সুষ্ঠু স্থানীয় নির্বাচন নিশ্চিতে প্রস্তুত ইসি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
সুষ্ঠু স্থানীয় নির্বাচন নিশ্চিতে প্রস্তুত ইসি

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনও অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্যভাবে আয়োজন করতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে মানদণ্ড ও পেশাদারিত্বের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একই মান বজায় রাখতে চায় কমিশন। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ইসি।

বুধবার রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ অডিটরিয়ামে ‘নির্বাচনি দায়িত্ব পেশাদারির সঙ্গে সম্পাদনের লক্ষ্যে পুলিশের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ’ শীর্ষক একটি প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে সিইসি এসব কথা বলেন। নির্বাচনের সময় মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ব পালনে পেশাদারিত্ব এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।

এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশকে একটি মানসম্মত স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, নির্বাচন আয়োজনকে শুধু ভোটগ্রহণের দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে কমিশন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় স্থানীয় সরকার নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলেও নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে স্থানীয় সরকারের সম্পর্ক আরও সরাসরি। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কার্যক্রম মানুষের রাস্তা, পানি, স্যানিটেশন, স্থানীয় অবকাঠামো, সামাজিক সেবা ও বিভিন্ন নাগরিক সুবিধার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে জনগণের ভোটে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সিইসি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনিক সংস্থাগুলোর প্রতি জনগণের যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তাঁর দাবি, জাতীয় নির্বাচনে প্রশাসনিক সংস্থাগুলো নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। এখন সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একই ধরনের মান বজায় রাখতে হবে।

তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় ভিন্ন ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থী, সমর্থক ও ভোটারদের পারস্পরিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় ব্যক্তিগত বা সামাজিক বিরোধের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অতীতের বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনে সংঘাত, হামলা, ভয়ভীতি এবং প্রাণহানির ঘটনাও দেখা গেছে। এ কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।

এর আগে সিইসি একাধিকবার বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সংঘাতমুক্ত করাই কমিশনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তিনি স্থানীয় নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জিং হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, ঐতিহাসিকভাবে এসব নির্বাচনে সংঘাতের প্রবণতা বেশি থাকায় এবার আগাম প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ভোটার যেন ভয় বা চাপমুক্ত পরিবেশে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন, সেটিই নির্বাচনী ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান পরীক্ষার বিষয়।

সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতির কথাও একাধিকবার সামনে এসেছে। সিইসি জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশনের প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতি নেই। সেপ্টেম্বরের মধ্যে তফসিল ঘোষণা এবং বছরের শেষ দিকে, বিশেষ করে নভেম্বরের শেষ বা ডিসেম্বরের দিকে ভোট শুরু করার সম্ভাবনার কথাও তিনি জানিয়েছেন। তবে চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আবহাওয়া, বন্যাপ্রবণ এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষা, দুর্গাপূজা এবং পরবর্তী সময়ে রমজানের মতো বিভিন্ন বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়ার কথা জানিয়েছে কমিশন।

পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন একাধিক ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারও ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা বিবেচনা করে ধাপে ধাপে ভোট আয়োজনের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে দুর্গম, পাহাড়ি ও বন্যাপ্রবণ এলাকার ভোটের সময় নির্ধারণে স্থানীয় পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতি। ভোটের আগে প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে বিরোধ, প্রচারণাকেন্দ্রিক উত্তেজনা এবং ভোটের দিন কেন্দ্রের নিরাপত্তা—সবকিছু সামাল দিতে পুলিশের দক্ষতা ও সমন্বয় অপরিহার্য। রাজারবাগে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ আয়োজনকে সেই বৃহত্তর প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সিইসি বলেন, প্রতিটি কাজের মূল মাপকাঠি হলো তার ফলাফল। শুধু পরিকল্পনা বা প্রতিশ্রুতি নয়, নির্বাচনের মাঠে তার বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমেই প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হবে। জাতীয় নির্বাচনে প্রশাসনিক সংস্থাগুলো নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করে যে সক্ষমতা দেখিয়েছে, স্থানীয় নির্বাচনেও তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রত্যাশা তাঁর।

নির্বাচনকে ঘিরে জনগণের আস্থা পুনর্গঠনকে কমিশনের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরলেও এ আস্থা ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একটি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর পরবর্তী নির্বাচনে একই মান বজায় রাখা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে কমিশনের সামনে শুধু ভোট আয়োজনের দায়িত্ব নয়, বরং ভোটারদের কাছে নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা আরও শক্তিশালী করার পরীক্ষাও রয়েছে।

রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের দায়িত্বও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করলেও প্রার্থী ও সমর্থকদের আচরণ, প্রচারণার ধরন এবং ফলাফল মেনে নেওয়ার মানসিকতা নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ রাখতে বড় ভূমিকা রাখে। একইভাবে ভোটারদের নিরাপত্তা, সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ এবং পর্যবেক্ষকদের কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করাও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সিইসির বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আরও একটি বড় পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় পর্যায়ের ভোটে আরও বেশি সতর্কতা, সমন্বয় ও পেশাদারিত্ব দেখাতে হবে। বিশেষ করে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, প্রার্থীদের সমান সুযোগ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার নিশ্চয়তা—এই বিষয়গুলোই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে উঠবে।

দেশের সাধারণ মানুষের কাছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়; এটি তাদের নিকটবর্তী জনপ্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ। সেই সুযোগ যদি নিরাপদ, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে নিশ্চিত করা যায়, তাহলে স্থানীয় পর্যায়ে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী হবে। আর যদি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, ভয়ভীতি বা প্রশাসনিক পক্ষপাতের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা জনগণের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এই বাস্তবতায় নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দেওয়া। সিইসি যে ‘সম্মিলিত প্রচেষ্টার’ কথা বলেছেন, তার বাস্তব প্রয়োগই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি হতে পারে। প্রশাসন, পুলিশ, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, ভোটার ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পথ সহজ হবে। কমিশনও সেই লক্ষ্যেই প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত