প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বগুড়া জেলা পুলিশে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছে তদন্ত কমিটি। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জেলা পুলিশের ছয় সদস্য, পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের একজন অফিস সহকারী এবং জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের একজন অডিটরের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, বিভিন্ন ধরনের জাল ও অতিরিক্ত বিলের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর গত ২৬ আগস্ট বগুড়ার পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আসাদুজ্জামানকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটি ইতোমধ্যে অভিযুক্তদের প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। একই সঙ্গে তাদের ব্যাংক হিসাব, অনলাইনে দাখিল করা বিল-ভাউচার, সরকারি অনুমোদনের নথি এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তদন্তে যাদের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের অফিস সহকারী রাজিবুল ইসলাম, কনস্টেবল আসাদুজ্জামান আরিফ, আমিরুল ইসলাম, নাসির উদ্দীন, রাজু আহম্মেদ ও সোলাইমান হোসেন, জেলা বিশেষ শাখার এএসআই কমল হোসেন এবং জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের অডিটর ফিরোজ আলম। তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তদন্ত কমিটি নথিপত্র ও আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক মানিকুর রহমান নিয়মিত বিল-ভাউচার যাচাই করতে গিয়ে কয়েকটি নথিতে অসঙ্গতি দেখতে পান। সন্দেহজনক এসব বিলের বিষয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। এরপর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের অফিস সহকারী রাজিবুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জালিয়াতির বিষয়ে তথ্য দেন এবং আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন। তবে অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত এখনো চলমান।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কথিত চক্রটি দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ধরনের ভুয়া ও অতিরিক্ত টিএডিএসহ নানা বিল-ভাউচার অনলাইনে দাখিল করত। এসব বিল যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই না করেই অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হতো বলে অভিযোগ উঠেছে। এরপর অনুমোদিত অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবে জমা পড়ত। পরে সেই অর্থ নগদে তুলে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে গত এক বছরের লেনদেনে বড় ধরনের অস্বাভাবিকতার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে তদন্ত কমিটি। একই সঙ্গে কয়েকটি ব্যাংক হিসাবে আগের বছরগুলোতেও অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে তদন্তকারীরা শুধু সাম্প্রতিক সময়ের লেনদেন নয়, কয়েক বছর ধরে সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাবের গতিবিধিও পর্যালোচনা করছেন।
তদন্ত কমিটির তথ্যমতে, কমিউনিটি ব্যাংকের বগুড়া শাখায় কনস্টেবল আসাদুজ্জামান আরিফের হিসাবে ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রায় এক কোটি ২৮ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। এএসআই কমল হোসেনের হিসাবে গত এক বছরে প্রায় ৩২ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া অন্য কয়েকজন অভিযুক্তের ব্যাংক হিসাবেও ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা করে জমা হওয়ার তথ্য তদন্তকারীদের নজরে এসেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, কথিত জালিয়াতির মূল পরিকল্পনায় থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ না রেখে অন্য পুলিশ সদস্যদের হিসাব ব্যবহার করে থাকতে পারেন। পরে এসব হিসাব থেকে টাকা তুলে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ব্যাংক স্টেটমেন্ট, অর্থ জমার তারিখ, উত্তোলনের সময় এবং সংশ্লিষ্ট বিলের সঙ্গে লেনদেনের সামঞ্জস্য মিলিয়ে দেখার কাজ চলছে।
অভিযুক্ত এএসআই কমল হোসেন তার ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৩২ লাখ টাকা লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। তবে ওই অর্থের উৎস সম্পর্কে তিনি অবগত নন বলে দাবি করেছেন। অন্য এক পুলিশ সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, তার হিসাবে আড়াই লাখ টাকা জমা হয়েছিল। সেখান থেকে তিনি ৫০ হাজার টাকা রেখে বাকি দুই লাখ টাকা রাজিবুল ইসলামের কাছে ফেরত দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কনস্টেবল আসাদুজ্জামান আরিফের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। অফিস সহকারী রাজিবুল ইসলাম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের অডিটর ফিরোজ আলমকে কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি। পরে যোগাযোগ করা হলে তিনিও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধানে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। অভিযুক্তদের বক্তব্য, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, অনলাইনে দাখিল করা বিল-ভাউচার এবং সরকারি অনুমোদনের নথি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সরকারি অর্থ ছাড়ের পুরো প্রক্রিয়া। কোনো বিল তৈরি থেকে শুরু করে তা যাচাই, অনুমোদন এবং ব্যাংক হিসাবে অর্থ পৌঁছানো পর্যন্ত একাধিক ধাপ থাকে। এসব ধাপের কোনো একটিতে যথাযথ যাচাই না হলে ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ ছাড়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই তদন্ত কমিটি শুধু কারা অর্থ পেয়েছেন তা নয়, কীভাবে বিলগুলো অনুমোদনের পর্যায়ে গেল এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কোন পর্যায়ে যাচাইয়ের ঘাটতি ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখছে।
সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় বিল-ভাউচারের স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো বড় প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিভিন্ন ধরনের ভাতা, যাতায়াত ব্যয় ও দাপ্তরিক খরচের বিল নিয়মিত প্রক্রিয়াজাত হয়। এসব নথি যাচাইয়ে সামান্য দুর্বলতাও বড় আর্থিক অনিয়মের সুযোগ তৈরি করতে পারে। বগুড়ার ঘটনাটি সেই ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন সামনে এনেছে।
তদন্তকারীদের কাছে ব্যাংক লেনদেনের তথ্য বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ কোনো ব্যক্তির স্বাভাবিক আয় বা বেতন কাঠামোর সঙ্গে অস্বাভাবিক বড় অঙ্কের লেনদেনের অসামঞ্জস্য থাকলে তার উৎস অনুসন্ধান করা সম্ভব হয়। একইভাবে নির্দিষ্ট সময়ে কোনো বিল অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হিসাবে অর্থ জমা পড়েছে কি না, পরবর্তী সময়ে সেই অর্থ কোথায় গেছে এবং কার হিসাবে স্থানান্তরিত হয়েছে—এসব তথ্যও আর্থিক অনিয়মের প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অভিযুক্তদের কাউকে চূড়ান্তভাবে দোষী বলা যাচ্ছে না। তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট নথি এবং আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণের পরই প্রকৃত দায় নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। তদন্তে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বগুড়া জেলা পুলিশের এই ঘটনায় এখন নজর রয়েছে বিশেষ তদন্ত কমিটির পরবর্তী প্রতিবেদনের দিকে। তদন্তে আরও কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় কি না, আত্মসাৎ করা অর্থের প্রকৃত পরিমাণ কত এবং কথিত জালিয়াতি কত বছর ধরে চলেছে—এসব প্রশ্নের উত্তরও অনুসন্ধান শেষে স্পষ্ট হতে পারে।
সরকারি অর্থের অনিয়মের অভিযোগ শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জনগণের অর্থ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুরক্ষার প্রশ্ন জড়িত। তাই অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছ যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম ঠেকাতে বিল-ভাউচার যাচাই ও অনুমোদন ব্যবস্থায় আরও শক্তিশালী নজরদারি নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।