প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কুড়িগ্রামের সীমান্তবর্তী চরাঞ্চলে রাতের আঁধারে নদীপথে ভারতে পাট পাচারের অভিযোগ উঠেছে। দিনের আলোয় যেখানে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের স্বাভাবিক বেচাকেনা চলে, সেখানে রাত গভীর হলে বদলে যায় নদীপথের চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, ইঞ্জিনচালিত নৌযানে করে বিভিন্ন চরাঞ্চলে মজুত করা পাট সংগ্রহ করে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ধুবরি জেলার বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।
স্থানীয় কৃষক, ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ২টার পর নদীপথে পাচারকারীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র ও নীলকমল নদীর চরাঞ্চল থেকে পাট নৌযানে তুলে ভোর হওয়ার আগেই সীমান্তের ওপারে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ভালো দাম পাওয়ার আশায় জেলার কিছু কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীও পাচারকারীদের কাছে পাট বিক্রি করছেন। এতে একদিকে দেশের বৈধ বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
কুড়িগ্রামের জাহাজের আলগা, সাহেবের আলগা, নারায়ণপুর, পাখিউড়া, শৌলমারী, বেরুবাড়ী, নুনখাওয়া, কাপনা, পদ্মারচর, যাত্রাপুর, কচাকাটা ও মাদারগঞ্জসহ বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকে দিনের বেলায় কৃষকদের কাছ থেকে পাট সংগ্রহ করা হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পরে রাতের বেলায় এসব পাট নদীর বিভিন্ন ঘাট ও নির্দিষ্ট পয়েন্ট থেকে নৌযানে তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
স্থানীয়দের দাবি, জেলার নদীপথের অন্তত ২০ থেকে ২৫টি পয়েন্টে রাতের বেলায় নৌযানের চলাচল বেড়ে যায়। দিনের বেলায় সাধারণ নৌযানের মতো মনে হলেও গভীর রাতে এসব নৌকার একটি অংশে বিপুল পরিমাণ পাট পরিবহন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি পাচারের ঘটনা প্রত্যক্ষ করার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
স্থানীয় একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশ ও ভারতের বাজারে পাটের দামের পার্থক্যই পাচারের অন্যতম প্রধান কারণ। বর্তমানে দেশের বাজারে প্রতি মণ পাটের দাম প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত থাকলেও ভারতের সীমান্তবর্তী বাজারে একই পরিমাণ পাট ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে তাঁদের দাবি। ফলে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়েও ভারতের বাজারে বিক্রি করলে তুলনামূলক বেশি লাভ পাওয়া যাচ্ছে।
চরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য এই দামের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। নদীভাঙন, পরিবহন ব্যয়, শ্রমিকের মজুরি ও বাজারে পণ্য নেওয়ার খরচের কারণে অনেক কৃষকই উৎপাদিত পাটের ন্যায্য দাম নিয়ে চিন্তিত থাকেন। সীমান্তের ওপারে তুলনামূলক বেশি দাম পাওয়া গেলে কিছু কৃষক স্থানীয় ক্রেতাদের পরিবর্তে পাচারকারীদের কাছে পাট বিক্রি করতে আগ্রহী হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এক কৃষকের ভাষ্য, স্থানীয় হাটে পাট নিয়ে গেলে নৌকা ভাড়া, শ্রমিকের খরচসহ বিভিন্ন ব্যয় বাদ দেওয়ার পর প্রত্যাশিত লাভ থাকে না। অন্যদিকে সীমান্তের ওপারের ক্রেতারা সরাসরি কৃষকের বাড়ি বা এলাকায় এসে ভালো মানের পাট দেখে দাম ঠিক করে দেন। পরে রাতে নৌযানে করে সেই পাট নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এতে কৃষকের পরিবহন ঝামেলাও কমে যায়।
তবে এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা স্থানীয় বৈধ পাট ব্যবসায়ীদের। তাঁদের অভিযোগ, তাঁরা নিয়ম মেনে হাট থেকে পাট সংগ্রহ করেন এবং বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেন। কিন্তু পাচারকারীরা কৃষকদের বেশি দাম দেওয়ার সুযোগ পেলে স্থানীয় বাজারে পাটের সরবরাহ কমে যায়। এতে বৈধ ব্যবসায়ীদের ব্যবসা সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি বাজারব্যবস্থায়ও অস্থিরতা তৈরি হয়।
কুড়িগ্রামের সবচেয়ে বড় পাটের বাজারগুলোর একটি যাত্রাপুর হাট। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, মৌসুমে সপ্তাহের নির্দিষ্ট হাটের দিনে এখানে কয়েক হাজার মণ পাটের বেচাকেনা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে হাটে পাটের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ব্যবসায়ীদের একটি অংশ মনে করছেন, সীমান্তের ওপারে পাচারের কারণে স্থানীয় বাজারে পাটের পরিমাণ কমে যাওয়ার বিষয়টি এর অন্যতম কারণ হতে পারে।
পাট ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ আল মামুনের ভাষ্য, নদীপথে যেভাবে পাট দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, তাতে সাধারণ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বৈধভাবে পাট রপ্তানি হলে ব্যবসায়ী, কৃষক ও সরকার—সব পক্ষই লাভবান হতে পারে। কিন্তু চোরাচালানের মাধ্যমে পাট সীমান্তের ওপারে গেলে ব্যবসার স্বাভাবিক কাঠামো ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সরকারও রাজস্ব হারায়।
আরেক ব্যবসায়ী শাহানুর ইসলাম বলেন, ভারতীয় ক্রেতাদের বাংলাদেশ থেকে পাট কিনতে হলে বৈধ বাণিজ্যিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই তা করা উচিত। সীমান্তের নদীপথ ব্যবহার করে গোপনে পাট নেওয়ার ঘটনা বন্ধ না হলে দেশের কৃষিপণ্য বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আরও অভিযোগ, রাতের নদীপথে নিয়মিত নজরদারি না থাকায় পাচারকারীরা সুযোগ নিচ্ছে। বিশেষ করে নৌ পুলিশের টহল কম থাকলে কিংবা সীমান্তবর্তী নদীর দুর্গম চরাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি সীমিত থাকলে পাচারকারীদের তৎপরতা বাড়তে পারে।
তবে কুড়িগ্রাম পাট অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পাচারের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের নাম তাঁরা পেয়েছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় এককভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। এ অবস্থায় পাট অধিদপ্তর, বিজিবি, নৌ পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টদের মত।
কুড়িগ্রাম ২২ বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নদীপথে পাট পাচারের বিষয়টি লোকমুখে শোনা গেছে। বিষয়টি জানার পর সীমান্ত এলাকায় টহল বাড়ানো হয়েছে। তবে সরাসরি পাট পাচারের দৃশ্য বা চালান আটক করার তথ্য তাঁদের কাছে নেই বলে জানানো হয়েছে। পাচারের সময় নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী।
এই অবস্থায় নদীপথে পাট পাচারের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র নিরূপণে আরও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে রাতের বেলায় গুরুত্বপূর্ণ নদীঘাট ও সীমান্তসংলগ্ন নৌপথে টহল জোরদার করা গেলে অবৈধভাবে পাট পরিবহনের সুযোগ কমতে পারে। একই সঙ্গে সন্দেহজনক নৌযানের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মিত তল্লাশির ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী অর্থকরী ফসল এবং একসময় দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল। বর্তমানে পাট ও পাটজাত পণ্যের বাজারে নানা পরিবর্তন এলেও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর গুরুত্ব এখনও রয়েছে। বিশেষ করে কুড়িগ্রামের মতো নদীবেষ্টিত জেলায় বহু কৃষক পাট চাষের ওপর নির্ভরশীল। পাটের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাজার ও পরিবহন খাতও উপকৃত হয়।
কিন্তু উৎপাদিত পাট বৈধ বাজারের বাইরে চলে গেলে দীর্ঘমেয়াদে কৃষি অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। সীমান্তবর্তী এলাকায় পাচার বাড়লে স্থানীয় হাটে পাটের সরবরাহ কমে যেতে পারে এবং বৈধ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে পাটের বাজারদর ও সরবরাহব্যবস্থায় অস্বাভাবিকতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাচার বন্ধ করতে শুধু সীমান্তে পাহারা বাড়ালেই হবে না। কৃষক যেন স্থানীয় বাজারে উৎপাদিত পাটের ন্যায্য মূল্য পান, সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বৈধ বাজারে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়া গেলে সীমান্তবর্তী কৃষকরা বিকল্প ক্রেতার দিকে ঝুঁকতে পারেন। তাই কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাট বিপণন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি সীমান্তবর্তী নদীপথে বৈধ বাণিজ্যের সুযোগ ও অবৈধ বাণিজ্যের পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি। বৈধভাবে রপ্তানির মাধ্যমে ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশের পাট পৌঁছালে কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়েই উপকৃত হতে পারেন এবং সরকারও রাজস্ব পেতে পারে। কিন্তু চোরাচালানের মাধ্যমে পাট চলে গেলে সেই অর্থনৈতিক সুবিধার বড় অংশ দেশের বাইরে চলে যায়।
স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। দ্রুত বেশি লাভের আশায় অবৈধ পথে পাট বিক্রি করলে সাময়িকভাবে কৃষক লাভবান হলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় বাজার দুর্বল হয়ে যেতে পারে। বাজারে প্রতিযোগিতা কমে গেলে ভবিষ্যতে কৃষককেই কম দামের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে টহল বাড়ানোর কথা জানানো হলেও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু ঘোষণায় নয়, নিয়মিত মাঠপর্যায়ের নজরদারির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। বিশেষ করে রাতের নদীপথে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা গেলে পাচারের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের কৃষকের ঘামে উৎপাদিত পাট দেশের অর্থনীতির সম্পদ। সেই পাট যদি রাতের আঁধারে সীমান্ত পেরিয়ে চলে যায়, তাহলে ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন কৃষক, বৈধ ব্যবসায়ী এবং রাষ্ট্র—তিন পক্ষই। তাই পাচারের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং একই সঙ্গে কৃষকের জন্য ন্যায্য ও লাভজনক বৈধ বাজার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
নদীঘেরা কুড়িগ্রামের রাতের অন্ধকারে পাটবাহী নৌকার চলাচল নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত এবং কার্যকর নজরদারিই পারে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র সামনে আনতে। কৃষকের সোনালি আঁশ যেন বৈধ পথে বাজারে পৌঁছে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে—এটাই এখন সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা।