ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ডাকাতির আতঙ্ক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ডাকাতির আতঙ্ক

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুমিল্লার ওপর দিয়ে যাওয়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দীর্ঘ অংশে রাতের যাত্রা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দূরপাল্লার বাসের যাত্রী থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস ও হালকা যানবাহনের চালকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মহাসড়কের কয়েকটি নির্জন এলাকায় রাতে সংঘবদ্ধভাবে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে রাত গভীর হওয়ার পর ঝুঁকি বেড়ে যায় বলে দাবি তাঁদের।

মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে দাউদকান্দি, ইলিয়টগঞ্জ, গোমতা, চান্দিনা, মাধাইয়া, নিমসার, ময়নামতি ও পদুয়ার বাজারসহ কয়েকটি এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। গত কয়েক মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ডাকাতি, ছিনতাই ও চুরি মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে মহাসড়কের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন পরিবহনসংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সংঘবদ্ধ অপরাধীরা কখনো মহাসড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে যানবাহনের গতি কমানোর চেষ্টা করে। কখনো চলন্ত বা ধীরগতির গাড়িকে অনুসরণ করে নির্জন এলাকায় নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। যাত্রীদের মধ্যে বিশেষ করে রাতের বেলায় ব্যক্তিগত গাড়ি ও মাইক্রোবাসে চলাচলকারীদের ঝুঁকি নিয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিদেশফেরত যাত্রীদের বহনকারী গাড়িও অপরাধীদের নজরে পড়তে পারে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা।

তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে পুলিশের বক্তব্যেরও পার্থক্য রয়েছে। সম্প্রতি ইলিয়টগঞ্জ এলাকায় ডাকাতি ও ছিনতাই বন্ধের দাবিতে হালকা যানবাহনের মালিক ও চালকেরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, রাতে রডসহ বিভিন্ন বস্তু ব্যবহার করে গাড়ির কাচ ভেঙে ডাকাতি ও ছিনতাই করা হচ্ছে। কর্মসূচিতে কয়েক শ চালক ও মালিক অংশ নেন এবং একপর্যায়ে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার যানজট তৈরি হয়। পরে পুলিশের আশ্বাসে তাঁরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন।

চালকদের অভিযোগের বিষয়ে ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানার কর্মকর্তারা অবশ্য ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিয়মিত ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ঘটনা কুমিল্লার বাইরে অন্য অংশে ঘটছে; কুমিল্লা অংশে একই ধরনের ঘটনার অস্তিত্ব পুলিশ সরাসরি নিশ্চিত করেনি। তবে চালকদের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।

নিরাপত্তা নিয়ে এই মতপার্থক্যই পরিস্থিতির জটিলতা তুলে ধরে। যাত্রী ও চালকদের একটি অংশ নিজেদের অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয়দের বক্তব্যের ভিত্তিতে ঝুঁকির কথা বলছেন। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, মহাসড়ক নিরাপদ রাখতে নিয়মিত টহল ও অভিযান চালানো হচ্ছে। ফলে প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণে অভিযোগের পাশাপাশি মামলা, জিডি, গ্রেপ্তার এবং তদন্তের তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

জুলাই মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত প্রায় ১০৩ কিলোমিটার মহাসড়কে সংঘবদ্ধ ডাকাতচক্রের তৎপরতার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে রড, পাথরসহ বিভিন্ন উপায়ে যানবাহনের গতিরোধ করে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগের কথা বলা হয়। প্রতিবেদনে মহাসড়কের একাধিক পয়েন্টকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল এবং পুলিশের পক্ষ থেকে টহল জোরদার ও অভিযানের কথা জানানো হয়েছিল।

এর পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। জুলাইয়ে দাউদকান্দি মডেল থানা পুলিশ পৃথক অভিযানে ডাকাতি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন মামলায় ছয়জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে এবং তাঁদের আন্তজেলা অপরাধচক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

এ ধরনের গ্রেপ্তার অভিযান অবশ্যই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শুধু অভিযান চালানো যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন পরিবহনসংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতি, নিয়মিত টহল, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মহাসড়কের পাশে থাকা অন্ধকার ও নির্জন স্থানগুলো চিহ্নিত করে সেখানে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর দাবি রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাসড়কের নিরাপত্তা একটি সমন্বিত বিষয়। একটি নির্দিষ্ট এলাকায় পুলিশ টহল থাকলেও পাশের সংযোগ সড়ক বা বাজার এলাকার দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা অপরাধীদের সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে। তাই মহাসড়ক, সংযোগ সড়ক, বাজার, বাসস্ট্যান্ড এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়—সবগুলোকে সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আনা প্রয়োজন।

রাতের যাত্রায় চালকদের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘপথের গাড়ি নির্ধারিত স্থানে থামানো, অপরিচিত বা নির্জন এলাকায় অপ্রয়োজনে অবস্থান না করা এবং সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে যাত্রীদেরও সতর্ক থাকতে হবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগের ব্যবস্থা হাতের কাছে রাখতে হবে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের অন্যতম ব্যস্ত যোগাযোগপথ। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী, পণ্যবাহী যান, ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহন এই মহাসড়ক ব্যবহার করে। রাজধানীর সঙ্গে চট্টগ্রামসহ দেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের জন্য এ সড়কের গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে মহাসড়কের কোনো অংশে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু স্থানীয় মানুষের ওপর পড়ে না; দেশের বাণিজ্য ও আন্তজেলা যোগাযোগেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

মহাসড়কের নিরাপত্তার সঙ্গে যানজটের বিষয়টিও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লা অংশে দীর্ঘ যানজটের ঘটনাও ঘটেছে। আগস্টের শেষ দিকে দাউদকান্দির কাছে তীব্র যানজটে একটি অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘ সময় আটকে থাকার পর এক রোগীর মৃত্যু নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। ওই সময় প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজটের খবর পাওয়া যায়।

এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ও যান চলাচল—দুই বিষয়কেই একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। যানজটের কারণে কোনো এলাকায় দীর্ঘ সময় গাড়ি আটকে থাকলে অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি হতে পারে। আবার ডাকাতির আশঙ্কায় চালকেরা হঠাৎ গতি পরিবর্তন বা অনিরাপদভাবে গাড়ি চালালে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

পরিবহনসংশ্লিষ্টদের মতে, মহাসড়কে নিরাপত্তা বাড়াতে নিয়মিত রাত্রীকালীন টহলকে আরও কার্যকর করা দরকার। শুধু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশ অবস্থান করলেই হবে না; টহল গাড়িকে নিয়মিতভাবে পুরো ঝুঁকিপূর্ণ অংশে চলাচল করতে হবে। পাশাপাশি মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ক্যামেরা স্থাপন এবং বিদ্যমান প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে অপরাধীদের শনাক্ত ও দ্রুত আইনের আওতায় আনা সহজ হতে পারে।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। মহাসড়কের পাশে বসবাসকারী মানুষ, পরিবহন শ্রমিক, দোকানদার এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সন্দেহজনক গতিবিধি সম্পর্কে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানালে অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে ভাড়া বাসা বা নির্দিষ্ট এলাকায় অপরাধীদের অবস্থান নিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, মহাসড়কে চলাচলকারী মানুষের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি ফিরিয়ে আনা জরুরি। একজন চালক যখন রাতের যাত্রায় নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কিত থাকেন কিংবা একজন যাত্রী পরিবারকে নিয়ে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন কি না তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, তখন সেটি শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন থাকে না; এটি জননিরাপত্তা ও নাগরিক আস্থার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

কুমিল্লার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ডাকাতি ও ছিনতাই নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, প্রকৃত ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান এখন জরুরি। একই সঙ্গে পুলিশের বক্তব্য ও স্থানীয়দের অভিযোগের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা দূর করতে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করাও প্রয়োজন। এতে একদিকে অযথা আতঙ্ক কমবে, অন্যদিকে প্রকৃত ঝুঁকির জায়গাগুলোতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

মহাসড়কটি দেশের অর্থনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাতের অন্ধকারে কোনো যাত্রী বা চালক যেন আতঙ্ক নিয়ে যাত্রা করতে বাধ্য না হন, সে নিশ্চয়তা তৈরি করাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অন্যতম বড় দায়িত্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত