সার সংকটের মধ্যেই মিয়ানমারে পাচার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৬ বার
সার সংকটের মধ্যেই মিয়ানমারে পাচার

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সার নিয়ে কৃষকদের ভোগান্তি, কোথাও কোথাও বাড়তি দামে বিক্রি এবং কৃত্রিম সংকটের অভিযোগের মধ্যেই মিয়ানমারে ইউরিয়া ও টিএসপি সার পাচারের তথ্য সামনে এসেছে। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে শুরু করে উপকূলীয় বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্র সার পাচার করছে বলে সাম্প্রতিক একাধিক অভিযানে তথ্য পাওয়া গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে একের পর এক চালান জব্দ হলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এই তৎপরতা।

রোপা আমন মৌসুম সামনে রেখে দেশের কৃষকের কাছে যখন পর্যাপ্ত সার পাওয়াই বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে, তখন দেশের ভর্তুকি মূল্যের সার পাচারের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক কৃষককে সার কিনতে দোকানে দোকানে ঘুরতে হচ্ছে। কোথাও দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কিছু এলাকায় সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।

কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও যদি সরবরাহব্যবস্থায় অনিয়ম, মজুতদারি কিংবা পাচারের মতো ঘটনা ঘটে, তাহলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে। বিশেষ করে আমন মৌসুমের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন পরিস্থিতি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি ফসল উৎপাদনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও ভোলার বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত অভিযানে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া বিপুল পরিমাণ সার জব্দ করা হয়েছে। সর্বশেষ ভোলার তজুমদ্দিনের মেঘনা নদীতে অভিযান চালিয়ে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে বহন করা প্রায় ৮ হাজার কেজি ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্টগার্ড। এর আগে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে প্রায় ১৪ লাখ টাকা মূল্যের ৪১০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়। পরদিন চট্টগ্রামের হালিশহরের দবিরখাল এলাকায় একটি ট্রাক থেকে ফিশিং বোটে নেওয়ার সময় আরও ২২০ বস্তা বা ১১ হাজার কেজি সার জব্দের ঘটনা ঘটে।

এরপর কক্সবাজারের রামু এলাকায় প্রায় ৩০ টন বা এক ট্রাক সার আটকের তথ্যও পাওয়া গেছে। এর আগে উখিয়া এলাকায় মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া ১০০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করেছিল সীমান্তরক্ষী বাহিনী। সব মিলিয়ে কয়েক মাসে একাধিক চালানে বিপুল পরিমাণ সার জব্দ হওয়ার ঘটনা পাচারের পরিধি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা সার ছোট-বড় নৌযানে তুলে উপকূলীয় পথ ব্যবহার করে মিয়ানমারের দিকে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। স্থলপথের পাশাপাশি নদী ও সমুদ্রপথ ব্যবহার করায় এই চক্রকে শনাক্ত করা এবং পুরো নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী উখিয়া ও টেকনাফ ছাড়াও চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকা এবং ভোলার মেঘনা নদীকে পাচারের সম্ভাব্য রুট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সীমান্তের কাছাকাছি এলাকা থেকে সরাসরি পাচারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সার সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট পরিবহন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

সারের দামের বড় পার্থক্য পাচারের অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশে সরকার নির্ধারিত মূল্যে ইউরিয়া সার প্রতি বস্তা প্রায় ১ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রির কথা থাকলেও মিয়ানমারের বাজারে একই পরিমাণ সার বাংলাদেশি মুদ্রায় কয়েক হাজার টাকা বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানা গেছে। ফলে সরকারি মূল্যে সার সংগ্রহ করতে পারলে পাচারকারীদের জন্য বড় অঙ্কের মুনাফার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আবার সরকারি দামে সার না পেলে বেশি দামে কিনেও পাচার করে লাভ করার চেষ্টা করছে একটি চক্র।

এই মূল্য ব্যবধানের সুযোগ নিয়েই ডিলার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি অংশ পাচারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত ও প্রমাণের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানেও এখন পর্যন্ত মূল হোতাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।

অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে সার সরবরাহ নিয়ে কৃষকদের অভিযোগও কমছে না। বিভিন্ন জেলার কৃষকেরা প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। কোথাও ডিলারের দোকানে পর্যাপ্ত সার না থাকার কথা বলা হচ্ছে, আবার কোথাও গোপনে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ উঠছে। কিছু এলাকায় কৃষকদের দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে আমন চাষের প্রস্তুতি নিয়ে তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

রাজশাহীর পবা, সাতক্ষীরা, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, জামালপুর ও সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় সার বিক্রির ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। কোনো কোনো জায়গায় সরকারি দামের তুলনায় বস্তাপ্রতি কয়েক শ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আবার কিছু এলাকায় কৃষকেরা বাজার থেকে অনেক বেশি দামে টিএসপি সংগ্রহ করতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

টাঙ্গাইলের মধুপুরে কালোবাজারে সার পাচারের সময় বিপুলসংখ্যক বস্তাসহ একজন ট্রাকচালক গ্রেপ্তারের ঘটনাও পরিস্থিতির গুরুত্ব বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডিলারদের বিরুদ্ধে গোপনে সার বিক্রি, ভাউচার না দেওয়া এবং নির্ধারিত ব্যক্তির বাইরে অন্যদের কাছে সার সরবরাহের অভিযোগও উঠেছে।

তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশের সার মজুত নিয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছে। কৃষি সচিব মো. সেলিম খান জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে সার মজুতের পরিস্থিতি সন্তোষজনক। সরকারের নজরদারির কারণে সার নিয়ে সৃষ্ট ষড়যন্ত্র সফল হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরবরাহব্যবস্থা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন ডিলার নিয়োগ এবং আমদানি করা সার দ্রুত বাজারে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে মোট মজুত রয়েছে ১২ লাখ টনের বেশি সার। এর মধ্যে ইউরিয়া প্রায় ৪ লাখ ২৭ হাজার টন, টিএসপি প্রায় ৩ লাখ ৫২ হাজার ৮০০ টন, ডিএপি প্রায় ৩ লাখ ৩২ হাজার ৪০০ টন এবং এমওপি প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার ২০০ টন। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপির মজুত বেশি রয়েছে বলেও মন্ত্রণালয়ের তথ্য থেকে জানা যায়।

চলতি সেপ্টেম্বর মাসের জন্যও বিভিন্ন ধরনের সারের বরাদ্দ রয়েছে। এর বাইরে আমদানির মাধ্যমে আরও বিপুল পরিমাণ সার সরবরাহের পথে রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে নতুন করে জাহাজ ভেড়ার তথ্যও জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। ফলে সামগ্রিক মজুতের দিক থেকে দেশে সার সংকট হওয়ার কথা নয় বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, সার মজুত পর্যাপ্ত থাকার পরও যদি কৃষকের হাতে সময়মতো সার না পৌঁছায়, তাহলে মজুতের পরিমাণ দিয়ে সংকটের বাস্তব চিত্র বোঝা যাবে না। মাঠপর্যায়ে সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, পরিবহন সমস্যা, ডিলার পর্যায়ে অনিয়ম এবং কালোবাজারি থাকলে কাগজে-কলমে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও কৃষককে বেশি দামে সার কিনতে হতে পারে।

তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু সার আমদানি ও মজুত বাড়ানোর পাশাপাশি ডিলার থেকে কৃষকের হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নজরদারি জোরদার করা জরুরি। বিশেষ করে সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকায় সার পরিবহনের ওপর নজরদারি বাড়ানো, সন্দেহজনক চালান যাচাই এবং পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

একই সঙ্গে প্রকৃত কৃষক যেন নির্ধারিত মূল্যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার পান, সেটি নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক। বাড়তি দামে সার কিনতে গিয়ে তাঁদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। অনেক কৃষক তখন প্রয়োজনের তুলনায় কম সার ব্যবহার করতে বাধ্য হন, যার প্রভাব পড়তে পারে ফলনেও।

দেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য আমন মৌসুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে সার সরবরাহে কোনো ধরনের দীর্ঘস্থায়ী অনিয়ম দেখা দিলে তার প্রভাব শুধু কৃষকের আয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না; খাদ্য উৎপাদন ও বাজারদরের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে সার পাচার এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে কৃত্রিম সংকট—দুই সমস্যাকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে।

সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকায় ধারাবাহিক অভিযানের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে ডিলার পর্যায়ের সরবরাহব্যবস্থা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা গেলে পাচারের সুযোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে সার বিতরণে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং প্রকৃত কৃষকের কাছে সরাসরি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে বাজারে অস্থিরতাও কমতে পারে।

বর্তমানে সরকারের দাবি, দেশে সার মজুত পর্যাপ্ত এবং আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। এখন সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন মাঠপর্যায়ে কতটা দেখা যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকের দোকানে দোকানে ঘোরার দিন শেষ করে সময়মতো ন্যায্য দামে সার পাওয়ার নিশ্চয়তা তৈরি করা এবং দেশের ভর্তুকির সার পাচার বন্ধ করা—দুটিই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য বড় পরীক্ষা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত