যুক্তরাষ্ট্রের গ্রীষ্মকালীন বক্স অফিসে নতুন রেকর্ড

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
যুক্তরাষ্ট্রের গ্রীষ্মকালীন বক্স অফিসে নতুন রেকর্ড

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিনেমা হলের ব্যবসা ঘিরে নানা অনিশ্চয়তার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের গ্রীষ্মকালীন বক্স অফিসে তৈরি হয়েছে নতুন ইতিহাস। চলতি বছরের ১ মে থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটির প্রেক্ষাগৃহগুলোতে টিকিট বিক্রি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘ ১৩ বছর পর গ্রীষ্মকালীন বক্স অফিসের আগের রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে হলিউডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মৌসুম।

গ্রীষ্মকালীন বক্স অফিসে আগের সর্বোচ্চ আয় হয়েছিল ২০১৩ সালে। সে বছর মে মাসের শুরু থেকে লেবার ডে পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার প্রেক্ষাগৃহে টিকিট বিক্রি থেকে আয় হয়েছিল প্রায় ৪ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। আয়রন ম্যান ৩, ডেসপিকেবল মি ২ এবং ম্যান অব স্টিলের মতো জনপ্রিয় সিনেমা সে সময় দর্শকদের হলমুখী করতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। এক দশকের বেশি সময় পর এবার সেই অঙ্ক সামান্য ছাড়িয়ে গেছে।

তবে নতুন রেকর্ডটি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রাখা জরুরি। ২০১৩ সালের আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করা হয়নি। একই সঙ্গে চলতি বছরের গ্রীষ্মকালীন বক্স অফিসের সময়কাল ছিল ১৩০ দিন, যেখানে ২০১৩ সালে ছিল ১২৩ দিন। লেবার ডে ক্যালেন্ডারে তুলনামূলক পরে পড়ায় এবার গ্রীষ্মকালীন মৌসুম কয়েক দিন দীর্ঘ হয়েছে। ফলে শুধু মোট আয়ের অঙ্ক দিয়ে দুই বছরের ব্যবসা সরাসরি তুলনা করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। তারপরও বর্তমান বাজার বাস্তবতায় এই রেকর্ডকে চলচ্চিত্র ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

চলতি বছরের বক্স অফিসের বিশেষত্ব শুধু মোট আয়েই সীমাবদ্ধ নয়। প্রথমবারের মতো গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে মে, জুন, জুলাই ও আগস্ট—টানা চার মাসের প্রতিটিতেই মাসিক বক্স অফিস আয় এক বিলিয়ন ডলারের সীমা ছাড়িয়েছে। মে মাসে আয় হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার। জুনে তা দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলারে। জুলাইয়ে আয় বেড়ে হয়েছে ১ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। সবচেয়ে বড় মাস ছিল আগস্ট, যখন বক্স অফিস থেকে এসেছে প্রায় ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার।

হলিউডে মে মাসের শুরু থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম সোমবার লেবার ডে পর্যন্ত সময়কে সাধারণত গ্রীষ্মকালীন বক্স অফিস মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বছরের মোট বক্স অফিস আয়ের বড় একটি অংশ এই সময়ের ওপর নির্ভর করে। স্কুল-কলেজের ছুটি, দীর্ঘ দিনের অবসর এবং বড় বাজেটের বিনোদনধর্মী সিনেমার মুক্তির কারণে ঐতিহাসিকভাবেই গ্রীষ্মকাল হলিউডের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সময়গুলোর একটি।

করোনাভাইরাস মহামারির পর সিনেমা হলের ব্যবসা আগের অবস্থানে ফিরতে দীর্ঘ সময় নিয়েছে। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের বিস্তার, সিনেমা মুক্তির নতুন কৌশল এবং দর্শকদের বিনোদন গ্রহণের পরিবর্তিত অভ্যাস প্রেক্ষাগৃহ ব্যবসার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সেই বাস্তবতায় চলতি বছরের গ্রীষ্মকালীন বক্স অফিসে চার বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হওয়াকে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।

মহামারির পর এর আগে একবারই গ্রীষ্মকালীন বক্স অফিস চার বিলিয়ন ডলারের সীমা ছাড়িয়েছিল। ২০২৩ সালে বার্বি ও ওপেনহাইমারকে ঘিরে দর্শকদের ব্যাপক আগ্রহের ফলে ওই মৌসুমে আয় হয়েছিল প্রায় ৪ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার। মহামারির আগের সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে ২০১৯ সালেও অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেমের মতো বড় ছবির সাফল্যে গ্রীষ্মকালীন আয় প্রায় ৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল।

এবারের সাফল্যের কেন্দ্রে রয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজিনির্ভর কয়েকটি বড় সিনেমা। দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত চরিত্র ও জনপ্রিয় সিরিজের নতুন কিস্তির প্রতি দর্শকদের আগ্রহ যে এখনও শক্তিশালী, চলতি মৌসুমের ব্যবসা তারই ইঙ্গিত দিয়েছে। টয় স্টোরি ৫, দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা ২-এর মতো পরিচিত নামের পাশাপাশি নতুন ধরনের গল্প ও তরুণ দর্শকদের আকৃষ্ট করা কয়েকটি সিনেমাও ব্যবসায় ভালো করেছে।

তবে এবারের গ্রীষ্মকালীন বক্স অফিসের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে উঠে এসেছে সনি ও মার্ভেলের স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে। মুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সিনেমাটি প্রায় ৯২৩ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারসহ বিশ্বব্যাপী এর আয় প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। জনপ্রিয় সুপারহিরো চরিত্র স্পাইডার-ম্যানকে ঘিরে দর্শকদের দীর্ঘদিনের আগ্রহ নতুন এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলানের দ্য অডিসি সিনেমা থেকে। হোমারের মহাকাব্য ওডিসির কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্র দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। উত্তর আমেরিকার বাজারে সিনেমাটির আয় প্রায় ৫৮৯ মিলিয়ন ডলার এবং বিশ্বব্যাপী আয় প্রায় ১ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ফলে গ্রীষ্মকালীন বক্স অফিসের সামগ্রিক রেকর্ডে সিনেমাটির অবদানও উল্লেখযোগ্য।

লেবার ডে ঘিরে চার দিনের দীর্ঘ সপ্তাহান্তেও স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে বক্স অফিসের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। সিনেমাটির ধারাবাহিক ব্যবসা বিশেষভাবে নজর কেড়েছে, কারণ এটি টানা ষষ্ঠ সপ্তাহের মতো শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বর্তমান গতি অব্যাহত থাকলে সিনেমাটি স্টার ওয়ার্স: দ্য ফোর্স অ্যাওয়েকেনসের ৯৩৬ মিলিয়ন ডলারের দেশীয় আয়ের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে এই সাফল্যের অর্থ এই নয় যে চলতি মৌসুমে প্রতিটি বড় বাজেটের সিনেমাই প্রত্যাশা পূরণ করেছে। বেশ কিছু উচ্চাভিলাষী প্রকল্পও দর্শকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসা করতে পারেনি। ডিজনির লাইভ-অ্যাকশন মোয়ানা, ডিসি ও ওয়ার্নার ব্রাদার্সের সুপারগার্ল এবং অ্যামাজন এমজিএমের মাস্টার্স অব দ্য ইউনিভার্স তুলনামূলকভাবে দুর্বল ফল করেছে। এতে স্পষ্ট হয়, বড় বাজেট বা পরিচিত ফ্র্যাঞ্চাইজি থাকলেই বক্স অফিস সাফল্য নিশ্চিত হয় না। গল্প, নির্মাণমান, দর্শকের আগ্রহ এবং মুক্তির সময়—সবকিছুর সমন্বয় এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

চলচ্চিত্র ব্যবসার এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় এবারের গ্রীষ্মকালীন রেকর্ড হলিউডের জন্য স্বস্তির খবর। স্ট্রিমিং সেবার বিস্তার সত্ত্বেও দর্শক যে বড় পর্দার অভিজ্ঞতা পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি, শক্তিশালী সিনেমা থাকলে তারা এখনও প্রেক্ষাগৃহে ফিরতে প্রস্তুত—এই মৌসুমের ফলাফল তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

বিশেষ করে স্পাইডার-ম্যানের মতো দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় চরিত্র এবং দ্য অডিসির মতো বড় পরিসরের মৌলিক চলচ্চিত্র একই মৌসুমে শক্তিশালী ব্যবসা করায় বাজারে বৈচিত্র্যের বিষয়টিও সামনে এসেছে। একদিকে ফ্র্যাঞ্চাইজি দর্শকদের টেনে আনছে, অন্যদিকে নতুন নির্মাণ ও বড় গল্পও দর্শকের আগ্রহ তৈরি করতে পারছে।

সামনের মাসগুলোতে এই ধারাবাহিকতা কতটা বজায় থাকে, সেটিই এখন চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য বড় প্রশ্ন। গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে রেকর্ড আয় নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। কিন্তু পুরো বছরের বক্স অফিস পরিস্থিতি বিচার করতে হলে বছরের শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘরানার সিনেমার পারফরম্যান্স, দর্শকের হলমুখী হওয়ার প্রবণতা এবং স্ট্রিমিংয়ের সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহের প্রতিযোগিতা—সবকিছু বিবেচনা করতে হবে।

তারপরও ২০২৬ সালের গ্রীষ্মকাল যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্র ব্যবসার ইতিহাসে আলাদা করে জায়গা করে নিয়েছে। ৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারের টিকিট বিক্রি শুধু একটি নতুন রেকর্ড নয়; এটি এমন এক সময়ে দর্শকদের বড় পর্দায় ফিরে আসার ইঙ্গিত, যখন সিনেমা দেখার অভ্যাস দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন হলিউডের সামনে সেই আগ্রহকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে পরিণত করার চ্যালেঞ্জ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত