আওয়ামী লীগ নিয়ে তাহেরের বক্তব্যে সালাহউদ্দিনের আপত্তি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
আওয়ামী লীগ নিয়ে তাহেরের বক্তব্যে সালাহউদ্দিনের আপত্তি

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, দলটির নেতাকর্মীদের বিচার এবং রাজনীতিতে ফিরে আসার সম্ভাবনা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়েছে। মঙ্গলবার সংসদ অধিবেশনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেমের উত্থাপিত ১৪৭ বিধির নোটিশের ওপর আলোচনার সময় এ বিতর্কের সূত্রপাত হয়। বিষয়টি একপর্যায়ে সংসদীয় উত্তেজনায় রূপ নিলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করতে হয়।

বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল সম্প্রতি দেওয়া বিরোধীদলীয় উপনেতা তাহেরের একটি সাক্ষাৎকারের বক্তব্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, তাহের সেখানে এমন মন্তব্য করেছেন যে আওয়ামী লীগের লোকজন রাজনীতি করতে চাইলে তাতে আপত্তির কারণ থাকার কথা নয়। তবে তাহের তাৎক্ষণিকভাবে আপত্তি জানিয়ে বলেন, তাঁর বক্তব্যের একটি অংশ তুলে ধরে পুরো বক্তব্যের ভিন্ন অর্থ তৈরি করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের মূল অবস্থান ছিল—কোনো রাজনৈতিক দলের রাজনীতি করার অধিকার নিয়ে নীতিগত আপত্তি নেই, কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অপরাধের অভিযোগের বিচার আগে হতে হবে।

সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিরোধীদলীয় উপনেতার আগের মন্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের পলাতক আসামি ও দুর্বৃত্তরা বিভিন্ন এলাকায় মিছিল করছে এবং ঘুরে বেড়াচ্ছে—এমন বক্তব্য তাহের দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নির্বাচনী সময়ের বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গও টেনে আনেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের একপর্যায়ে সংসদে উত্তেজনার পরিস্থিতি তৈরি হয়। তখন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাঁকে আলোচনার নির্ধারিত বিষয়ের মধ্যে থাকার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বিরোধী দলের সদস্যদের ওয়াকআউটের প্রসঙ্গ টেনে স্পিকার বলেন, তিনি আর তাদের ওয়াকআউট দেখতে চান না। সংসদ পরিচালনায় স্পিকারের এই হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতার অবস্থান সম্পর্কে জানতে চান। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের লোকজন রাজনীতি করতে চাইলে বা তারা রাজনীতিতে ফিরে আসতে চাইলে বিরোধী দলের মন্তব্য কী হবে, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বৃহত্তর ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দল নিজেদের মধ্যে বিতর্ক, তর্ক ও মতপার্থক্য প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও ফ্যাসিবাদের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধকে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা দেখা যায়।

পরে স্পিকারের অনুমতি নিয়ে বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর সাক্ষাৎকারের পূর্ণ বক্তব্য তুলে ধরেননি। তাঁর দাবি, বক্তব্যের একটি অংশ আলাদা করে উপস্থাপন করায় তাঁর অবস্থান সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।

তাহের বলেন, আওয়ামী লীগসহ যে কোনো রাজনৈতিক দল রাজনীতি করবে—এতে নীতিগত সমস্যা নেই। তবে তাঁর মতে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যেসব অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর যথাযথ বিচার হতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর রাজনৈতিকভাবে কী হবে, সেটি আলাদা বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও কঠোর অবস্থান তুলে ধরে বলেন, আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিচার হলে আওয়ামী লীগ নামে আর কোনো দল থাকবে না—এমনটাই তিনি বিশ্বাস করেন। তাঁর বক্তব্যে একই সঙ্গে রাজনৈতিক অধিকার ও অপরাধের বিচারকে পৃথক দুটি বিষয় হিসেবে দেখার অবস্থান স্পষ্ট হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে রাজনৈতিক মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। এর আগে সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বণ্টন নিয়েও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা হয়েছিল। সে সময়ও তাহের সংসদীয় রীতি ও বিরোধী দলের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁর অভিযোগের জবাব দিয়েছিলেন।

ফলে আওয়ামী লীগকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংসদীয় বিতর্ককে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন বাকবিতণ্ডা হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম এবং রাজনৈতিক পরিসরে তাদের সম্ভাব্য অবস্থান—এই তিনটি বিষয় এখনো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও বিতর্কিত ইস্যু হিসেবে রয়েছে। সংসদের ভেতরে দুই পক্ষের বক্তব্যেও সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের প্রতিফলন দেখা গেছে।

বর্তমান সংসদীয় বাস্তবতায় আওয়ামী লীগকে ঘিরে আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও আওয়ামী লীগকে ঘিরে রাজনৈতিক ও আইনি অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নির্বাচনের ফলাফলের তথ্যেও দেখা যায়, কক্সবাজার-১ আসনে সালাহউদ্দিন আহমদ এবং কুমিল্লা-১১ আসনে সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের নির্বাচিত হয়েছেন।

একই সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা দুই নেতার মধ্যে আওয়ামী লীগ প্রশ্নে এমন প্রকাশ্য মতপার্থক্য তাই রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে এক পক্ষ যেখানে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের কথা বলছে, অন্য পক্ষ সেখানে রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব ও অপরাধীদের বিচারকে আলাদা করে দেখার যুক্তি দিচ্ছে।

এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য এখন কেবল দলীয় সভা-সমাবেশে সীমাবদ্ধ নেই; জাতীয় সংসদের আনুষ্ঠানিক আলোচনাতেও বিষয়টি সরাসরি উঠে আসছে। ফলে দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, অভিযুক্ত নেতাকর্মীদের বিচার এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ—এসব প্রশ্ন সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সংসদে মঙ্গলবারের ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়কে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে—বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে কীভাবে দেখা হবে এবং দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিচার ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন কীভাবে পৃথক করা হবে, তা নিয়ে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের বক্তব্য সেই মতপার্থক্যকেই সংসদের মেঝেতে প্রকাশ্য রূপ দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত