সিডনির ক্যামডেন কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়র বাংলাদেশি এলিজা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
সিডনির ক্যামডেন কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়র বাংলাদেশি এলিজা

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নতুন এক মাইলফলক গড়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এলিজা আজাদ রহমান। নিউ সাউথ ওয়েলসের দক্ষিণ-পশ্চিম সিডনির ক্যামডেন কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার রাতে কাউন্সিলের সাধারণ সভায় সহকর্মী কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে এই দায়িত্ব পান এলিজা। তাঁর এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকারে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারীর নেতৃত্বের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।

ক্যামডেন কাউন্সিলের নর্থ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এলিজা রহমান ২০২৪ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রথমবারের মতো কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি নেতৃত্বের পদে উঠে আসাকে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সভায় ভিন্স ফেরেরিকে মেয়র নির্বাচিত করা হয়। নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে ক্যামডেনের স্থানীয় উন্নয়ন, অবকাঠামো ও নাগরিকসেবায় কাজ করার দায়িত্ব এখন এলিজার ওপরও পড়েছে।

ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর এলিজা আজাদ রহমান নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তাঁর ভাষায়, কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে এই দায়িত্ব পাওয়া যেমন সম্মানের, তেমনি স্থানীয় নাগরিকদের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাও আরও বেড়েছে। নতুন পদে তিনি ক্যামডেনের মানুষের জন্য আরও বিস্তৃত পরিসরে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ক্যামডেন কাউন্সিল গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশাসনিক কাঠামো। দ্রুত জনসংখ্যা বাড়তে থাকা এই এলাকায় আবাসন, সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা, পরিবহন, নাগরিকসেবা, পরিবেশ এবং স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানা বিষয়ে কাউন্সিল কাজ করে। ফলে ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব শুধু আনুষ্ঠানিক নয়; স্থানীয় জনগণের প্রয়োজন ও প্রত্যাশা প্রশাসনের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও এই পদটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

এলিজা আজাদ রহমানের শিকড় বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গার দর্শনায়। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আজাদুল ইসলামের মেয়ে। দুই দশকেরও বেশি সময় আগে শিক্ষার্থী হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। বিদেশে পড়াশোনা ও বসবাসের পাশাপাশি ধীরে ধীরে স্থানীয় সমাজ ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং একপর্যায়ে অস্ট্রেলিয়ার লেবার পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

প্রবাসজীবনের শুরু থেকে স্থানীয় রাজনীতির নেতৃত্বে উঠে আসার পথটি সহজ ছিল না বলে জানিয়েছেন এলিজা নিজেই। তাঁর মতে, একজন বাংলাদেশি হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক পরিসরে নিজের অবস্থান তৈরি করতে দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আস্থা অর্জন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা এগিয়েছে।

২০২৪ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্যামডেন কাউন্সিলের নর্থ ওয়ার্ড থেকে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের যাত্রা শুরু হয়। কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে স্থানীয় অবকাঠামো, নাগরিকসেবা ও কমিউনিটির বিভিন্ন প্রয়োজন নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। কাউন্সিলের সাম্প্রতিক নথিতেও এলিজা রহমানকে নর্থ ওয়ার্ডের নির্বাচিত কাউন্সিলর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয় সরকারে এলিজার উত্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর নারী নেতৃত্ব। অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক সমাজে অভিবাসী নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন নারীর স্থানীয় সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি পদে উঠে আসা নতুন প্রজন্মের অভিবাসী নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ তৈরি করেছে।

এলিজা মনে করেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বে নারীদের আরও বেশি অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বিশেষ করে অভিবাসী পরিবার থেকে আসা নারীদের নেতৃত্বে এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে পরিবার, কমিউনিটি ও সামাজিক সংগঠনের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন। তাঁর নিজের ক্ষেত্রেও পরিবারের সমর্থনকে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন তিনি।

এলিজার ভাষ্য অনুযায়ী, স্বামী ও সন্তানসহ পরিবারের সদস্যরা তাঁর রাজনৈতিক পথচলায় নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা করেছেন। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের মানুষের সমর্থন তাঁকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছে। মানুষের এই আস্থা ও সমর্থনকেই নিজের রাজনৈতিক পথচলার বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখেন তিনি।

ক্যামডেন কাউন্সিলে তাঁর কাজের স্বীকৃতিও এর আগে এসেছে। সম্প্রতি নিউ সাউথ ওয়েলসের সেরা কাউন্সিল হিসেবে ক্যামডেন কাউন্সিল মর্যাদাপূর্ণ এ আর ব্লুয়েট মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে। দ্রুত পরিবর্তনশীল ও সম্প্রসারণশীল একটি স্থানীয় সরকার এলাকায় কাউন্সিলের উন্নয়ন কার্যক্রম এবং নাগরিকসেবার মান ধরে রাখার বিষয়টি স্থানীয় নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন ডেপুটি মেয়র হিসেবে এলিজার সামনে সেই কাজ আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ক্যামডেন এলাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠার ফলে সড়ক, গণপরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিনোদন এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধার চাহিদা বাড়ছে। স্থানীয় সরকারের দায়িত্বশীল পদে থেকে এসব বিষয়ে নাগরিকদের প্রয়োজন তুলে ধরার পাশাপাশি রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করাও এলিজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হতে পারে।

এলিজার নির্বাচনে অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যেও ব্যাপক আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। সিডনিতে বসবাসরত বাংলাদেশিরা মনে করছেন, স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁর উপস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেকের আশা, এলিজা তাঁর নতুন দায়িত্বের মাধ্যমে অভিবাসী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সমস্যা ও প্রত্যাশা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরতে পারবেন। বিশেষ করে বহুসাংস্কৃতিক সমাজে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, অন্তর্ভুক্তি এবং স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ অবশ্য একেবারে নতুন নয়। এর আগে সিডনির বিভিন্ন স্থানীয় কাউন্সিলে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তিরা কাউন্সিলর ও ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৩ সালে মাসুদ খলিল ক্যাম্বেলটাউন সিটি কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হয়ে এই ধারায় গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করেন। এরপর আরও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তিরা স্থানীয় সরকারে নেতৃত্বের বিভিন্ন পর্যায়ে উঠে এসেছেন।

তবে এলিজার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে নারী নেতৃত্বের বিষয়টি। তাঁর আগে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারীরাও অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। কিন্তু ডেপুটি মেয়রের মতো নেতৃত্বের পদে এলিজার নির্বাচন বাংলাদেশি-অস্ট্রেলিয়ান নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এলিজার এই সাফল্য একই সঙ্গে প্রবাসী জীবনের একটি বৃহত্তর বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। অভিবাসীরা শুধু নতুন দেশে বসবাস ও কর্মসংস্থানের অংশীদার নন, সময়ের সঙ্গে তাঁরা স্থানীয় সমাজ, অর্থনীতি ও প্রশাসনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বে তাঁদের অংশগ্রহণ সেই সামাজিক অন্তর্ভুক্তিরই একটি দৃশ্যমান প্রকাশ।

ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের পর এলিজা জানিয়েছেন, তিনি নতুন পদকে ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে না দেখে জনগণের সেবা করার আরও বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন। ক্যামডেনের স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য কাজ করা এবং কাউন্সিলের সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার প্রত্যয়ও জানিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ থেকে বহু দূরে অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকারে এলিজা আজাদ রহমানের এই সাফল্য তাই কেবল একজন প্রবাসী নারীর ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়। এটি অভিবাসী সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, নারীর নেতৃত্ব এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজে বাংলাদেশিদের ক্রমবর্ধমান প্রতিনিধিত্বেরও একটি প্রতিচ্ছবি। দর্শনা থেকে অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকারের নেতৃত্বে উঠে আসা এলিজার এই যাত্রা ভবিষ্যতে আরও বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীকে জনসেবা ও রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার অনুপ্রেরণা দেবে—এমন প্রত্যাশাই এখন তাঁর কমিউনিটির মানুষের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত