চাহিদার সঙ্গে মিলছে না সারের বরাদ্দ, বিপাকে কৃষক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৯ বার
চাহিদার সঙ্গে মিলছে না সারের বরাদ্দ, বিপাকে কৃষক

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় সারের গুরুত্ব অপরিসীম। ফসলের উৎপাদন বাড়াতে উন্নত বীজ, সেচ ও আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন হয় পর্যাপ্ত ও সময়োপযোগী সার। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কৃষকের যে পরিমাণ সারের প্রয়োজন হচ্ছে, তার সঙ্গে সরকারি বরাদ্দের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কৃষক, সার ডিলার ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের একাংশের অভিযোগ, কৃষি মন্ত্রণালয় এখনো পুরোনো হিসাবের ভিত্তিতেই সারের চাহিদা নির্ধারণ ও বরাদ্দ দিচ্ছে। এতে কোনো কোনো এলাকায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় কৃষকের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে একই জমিতে বছরে একাধিকবার ফসল চাষের প্রবণতা বেড়েছে। ধান ছাড়াও শাকসবজি, আলু, ফলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের আবাদ বিস্তৃত হয়েছে। পাশাপাশি মাছ চাষ, পোলট্রি ও অন্যান্য কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারও সারের ব্যবহার বাড়িয়েছে। ফলে শুধু আবাদি জমির পরিমাণ দিয়ে বর্তমান সারের চাহিদা নির্ধারণ করলে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে হিসাবের পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

কৃষি খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অভিযোগ, আগের বছরগুলোর অঞ্চলভিত্তিক বরাদ্দের কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন না এনে চলতি অর্থবছরেও অনেক এলাকায় প্রায় একই পরিমাণ সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কোথাও সামান্য বাড়ানো হলেও আবার কোনো কোনো এলাকায় বরাদ্দ কমেছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে কৃষি মন্ত্রণালয় এ অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, দেশের মোট আবাদি জমির পরিমাণে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। নতুন কোনো ভূখণ্ড কৃষি মানচিত্রে যুক্ত না হওয়ায় আগের হিসাবের ভিত্তিতে সারের চাহিদা নির্ধারণের যৌক্তিকতা রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা একই সঙ্গে বলছেন, দেশে সার সংকট নেই; বরং কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজারে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশের প্রধান ধান উৎপাদন মৌসুমগুলোর মধ্যে আমন, বোরো ও আউশ অন্যতম। সংশ্লিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসব মৌসুম মিলিয়ে বছরে প্রায় ১১০ থেকে ১১৫ লাখ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়। এর মধ্যে আমন ধানের আবাদ প্রায় ৫৭ থেকে ৫৮ লাখ হেক্টর, বোরো প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর এবং আউশ প্রায় ১০ থেকে ১৩ লাখ হেক্টর জমিতে হয়ে থাকে। কিন্তু কৃষি উৎপাদনের সামগ্রিক চিত্র শুধু ধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অন্যান্য ফসলের আবাদ বাড়ার বিষয়টিও সারের চাহিদা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সার ব্যবসায়ীদের সংগঠনের নেতারা বলছেন, বর্তমান কৃষি বাস্তবতায় একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদন এবং উচ্চফলনশীল জাতের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় জমিতে সারের প্রয়োগও বাড়ছে। ফলে কয়েক বছর আগের উৎপাদন কাঠামোর ভিত্তিতে বর্তমান চাহিদা নির্ধারণ করলে প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ কম হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাদের মতে, অঞ্চলভিত্তিক কৃষি উৎপাদনের ধরন, ফসলের সংখ্যা, জমির ব্যবহার এবং মৌসুমি পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিত জরিপের মাধ্যমে সারের চাহিদা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

বরাদ্দের তথ্য পর্যালোচনাতেও বিভিন্ন জেলার মধ্যে অসামঞ্জস্যের অভিযোগ সামনে এসেছে। রাজশাহী জেলায় গত অর্থবছরে ইউরিয়ার যে পরিমাণ বরাদ্দ ছিল, চলতি অর্থবছরেও তা একই রাখা হয়েছে। টিএসপি ও এমওপির ক্ষেত্রেও বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। সাতক্ষীরা, কিশোরগঞ্জ, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মতো জেলাতেও বরাদ্দের চিত্র প্রায় অপরিবর্তিত বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে গাজীপুরে ইউরিয়ার বরাদ্দ কমানো হয়েছে। আগের বরাদ্দ প্রায় ২১ হাজার টন থেকে কমিয়ে চলতি অর্থবছরে প্রায় ১৮ হাজার ২০৩ টন করা হয়েছে।

কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বক্তব্যে স্থানীয় কৃষি বাস্তবতার ভিন্ন চিত্রও উঠে এসেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে বড় পরিসরে আমবাগান থাকায় সেখানে প্রচলিত ধান বা অন্যান্য ফসলের তুলনায় ভিন্ন ধরনের সার ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয়। জেলার সার ব্যবসায়ীদের মতে, ‘কাটিমন’ জাতের আমের মতো কিছু জাতের চাষে বছরে একাধিকবার সার প্রয়োগ করতে হয়। ফলে শুধু ধান বা প্রচলিত ফসলের হিসাব ধরে জেলার মোট সারের চাহিদা নির্ধারণ করলে বাস্তব প্রয়োজন পূরণ করা কঠিন হতে পারে।

জয়পুরহাটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের যুক্তি তুলে ধরেছেন স্থানীয় সার ব্যবসায়ীরা। সেখানে আলু উৎপাদনের পাশাপাশি হ্যাচারি, পোলট্রি ও মাছ চাষের বিস্তারের কারণে সারের ব্যবহার বেড়েছে বলে তাদের দাবি। এসব খাতের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে অতিরিক্ত বরাদ্দ না বাড়ালে স্থানীয় বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার পাওয়া নিয়ে কৃষকদের অসন্তোষের খবর সামনে এসেছে। কুড়িগ্রামের রৌমারীতে সার নিতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর এক পর্যায়ে ডিলারের গুদামে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং সেখান থেকে বিপুলসংখ্যক ইউরিয়া সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এর আগে ভূরুঙ্গামারীতেও ডিলারের গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। সারের দাবিতে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে।

তবে এসব ঘটনাকে সরাসরি সার সংকটের প্রমাণ হিসেবে দেখছে না প্রশাসন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোথাও কোথাও অতিরিক্ত ভিড়, গুজব ও বিশৃঙ্খলার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি বা অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

সরকারি হিসাবে, ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ইউরিয়ার মজুত ছিল প্রায় চার লাখ এক টন। একই সময়ে টিএসপি মজুত ছিল প্রায় তিন লাখ ৩৯৬ টন, ডিএপি প্রায় তিন লাখ ৯৭ টন এবং এমওপি প্রায় এক লাখ ৮৫৭ টন। তবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এমওপির মজুত কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। গত বছর একই সময়ে এমওপির মজুত ছিল প্রায় দুই লাখ ৮২৬ টন। ফলে সার সরবরাহের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ করে এমওপি নিয়ে নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সামনের কয়েক মাসের সম্ভাব্য চাহিদা মেটাতে সরকার আমদানির পরিকল্পনাও করেছে। অক্টোবর থেকে আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে বিভিন্ন ধরনের সারের মোট চাহিদা প্রায় ৩৫ দশমিক ৮৭ লাখ টন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে একই সময়ে প্রায় ৩৬ দশমিক ৭৬ লাখ টন সার আমদানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। অর্থাৎ পরিকল্পিত আমদানি সম্পন্ন হলে কাগজে-কলমে চাহিদার তুলনায় কিছুটা বেশি সার সরবরাহের ব্যবস্থা থাকার কথা।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম খান জানিয়েছেন, দেশে সার সংকট নেই এবং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তার দাবি, একটি অসাধু ব্যবসায়ী চক্র বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঠেকাতে নিয়মিত বাজার তদারকি, অভিযান, জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বাজার নিয়ন্ত্রণে উপজেলা পর্যায়েও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিলারদের বিক্রয়কেন্দ্রে কৃষি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকার মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে কিছু গুদামে পর্যাপ্ত মজুত থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে মূল্যতালিকা না টাঙানো এবং নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগে কয়েকজন ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাকে জরিমানা করা হয়েছে।

তারপরও মাঠে কৃষকের অভিযোগ পুরোপুরি থামছে না। কারণ একজন কৃষকের কাছে সরকারি গুদাম বা জাতীয় পর্যায়ের মজুতের হিসাবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো চাষের সময় প্রয়োজনীয় সার তিনি স্থানীয় বাজারে সময়মতো এবং নির্ধারিত দামে পাচ্ছেন কি না। গুদামে পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও যদি পরিবহন, ডিলার পর্যায়ে বণ্টন, মজুত ব্যবস্থাপনা বা স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দে সমস্যা থাকে, তাহলে কাগজে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও মাঠে সংকট দেখা দিতে পারে।

এ কারণে সার ব্যবস্থাপনায় শুধু জাতীয় মজুতের হিসাব নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রকৃত চাহিদা নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে। কোন এলাকায় কোন ফসল কত জমিতে হচ্ছে, বছরে কতবার আবাদ হচ্ছে, ফসলের ধরন অনুযায়ী কী পরিমাণ সার প্রয়োজন এবং মৌসুমি সময়ে চাহিদা কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা গেলে বরাদ্দ আরও বাস্তবভিত্তিক হতে পারে।

কৃষকের প্রয়োজন ও সরকারি হিসাবের মধ্যে এই ব্যবধান কমানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, অন্যদিকে প্রকৃত চাহিদা যদি আগের তুলনায় বেড়ে থাকে, সেটিও নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সময়মতো পর্যাপ্ত সার নিশ্চিত করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সরকারি ভর্তুকির অপব্যবহার ঠেকানো এবং কৃষকের কাছে ন্যায্য দামে সার পৌঁছে দেওয়াও সমান জরুরি। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই করে সার বরাদ্দের কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করা যায় কি না, সেটিই এখন কৃষি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত