প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান বাণিজ্য বিরোধ আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার নির্দিষ্ট কিছু অ্যালকোহলিক পানীয়ের আমদানি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। একই সময়ে কানাডার আরও কিছু পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ এবং দেশটির পণ্যকে মার্কিন সরকারের বড় ধরনের ক্রয়চুক্তি থেকে দূরে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার ৮ সেপ্টেম্বর ঘোষিত নতুন পদক্ষেপকে দুই প্রতিবেশী দেশের কয়েক মাস ধরে চলা বাণিজ্য সংঘাতের সর্বশেষ ও কঠোরতম অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতদিন মূলত শুল্ক আরোপ ও পাল্টা শুল্কের মধ্যেই বিরোধ সীমাবদ্ধ ছিল। এবার নির্দিষ্ট পণ্যের সরাসরি আমদানি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের ঘোষণায় বলা হয়েছে, কানাডা থেকে আমদানি করা নির্দিষ্ট কিছু অ্যালকোহলিক পানীয় ২৯ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে না। এর আগে যেসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছালেও ভোগের জন্য ছাড়পত্র পায়নি, সেগুলোও নতুন বিধানের আওতায় পড়বে। তবে ২৯ সেপ্টেম্বরের আগে আমদানি করা সংশ্লিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে আগের ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের বিধান কার্যকর থাকবে।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালকোহলিক পানীয়ের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, কানাডার বিভিন্ন প্রদেশ ও অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালকোহলিক পানীয়ের ক্রয়, বিতরণ বা খুচরা বিক্রিতে এমন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যা অন্যান্য দেশের পণ্যের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না। ট্রাম্প প্রশাসন এ অবস্থাকে মার্কিন বাণিজ্যের জন্য বৈষম্যমূলক ও অন্যায্য বলে উল্লেখ করেছে।
তবে কানাডার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশটির সরকার আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা শুল্ককে অযৌক্তিক বলে সমালোচনা করে আসছে। ওয়াশিংটনের ধারাবাহিক পদক্ষেপের জবাবে অটোয়াও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক কার্যকর করেছে। মঙ্গলবার থেকে কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর ১৫, ২৫ ও ৫০ শতাংশ হারে পাল্টা শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ইস্পাত, দুগ্ধজাত পণ্য, গৃহস্থালি সামগ্রী, কৃষি সরঞ্জাম, কাগজ ও ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন পণ্য।
কানাডার পাল্টা পদক্ষেপের ঠিক একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন আমদানি নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আসে। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে এমন প্রকাশ্য বাণিজ্যিক সংঘাত ব্যবসায়ী ও শিল্প খাতের জন্য অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার বিভিন্ন পণ্যের ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপ করেছিল। বিশেষ করে কানাডীয় গাড়ি ও কাঁচামালের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উত্তপ্ত করে। ওয়াশিংটনের যুক্তি ছিল, কানাডার কিছু বাণিজ্যনীতি মার্কিন কোম্পানি ও পণ্যের জন্য অসম প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করছে। ট্রাম্প প্রশাসন সেই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য শুল্ককে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
অন্যদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর সরকার মনে করছে, দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের অর্থনীতি গভীরভাবে পরস্পরনির্ভরশীল হলেও কানাডার জন্য বিকল্প বাজার ও নতুন বাণিজ্য অংশীদার তৈরি করা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও একক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে কানাডাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে—এমন ধারণা থেকেই অটোয়া নতুন অর্থনৈতিক কৌশলের কথা বলছে।
কার্নি স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস করতে গেলে কানাডাকে কিছু মূল্য দিতে হতে পারে। তবে তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও স্বাধীনতা বাড়ানোর সুফল সেই ক্ষতির চেয়ে বেশি হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে কানাডার সরকার মূলত বোঝাতে চাইছে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে শুধু সমঝোতা নয়, নিজেদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও বিকল্প বাজারও শক্তিশালী করতে চায় তারা।
বাণিজ্য বিরোধের প্রভাব ইতোমধ্যে শুধু শুল্কের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ব্যবসায়ী, কৃষক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং ভোক্তাদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। সীমান্তপারের সরবরাহ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের অর্থনীতিকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছে। ফলে একটি দেশের শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব অন্য দেশের উৎপাদক ও ভোক্তার ওপরও পড়তে পারে।
অ্যালকোহলিক পানীয়ের ক্ষেত্রে এই প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কানাডার বিভিন্ন প্রদেশে অ্যালকোহল বিক্রি ও বিতরণের ব্যবস্থাপনা আলাদা হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে এ পণ্য নিয়ে নীতিগত বিরোধ আগেও ছিল। ট্রাম্প প্রশাসন সেই বিরোধকে বাণিজ্যিক চাপ তৈরির যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কানাডীয় কিছু অ্যালকোহল পণ্যের সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট উৎপাদক ও পরিবেশকদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আনতে হতে পারে।
একই সঙ্গে মার্কিন সরকারের সরকারি ক্রয়চুক্তি থেকেও কানাডীয় পণ্য বাদ দেওয়ার উদ্যোগ পরিস্থিতিকে আরও কঠোর করেছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল সার্ভিসেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের দীর্ঘমেয়াদি সরকারি চুক্তির তালিকা থেকে কানাডায় তৈরি পণ্য সরিয়ে নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে শুধু সীমান্ত বাণিজ্য নয়, সরকারি ক্রয় ও শিল্প সরবরাহ ব্যবস্থাতেও বিরোধের প্রভাব পড়তে পারে।
দুই দেশের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উত্তর আমেরিকার সমন্বিত বাণিজ্য ব্যবস্থা। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে মুক্তবাণিজ্য কাঠামো গড়ে উঠেছে, তা তিন দেশের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে গভীরভাবে সংযুক্ত করেছে। বিশেষ করে গাড়ি, কৃষি, জ্বালানি, খাদ্য ও শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রে সীমান্তপারের বাণিজ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য সংঘাত হলে এর প্রভাব শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি পণ্যের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
বিশ্লেষকদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত দুই দেশকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনবে, নাকি বাণিজ্য সংঘাত আরও বিস্তৃত করবে। শুল্কের পাশাপাশি আমদানি নিষেধাজ্ঞা ও সরকারি ক্রয়চুক্তিতে বিধিনিষেধ যুক্ত হওয়ায় সমঝোতার পথ আরও কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে দুই দেশের ব্যবসায়ী মহলের চাপও সরকারগুলোর ওপর বাড়তে পারে, কারণ দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে পুরোপুরি সম্পর্কচ্ছেদের পর্যায়ে দেখা হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার অর্থনীতি এতটাই পরস্পরনির্ভর যে বাণিজ্যিক বিরোধ যতই তীব্র হোক, দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের জন্যই আলোচনার মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন থাকবে। বাণিজ্যিক চাপের পাশাপাশি রাজনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে কিছু নিষেধাজ্ঞা বা শুল্ক পুনর্বিবেচনার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
এই মুহূর্তে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে সবচেয়ে স্পষ্ট যে বিষয়টি সামনে এসেছে তা হলো, কানাডার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে ওয়াশিংটন শুধু শুল্কেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। নির্দিষ্ট পণ্যের আমদানি বন্ধ এবং সরকারি ক্রয়ে কানাডীয় পণ্যের অংশগ্রহণ সীমিত করার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে। বিপরীতে কানাডাও পাল্টা শুল্ক আরোপের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমানোর পথ খুঁজছে।
ফলে উত্তর আমেরিকার দুই ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অ্যালকোহল আমদানি নিষেধাজ্ঞা হয়তো মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের তুলনায় সীমিত একটি পদক্ষেপ, কিন্তু এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য অনেক বড়। আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের সরকার আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ কমাতে পারে কি না, নাকি পাল্টাপাল্টি শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার পরিধি আরও বাড়বে—সেদিকেই এখন নজর থাকবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক মহলের।