সৌদির তিন শহরে হুতি হামলা, আহত ১৩

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৫ বার
সৌদির তিন শহরে হুতি হামলা, আহত ১৩

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সৌদি আরবের তিনটি শহরে ইয়েমেনের সশস্ত্র হুতি গোষ্ঠীর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। সোমবার চালানো এসব হামলায় কয়েকটি আবাসিক ভবন ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। হামলার পর দেশটির কয়েকটি শহরে সতর্কতা জারি করা হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর তা প্রত্যাহার করা হয়েছে।

মঙ্গলবার সকালে দেওয়া এক বিবৃতিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি জানান, সোমবার সৌদি আরবের খামিস মুশাইত, আবহা ও তায়েফ শহরকে লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়। এসব হামলায় আহত ১৩ বেসামরিক নাগরিকের আঘাতকে সামান্য থেকে মাঝারি মাত্রার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাতটি আবাসিক বাড়ি এবং দুটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

হঠাৎ করে একাধিক শহরে বিস্ফোরণ ও হামলার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আবাসিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আঘাত সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে খামিস মুশাইত ও আবহা দীর্ঘদিন ধরেই ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন সংঘাতের প্রভাবে নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এবার তায়েফও হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় পরিস্থিতির বিস্তৃতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি অভিযোগ করেছেন, হুতিরা ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিক ও বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের হামলা বারবার চালানো হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে সৌদি আরবের বেসামরিক জনগোষ্ঠী ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হচ্ছে।

তিনি বলেন, সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, নাগরিক ও বেসামরিক স্থাপনা রক্ষায় জোট প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। আত্মরক্ষার অধিকার এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকেই হামলা প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সামরিক ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

হামলার পর সৌদি সিভিল ডিফেন্স দেশের কয়েকটি শহরে সতর্কতা জারি করে। জেদ্দা, ইয়ানবু, তায়েফ, আবহা, জাজান ও আলউলা শহরের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর হুমকি কেটে গেলে সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়। স্থানীয় প্রশাসন নাগরিকদের নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলার পাশাপাশি হামলার সম্ভাব্য স্থান বা দুর্ঘটনাস্থলে অপ্রয়োজনে ভিড় না করার আহ্বান জানিয়েছে।

তবে হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের পরিস্থিতিও দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। হুতি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনের পাঁচটি প্রদেশে সৌদি যুদ্ধবিমান অন্তত ৫৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে। তাঁর দাবি, এসব হামলায় বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয়েছে এবং সৌদি হামলার জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে হুতি গোষ্ঠী।

হুতিদের পক্ষ থেকে এর আগে সোমবার সকালে খামিস মুশাইতের কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করা হয়েছিল। একই সঙ্গে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও বাড়ানোর হুমকিও দেওয়া হয়। তবে হুতিদের এসব সামরিক দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে কম থাকার পর আবারও তীব্র হচ্ছে। ইয়েমেনের রাজধানী সানা ২০১৪ সালে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত শুরু হয়। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিক অভিযান শুরু করে। এরপর কয়েক বছর ধরে ইয়েমেনে যুদ্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, বিমান হামলা এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় সংঘাত চলেছে।

পরবর্তী সময়ে যুদ্ধের তীব্রতা কিছুটা কমে এলেও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে সাময়িক শান্তির পরিবেশের মধ্যেও দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বজায় ছিল। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিস্থিতি আবারও দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশেষ করে সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন বিমান হামলার ঘটনা সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে।

এই সংঘাতের প্রভাব শুধু সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব প্রণালি এবং মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের নিরাপত্তার সঙ্গেও ইয়েমেনের সংঘাত সরাসরি সম্পর্কিত। এসব অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যেও চাপ তৈরি হতে পারে।

সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশটির গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সামরিক অবস্থানকে ঘিরে হামলা এবং হুমকি বেড়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের জন্য তাই শুধু শহরগুলোর বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা নয়, তেল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে ইয়েমেনের ভেতরেও দীর্ঘ সংঘাতের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ দেশটির অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। নতুন করে সংঘাত বাড়লে বেসামরিক জনগণের দুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সৌদি আরব ও হুতিদের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তাও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো সংঘাতের বিস্তার। একটি হামলার জবাবে পাল্টা হামলা এবং তার প্রতিক্রিয়ায় আবার নতুন সামরিক অভিযান শুরু হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এতে শুধু দুই দেশের মানুষই নয়, পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বলছে, তারা নিজেদের ভূখণ্ড ও নাগরিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। অন্যদিকে হুতিরাও সৌদি হামলার পাল্টা জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে সামনে আবারও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দুই পক্ষের এই অবস্থান সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

সৌদির তিন শহরে সর্বশেষ হামলায় ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হওয়ার ঘটনা তাই শুধু একটি সামরিক হামলার খবর নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বাড়তে থাকা অস্থিরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংঘাতকে আরও বিস্তৃত হওয়া থেকে ঠেকাতে দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘস্থায়ী সামরিক প্রতিশোধের বদলে কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করা না গেলে ইয়েমেন ও সৌদি আরবের সাধারণ মানুষের জন্য এই সংঘাতের মূল্য আরও ভয়াবহ হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত