গর্ভবতী কর্মীদের বৈষম্যের অভিযোগে অ্যামাজনের বিরুদ্ধে মামলা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৭ বার
গর্ভবতী কর্মীদের বৈষম্যের অভিযোগে অ্যামাজনের বিরুদ্ধে মামলা

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গর্ভবতী কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না দেওয়া, অতিরিক্ত বিরতি বা চিকিৎসাজনিত ছুটি নেওয়ার কারণে শাস্তির মুখে ফেলা এবং চাকরিচ্যুত করার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে অ্যামাজনের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাবিত দেশব্যাপী শ্রেণি-অ্যাকশন মামলা হয়েছে। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের ফেডারেল আদালতে চার সাবেক গুদামকর্মী মঙ্গলবার মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, গর্ভবতী কর্মীদের জন্য আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কর্মক্ষেত্রের সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানটি।

মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় Pregnant Workers Fairness Act এবং নিউইয়র্কের শ্রমিক সুরক্ষা আইনের আওতায় আনা হয়েছে। বাদীপক্ষের অভিযোগ, অ্যামাজনের বিভিন্ন গুদামে গর্ভবতী কর্মীদের দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে কাজ করার চাপ, পর্যাপ্ত পানি পান ও শৌচাগার ব্যবহারের বিরতি, বসার সুযোগ এবং প্রসবপূর্ব চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্টে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ছুটির মতো মৌলিক সুবিধা পেতে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে।

চার সাবেক কর্মীর করা মামলাটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতিপূরণের দাবি নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অ্যামাজনের গর্ভবতী কর্মীদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন তুলেছে। বাদীপক্ষ দাবি করেছে, একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন আরও অনেক বর্তমান ও সাবেক কর্মী। সে কারণে মামলাটি দেশব্যাপী শ্রেণি-অ্যাকশন হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গর্ভাবস্থার কারণে কোনো কর্মীর যদি বসে কাজ করা, অতিরিক্ত বিরতি নেওয়া কিংবা চিকিৎসার জন্য কর্মস্থল থেকে সাময়িকভাবে অনুপস্থিত থাকার প্রয়োজন হতো, সেসব সুবিধা পেতে তাদের কাছ থেকে চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি চাওয়া হতো। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কিছু ক্ষেত্রে কর্মীদের প্রয়োজনীয় বিরতি বা ছুটির সময় তাদের কাজের উপস্থিতি ও কর্মদক্ষতার হিসাবের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে কর্মীদের নির্ধারিত ছুটির সুযোগ দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি চাকরি হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে।

মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, গর্ভাবস্থাজনিত কারণে কর্মীরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সময় কাজে অনুপস্থিত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো। একপর্যায়ে কয়েকজন কর্মীকে চাকরিচ্যুতও করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। বাদীপক্ষের দাবি, এমন নীতির কারণে গর্ভবতী কর্মীদের একদিকে শারীরিক প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ এবং অন্যদিকে চাকরি ধরে রাখার মধ্যে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।

মামলার অন্যতম বাদী উইলামিনা বার্কলে নিউইয়র্কের রচেস্টারে অ্যামাজনের একটি গুদামে কাজ করতেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে গর্ভাবস্থাজনিত একটি জরুরি শারীরিক সমস্যার কারণে তাকে হাসপাতালে নিতে হয়েছিল। বাদীপক্ষের দাবি, ওই অনুপস্থিতির সময়কে অ্যামাজনের কর্মঘণ্টা ও ছুটির নীতির সঙ্গে হিসাব করে পরে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি এবং মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান।

বাদীপক্ষের আইনজীবী ও শ্রমিক অধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য, গর্ভাবস্থা কোনো কর্মীর চাকরি বা আয়ের নিরাপত্তার জন্য শাস্তির কারণ হওয়া উচিত নয়। তাদের মতে, কর্মক্ষেত্রে একজন নারী গর্ভবতী হলে তার স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন অনুযায়ী যুক্তিসংগত সুবিধা দেওয়া শ্রমিক সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে গুদাম বা শারীরিক পরিশ্রমনির্ভর কাজে কর্মরত নারীদের জন্য বসার সুযোগ, পর্যাপ্ত পানি পান, শৌচাগার ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-ছুটি অনেক সময় কেবল সুবিধা নয়, বরং স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয় উপাদান হয়ে দাঁড়ায়।

তবে অ্যামাজন অভিযোগগুলো সরাসরি মেনে নেয়নি। প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র কেলি ন্যান্টেল বলেছেন, মামলায় উপস্থাপিত চার কর্মীর বক্তব্যে ভুল তথ্য রয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় বাদ পড়েছে। অ্যামাজনের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর হাজার হাজার কর্মীকে গর্ভাবস্থাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সুবিধা দিয়ে থাকে এবং গত এক বছরে এ ধরনের অনুরোধের ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশেরও বেশি অনুমোদন করা হয়েছে।

অ্যামাজনের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, কর্মীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। গর্ভাবস্থাসংক্রান্ত সুবিধার ক্ষেত্রেও কর্মীদের প্রয়োজন অনুযায়ী পৃথকভাবে বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি বৈষম্য বা প্রতিশোধমূলক আচরণ সমর্থন করে না বলেও জানিয়েছে। মামলায় উত্থাপিত নির্দিষ্ট ঘটনাগুলো প্রতিষ্ঠানটি অভ্যন্তরীণভাবে পর্যালোচনা করেছে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় বিষয়গুলোর সমাধান হবে বলে জানিয়েছে।

মামলাটি এমন সময়ে সামনে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রে অ্যামাজনের কর্মপরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে কর্মীদের কাজের চাপ, কর্মঘণ্টা, নিরাপত্তা এবং শ্রমিক অধিকার নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। গর্ভবতী ও প্রতিবন্ধী কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিও অতীতে আইনি ও সরকারি পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে।

নিউইয়র্ক ছাড়াও নিউ জার্সিতে অ্যামাজনের বিরুদ্ধে গর্ভবতী ও প্রতিবন্ধী কর্মীদের সঙ্গে বৈষম্যের অভিযোগে আলাদা আইনি পদক্ষেপ রয়েছে। ফলে নতুন মামলাটি অ্যামাজনের কর্মক্ষেত্রের নীতি নিয়ে চলমান বৃহত্তর বিতর্ককে আবারও সামনে এনেছে। শ্রম অধিকারকর্মীদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীসংখ্যা যত বড় হয়, তার কর্মপরিবেশ ও শ্রমনীতি তত বেশি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। তাই বড় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কর্মীদের আইনগত অধিকার বাস্তবায়ন আরও গুরুত্বপূর্ণ।

গর্ভবতী কর্মীদের অধিকার রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রে Pregnant Workers Fairness Act বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আইনটির আওতায় যোগ্য কর্মীদের গর্ভাবস্থা, প্রসব এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাগত প্রয়োজনের ক্ষেত্রে যুক্তিসংগত কর্মক্ষেত্রের সুবিধা দেওয়ার বিধান রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, গর্ভাবস্থার কারণে একজন কর্মী যেন অপ্রয়োজনীয়ভাবে চাকরি হারানো, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য বা স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে না পড়েন।

এই আইনের প্রয়োগ ও ব্যাখ্যা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে নীতিগত বিতর্ক রয়েছে। দেশটির Equal Employment Opportunity Commission বা EEOC গর্ভবতী কর্মীদের অধিকারসংক্রান্ত বিধিমালা পর্যালোচনা করছে। ফলে নতুন মামলাটি শুধু অ্যামাজনের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচারিক বিষয় নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের কর্মক্ষেত্রে গর্ভবতী নারীদের সুরক্ষা কতটা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে আনছে।

মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের বকেয়া বেতন ও সুবিধার ক্ষতিপূরণ, শাস্তিমূলক ক্ষতিপূরণ এবং অ্যামাজনের কথিত বৈষম্যমূলক নীতি পরিবর্তনের নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। তবে আদালত এখনো এসব অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। মামলার পরবর্তী ধাপে বাদীপক্ষের অভিযোগ, অ্যামাজনের জবাব এবং প্রমাণ-উপাত্ত পর্যালোচনা করে আদালত বিষয়টি এগিয়ে নেবে।

এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কর্মক্ষেত্রে গর্ভবতী নারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্ন। কর্মজীবী নারীর মাতৃত্বকালীন সময়কে কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠান বিবেচনা করছে, তা শুধু শ্রম আইন মানার বিষয় নয়; এটি কর্মপরিবেশের মানবিকতা ও দায়িত্বশীলতারও প্রতিফলন। বিশেষ করে শারীরিক পরিশ্রমনির্ভর কর্মক্ষেত্রে একজন গর্ভবতী কর্মীর স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনকে উপেক্ষা করা হলে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি অনাগত সন্তানের স্বাস্থ্যের ওপরও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের বড় করপোরেশনগুলোতে গর্ভবতী কর্মীদের জন্য বাস্তবসম্মত ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। একই সঙ্গে অ্যামাজনের দাবি—তারা বিপুলসংখ্যক কর্মীকে গর্ভাবস্থাসংক্রান্ত সুবিধা দিয়ে থাকে—মামলার অভিযোগের সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিও আইনি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

শেষ পর্যন্ত এই মামলার ফলাফল শুধু চার সাবেক কর্মীর ক্ষতিপূরণ বা চাকরিচ্যুতির অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আদালতের সিদ্ধান্ত অ্যামাজনের মতো বিশাল প্রতিষ্ঠানে গর্ভবতী কর্মীদের অধিকার, যুক্তিসংগত সুবিধা এবং কর্মক্ষেত্রের নীতিমালার ওপর ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত প্রভাব ফেলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত