প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তাঁর আন্তর্জাতিক অবস্থানকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি শেখ ফজলুল করীম মারুফ। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের এই সংকটের একটি টেকসই সমাধান বের করতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন।
বুধবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নিয়মিত সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ প্রত্যাশার কথা জানান। তাঁর মতে, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও জোরালো উদ্যোগ প্রয়োজন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে একজন বাংলাদেশি থাকায় এই সংকট নিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আরও কার্যকরভাবে আকর্ষণ করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
ড. খলিলুর রহমান ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এর আগে ২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ৯৯ ভোট পেয়ে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে পরাজিত করেন। জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রায় চার দশক পর আবারও একজন বাংলাদেশি এই গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর সামনে বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন, মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যু রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো রোহিঙ্গা সংকট। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বিভিন্ন সময়ে বাস্তুচ্যুত হয়ে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। বিশেষ করে ২০১৭ সালের পর কয়েক লাখ রোহিঙ্গার ব্যাপক প্রবেশের ফলে কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকায় বিশ্বের অন্যতম বড় শরণার্থী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে। ফলে তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়টি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে আছে।
শেখ ফজলুল করীম মারুফ তাঁর বক্তব্যে রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কারণে তাদের সংখ্যা আরও বেড়েছে। তাঁর অভিযোগ, রোহিঙ্গাদের একটি অংশের সঙ্গে বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ জড়িয়ে পড়ছে এবং এর প্রভাব কক্সবাজারের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে।
তবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি অংশের বিরুদ্ধে ওঠা অপরাধের অভিযোগকে পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর আরোপ করা নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। শরণার্থী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তা নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ঘটনার ভিত্তিতে আইনগতভাবে তদন্ত ও বিচার করার বিষয়। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী পরিস্থিতির কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চাপ তৈরি হলে সেটিও রাষ্ট্রীয় নীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এই নেতা মনে করেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ওপর নির্ভর না করে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্যে ড. খলিলুর রহমানের নতুন দায়িত্বকে এই আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার একটি সম্ভাবনাময় সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব মূলত বহুপক্ষীয় কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি নেতৃত্বের অবস্থান। এই পদ থেকে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বা দ্বিপক্ষীয় সংকটের সরাসরি সমাধান করার ক্ষমতা নেই। তবে সাধারণ পরিষদের আলোচনায় কোনো ইস্যুকে গুরুত্ব দেওয়া, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমন্বয় বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে সভাপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ফলে রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ বাংলাদেশের সামনে তৈরি হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান অবশ্য সহজ কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগে সম্ভব নয়। নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, অধিকার, প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এবং রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা—সবগুলো বিষয় এর সঙ্গে জড়িত। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফিরে যাওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি না হলে প্রত্যাবাসন কার্যকর ও টেকসই হবে না। এ কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
শেখ ফজলুল করীম মারুফের বক্তব্যে রোহিঙ্গা সংকটের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করা হয়। তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্যের ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে। তাঁর অভিযোগ, বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার প্রত্যাশিত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না।
তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে। সরকারের প্রথম দায়িত্ব জনগণের মৌলিক প্রয়োজন ও জীবনযাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তিনি সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সভায় নগর সেক্রেটারি কে এম শরীয়াতুল্লাহও বক্তব্য দেন। তিনি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সক্ষমতা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও জনজীবনের ওপর এর প্রভাব নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ পায়।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নিয়মিত এই সভায় সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় সাংগঠনিক কার্যক্রম, জনসম্পৃক্ততা এবং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রে এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখা এবং প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর পরিবেশ তৈরিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আরও সক্রিয় করা। কয়েক বছর ধরে শরণার্থী শিবিরে বসবাস করা রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা যেমন মানবিক সংকটকে গভীর করছে, তেমনি আশ্রয়দাতা দেশের ওপরও তৈরি করছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ।
এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে থাকা একজন বাংলাদেশির কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশা থাকাটা স্বাভাবিক। তবে এই প্রত্যাশাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে হলে কূটনৈতিক সমন্বয়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং মিয়ানমারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কার্যকর অংশগ্রহণ প্রয়োজন। শুধু জাতিসংঘের একটি পদে বাংলাদেশি প্রতিনিধির উপস্থিতিই সংকটের সমাধান নিশ্চিত করবে—এমন প্রত্যাশার পরিবর্তে সেই অবস্থানকে কূটনৈতিকভাবে সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শেখ ফজলুল করীম মারুফের বক্তব্য মূলত সেই প্রত্যাশাকেই সামনে এনেছে। তাঁর আহ্বান, ড. খলিলুর রহমান যেন দায়িত্ব পালনের সময় রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করেন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর স্থায়ী সমাধানে নেতৃত্বমূলক ভূমিকা রাখেন।
অন্যদিকে, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান শুধু বাংলাদেশের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি মানবিক নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ করার পাশাপাশি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নও আলোচনায় রাখতে হবে।
ড. খলিলুর রহমানের এক বছরের সভাপতির মেয়াদে রোহিঙ্গা সংকট কতটা অগ্রাধিকার পাবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ কী ধরনের নতুন উদ্যোগ নিতে পারে, তা এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়। তবে বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা যে সংকটটির একটি টেকসই সমাধানের দিকে অগ্রগতি ঘটুক, শেখ ফজলুল করীম মারুফের বক্তব্যে সেই আকাঙ্ক্ষাই স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।