলের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
সেপ্টেম্বর মাসে তিন থেকে পাঁচ দিন বজ্রঝড় হতে পারে বলেও পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। বজ্রঝড়ের সময় খোলা জায়গায় অবস্থানকারী মানুষ, কৃষিজমিতে কর্মরত কৃষক এবং নৌপথে চলাচলকারীদের সতর্ক থাকার প্রয়োজন হতে পারে। আবহাওয়া পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হলে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
নদ-নদীর পরিস্থিতি নিয়ে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে দেশের প্রধান নদ-নদীগুলোতে সামগ্রিকভাবে স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকতে পারে। তবে স্থানীয় ও আঞ্চলিক ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে কিছু নদীতে পানি দ্রুত বাড়তে পারে। উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকায় এ কারণে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বল্পমেয়াদি বন্যা দীর্ঘস্থায়ী না হলেও স্থানীয় মানুষের জীবন ও জীবিকায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। হঠাৎ পানি বেড়ে গেলে কৃষিজমি প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি গ্রামীণ সড়ক, বসতবাড়ি ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে নিচু এলাকায় থাকা মানুষদের জন্য কয়েক দিনের জলাবদ্ধতাও বড় ধরনের দুর্ভোগ সৃষ্টি করে।
কৃষকদের জন্য সেপ্টেম্বরের আবহাওয়া বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ সময় আমন ধানের ক্ষেত রয়েছে। অতিবৃষ্টি হলে ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, আবার দীর্ঘ সময় পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে সেচের প্রয়োজন বাড়তে পারে। ফলে কৃষকদের স্থানীয় আবহাওয়ার পূর্বাভাসের দিকে নজর রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের আবহাওয়া পরিস্থিতিতে হঠাৎ পরিবর্তনের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কখনো অল্প সময়ের মধ্যে প্রবল বৃষ্টি, কখনো দীর্ঘ তাপপ্রবাহ, আবার কখনো পাহাড়ি ঢল ও উজানের পানিতে আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। এ ধরনের পরিবর্তন মোকাবিলায় আগাম পূর্বাভাস এবং দ্রুত সতর্কবার্তা মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে দৈনিক গড় বাষ্পীভবনের পরিমাণ ২ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৫ মিলিমিটারের মধ্যে থাকতে পারে। একই সময়ে গড় উজ্জ্বল সূর্যকিরণকাল ৪ দশমিক ৫ থেকে ৬ দশমিক ৫ ঘণ্টা হতে পারে। এসব তথ্য কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাসজুড়ে স্বাভাবিকের তুলনায় মোট বৃষ্টিপাত কম হলেও বিচ্ছিন্নভাবে ভারি বৃষ্টির সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ অল্প সময়ের প্রবল বৃষ্টিপাত শহরে জলাবদ্ধতা এবং গ্রামাঞ্চলে আকস্মিক প্লাবনের কারণ হতে পারে। পাহাড়ি এলাকায় অতিবৃষ্টি ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
সেপ্টেম্বরের আবহাওয়া নিয়ে তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী, হাওরাঞ্চল, পাহাড়ি ও নিম্নাঞ্চলের মানুষদের স্থানীয় আবহাওয়া পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। সম্ভাব্য ভারি বৃষ্টি ও বন্যার পরিস্থিতিতে প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ করলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশের আবহাওয়া হতে পারে বৈচিত্র্যময়। একদিকে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরে একাধিক লঘুচাপ সৃষ্টি এবং স্থানীয়ভাবে ভারি বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। তাপপ্রবাহ, বজ্রঝড় ও স্বল্পমেয়াদি বন্যার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে বর্ষার শেষভাগের এই মাসে আবহাওয়ার প্রতিটি পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা এবং আগাম প্রস্তুতি নেওয়াই হতে পারে মানুষের জন্য সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা।