কাপ্তাই লেকের পানি ছাড়ায় শুষ্ক মৌসুমে সংকটের শঙ্কা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩৯ বার
কাপ্তাই লেকের পানি ছাড়ায় শুষ্ক মৌসুমে সংকটের শঙ্কা

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণের সুযোগ থাকলেও চলতি বছর কাপ্তাই লেকের পানির স্তর সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই একাধিক দফায় পানি ছেড়ে দেওয়ায় আসন্ন শুষ্ক মৌসুম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এভাবে পানি কমতে থাকলে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রয়োজনীয় ইউনিট সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম নগরীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম ওয়াসার দাবি, কাপ্তাই লেকে পানির মজুত কমে গেলে কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে সমুদ্রের লবণাক্ত পানির প্রবেশ বাড়তে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে নগরীর পানি শোধনাগারগুলোর ওপর। লবণাক্ততা বেড়ে গেলে শোধনাগারে পানি পরিশোধনের সক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং নগরবাসীর দৈনন্দিন পানি সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হতে পারে। ওয়াসা বলছে, সম্ভাব্য এই সংকট মোকাবিলায় এখনই পানি সংরক্ষণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নদীর প্রবাহের মধ্যে সমন্বিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

কাপ্তাই লেকের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা প্রায় ১০৯ ফুট। সাধারণত বর্ষা শেষে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানি ধরে রেখে লেকের পানির উচ্চতা ১০৮ ফুটের বেশি রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু চলতি বছর পানির উচ্চতা ১০৫ ফুটের কিছু বেশি হলেই একাধিকবার স্পিলওয়ের ১৬টি জলকপাট খুলে পানি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে লেকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ করেছে ওয়াসা।

ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ কাপ্তাই লেকে পানির উচ্চতা ছিল ১০৫ দশমিক ৫১ ফুট। অথচ আগের কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় এ সময় পানির উচ্চতা সাধারণত ১০৮ ফুটের বেশি থাকার কথা। বর্তমান ধারায় পানি ছাড়ার কার্যক্রম চলতে থাকলে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই পানির স্তর ১০২ ফুটের নিচে নেমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি।

এমন পরিস্থিতিতে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, চট্টগ্রাম নগরীর পানি সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ নগরীর পানি শোধনাগারগুলোর একটি বড় অংশ কর্ণফুলী ও হালদা নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলোর স্বাভাবিক মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি উজানে প্রবেশের ঝুঁকি বাড়ে। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের টারবাইন চালু রেখে কর্ণফুলী নদীতে পর্যাপ্ত পানি প্রবাহ বজায় রাখার বিষয়টি এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ওয়াসা।

২০১৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অন্তত দুটি টারবাইন সচল রাখার নির্দেশনা রয়েছে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে লবণাক্ত পানির প্রবেশ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পানিপ্রবাহ বজায় রাখা। একই সঙ্গে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। লেকের পানির স্তর কমে গেলে ধাপে ধাপে ইউনিট বন্ধ করার প্রয়োজন হয়।

ওয়াসার হিসাব অনুযায়ী, অন্তত দুটি ইউনিট সচল রাখতে থাকলে আগামী এপ্রিলের আগেই কাপ্তাই লেকের পানির স্তর ৭০ ফুটের নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ৭০ ফুটের কাছাকাছি স্তরকে লেকের ডেড স্টোরেজ পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এমন পর্যায়ে পৌঁছালে লেকের পানি ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং এর ওপর নির্ভরশীল বিভিন্ন এলাকার স্বাভাবিক জীবন ও যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও প্রভাব পড়তে পারে।

চলতি বছর পানি ছাড়ার ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ জুলাই থেকে টানা পাঁচ দিন স্পিলওয়ে খুলে পানি ছাড়া হয়। তখন লেকের পানির উচ্চতা ছিল ১০৪ দশমিক ১২ ফুট। পাঁচ দিন পর তা কমে ১০৩ দশমিক ৩৮ ফুটে নেমে আসে। পরে ২৯ আগস্ট পানির উচ্চতা ১০৬ দশমিক ১০ ফুটে উঠলে আবার স্পিলওয়ে খোলা হয়। আট দিন পানি ছাড়ার পর ৬ সেপ্টেম্বর পানির উচ্চতা নেমে আসে ১০৪ দশমিক ৯৮ ফুটে।

এরপর মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে পানির উচ্চতা আবার ১০৫ দশমিক ৫১ ফুটে পৌঁছালে ১১ সেপ্টেম্বর ১৬টি জলকপাট ছয় ইঞ্চি করে খুলে দেওয়া হয়। ওয়াসার দাবি, অতীতে কাপ্তাই লেকের পানির উচ্চতা ১০৮ ফুটের নিচে থাকা অবস্থায় এভাবে বারবার পানি ছেড়ে দেওয়ার নজির নেই। তাই চলতি বছরের পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংস্থাটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম বলেন, হালদা নদীর পানি পরিশোধন করে মোহরা ও মদুনাঘাট শোধনাগারের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১৮ কোটি লিটার পানি চট্টগ্রাম নগরীতে সরবরাহ করা হয়। নদীতে লবণাক্ততা বেড়ে গেলে এসব শোধনাগারের উৎপাদন কমিয়ে দিতে হতে পারে।

তার হিসাবে, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি টারবাইন সচল না থাকলে চট্টগ্রাম নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি লিটার পানির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এই ঘাটতি পূরণের মতো পর্যাপ্ত বিকল্প পানির উৎস বর্তমানে নেই বলেও তিনি জানিয়েছেন। ফলে শুষ্ক মৌসুমে সম্ভাব্য পানি সংকটের বিষয়টি এখন থেকেই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছে ওয়াসা।

ওয়াসার পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে চিঠি দিয়ে উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। ৩০ আগস্ট পিডিবিকে চিঠি দেওয়ার পরও পানি ছাড়ার কার্যক্রম অব্যাহত থাকায় পরে উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওয়াসার কর্মকর্তারা। তাদের বক্তব্য, বর্তমানে সিদ্ধান্ত না বদলালে শুষ্ক মৌসুমে সমস্যার মাত্রা আরও বড় হতে পারে।

তবে পানি ছাড়ার সিদ্ধান্তটি এককভাবে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র বা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের নেওয়া সিদ্ধান্ত নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ম্যানেজার মাহামুদ হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, লেক ম্যানেজমেন্ট সাব-কমিটির সভাপতি রাঙামাটির জেলা প্রশাসক। জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত সাব-কমিটির বৈঠকে লেকের পানির উচ্চতা ১০৫ ফুটের বেশি হলে পানি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পানির উচ্চতার তথ্য নিয়মিত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হচ্ছে।

তার দাবি, পানির উচ্চতা ১০৫ ফুট অতিক্রম করলেই স্পিলওয়ে খোলার জন্য চাপ দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী স্পিলওয়ে খোলার অন্তত আট ঘণ্টা আগে আপস্ট্রিম ও ডাউনস্ট্রিম এলাকার সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অবহিত করার কথা। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর, ওয়াসা ও নৌবাহিনীর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

মাহামুদ হাসান আরও জানান, ২৯ আগস্ট পানির উচ্চতা ১০৫ ফুট অতিক্রম করার পর রাত ১০টায় স্পিলওয়ে খোলার নোটিশ দেওয়ার কথা থাকলেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাত ৮টায় জলকপাট খোলার নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে নির্ধারিত সময়ের আগেই পানি ছাড়ার কার্যক্রম শুরু হয় বলে তিনি জানান।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক ও লেক ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নাজমা আশরাফী অবশ্য বলেছেন, পানি ছাড়ার সিদ্ধান্ত তার একক সিদ্ধান্ত নয়। কাপ্তাই লেকের আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় জনবসতি থাকায় সেখানকার মানুষের নিরাপত্তা, পানির উচ্চতা, বৃষ্টিপাত ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ কারণে প্রতি মাসে সাব-কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

জেলা প্রশাসকের ভাষ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ বৈঠকে কমিটির সম্মিলিত সিদ্ধান্ত ছিল—লেকের পানির উচ্চতা ১০৫ ফুটের ওপরে উঠলে পানি ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে পরিস্থিতি পরিবর্তন হলে সিদ্ধান্তও পরিবর্তন হতে পারে। ১৫ সেপ্টেম্বর ফলোআপ বৈঠকে পানির উচ্চতা বাড়ানোর বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা বাস্তবায়ন করা হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

এখানেই কাপ্তাই লেক ব্যবস্থাপনার মূল চ্যালেঞ্জটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে বর্ষায় অতিরিক্ত পানি জমে গেলে লেকের আশপাশের জনবসতি ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমের জন্য পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখাও জরুরি। একই পানির ওপর বিদ্যুৎ উৎপাদন, নদীর প্রবাহ, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ এবং নগরীর পানি সরবরাহ—বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ভরশীল।

বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে তাই কাপ্তাই লেকের পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। শুধু তাৎক্ষণিক পানির উচ্চতা দেখে জলকপাট খোলা বা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিলে শুষ্ক মৌসুমে তার প্রভাব কী হতে পারে, সেটিও একই সঙ্গে হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। পাশাপাশি লেকের আশপাশের মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার বিষয়টিও উপেক্ষা করা যাবে না।

কাপ্তাই লেকের পানি শুধু একটি জলাধারের পানি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, চট্টগ্রামের কোটি মানুষের পানির চাহিদা, নদীর পরিবেশ এবং লেকপাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা। তাই বর্ষা শেষ হওয়ার আগেই পানির মজুত কতটা রাখা হবে, কখন পানি ছাড়া হবে এবং শুষ্ক মৌসুমে কীভাবে প্রয়োজনীয় প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত সিদ্ধান্ত এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আসন্ন শুষ্ক মৌসুমে চট্টগ্রামবাসীকে সম্ভাব্য পানির সংকট থেকে রক্ষা করতে হলে এখনই সতর্কতা ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন, লেকের নিরাপত্তা এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রেখে পানি ব্যবস্থাপনা করা না গেলে ভবিষ্যতে সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত