প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও কার্যকর ও সহজ করার ক্ষেত্রে ভারতে অবস্থানরত পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফেরত দেওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছে সরকার। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ ভারতে অবস্থানরত অন্য আসামিদের বাংলাদেশে ফেরত দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সরকারের এ অবস্থানের কথা জানান।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক সহজীকরণ ও কার্যকর সম্পর্ক জোরদারের স্বার্থে ভারতে অবস্থানরত পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্তদের ফেরত দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনার সময় বাংলাদেশ তার অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
তথ্য উপদেষ্টা জানান, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের সময়ও শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত অন্য আসামিদের দেশে ফেরত আনার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে উত্থাপন করা হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের বাস্তবতা এবং বাংলাদেশের মানুষের সংবেদনশীলতার বিষয়টি ভারত সরকার বিবেচনায় নেবে।
এই বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনা চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে সামনে এসেছে। আগস্টেও বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতকদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের কাছে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছিল বলে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
জাহেদ উর রহমানের বক্তব্যে শুধু শেখ হাসিনার নাম নয়, ভারতে অবস্থানরত অন্য আসামিদের ফেরত দেওয়ার দাবিও উঠে এসেছে। তিনি বলেন, যদি শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়া হয়, তাহলে একই মামলাসংশ্লিষ্ট বা দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থান থাকবে। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের বাইরে অবস্থান করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন, যা বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতিতে প্রভাব ফেলছে।
তবে প্রত্যর্পণের বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে দুই দেশের আইনগত ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়াও জড়িত। কোনো ব্যক্তি এক দেশ থেকে অন্য দেশে অবস্থান করলে তাকে ফেরত আনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, প্রত্যর্পণসংক্রান্ত ব্যবস্থা এবং দুই দেশের পারস্পরিক যোগাযোগের বিষয়গুলো বিবেচনায় আসে। ফলে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি বিষয়টির বাস্তবায়ন নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার অগ্রগতির ওপর।
সরকারের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জাহেদ উর রহমান বলেন, এসব ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না। অভিযুক্তদের আদালতের মুখোমুখি হয়ে বিচারপ্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর বক্তব্যে দেশের বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার বিষয়টিও উঠে আসে। সরকারের অবস্থান হলো, বিচারপ্রক্রিয়া আদালতের মাধ্যমে পরিচালিত হবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা বা অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর নিষ্পত্তি বিচারিক প্রক্রিয়াতেই হবে। ফলে বিদেশে অবস্থানরত অভিযুক্তদের দেশে ফেরানোর দাবি সরকারের বিচার নিশ্চিত করার বৃহত্তর অবস্থানের সঙ্গেও যুক্ত বলে উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয়।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বিভিন্ন মামলার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হওয়া মামলার বিষয়টিও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে। অন্যদিকে ওবায়দুল কাদেরসহ আরও কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধেও মামলা ও আদালতের কার্যক্রম রয়েছে। এসব মামলার আইনগত অবস্থান ব্যক্তি ও মামলাভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশ ও মামলার বর্তমান অবস্থাই চূড়ান্তভাবে বিবেচ্য।
সরকারের এ অবস্থানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। জাহেদ উর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক চায়; তবে সম্পর্ককে আরও সহজ ও কার্যকর করার ক্ষেত্রে ভারতে অবস্থানরত অভিযুক্ত ও দণ্ডপ্রাপ্তদের ফেরত দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে কূটনৈতিক আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে।
এদিকে একই প্রেস ব্রিফিংয়ে গ্রামীণ কল্যাণের কর-সংক্রান্ত মামলাসহ সরকারের বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয় নিয়েও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা। গ্রামীণ কল্যাণের কর-সংক্রান্ত মামলায় সরকারের কোনো হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই বলে তিনি জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারভুক্ত এবং মামলা নিজস্ব গতিতে চলবে। কারও প্রতি সরকারের অনুরাগ বা বিরাগের ভিত্তিতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না বলেও তিনি জানান।
সরকারি দপ্তরে কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ সম্বোধনের বিষয়েও বক্তব্য দেন জাহেদ উর রহমান। তাঁর মতে, কোনো অফিসে নাগরিকদের বাধ্যতামূলকভাবে ‘স্যার’ বলতে হবে—এমন সংস্কৃতির পরিবর্তে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা এবং কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান তথ্য উপদেষ্টা। এসব যানবাহন একেবারে বন্ধ না করে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ও রুটের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অটোরিকশার সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা ও দৈনন্দিন যাতায়াত জড়িত। ফলে একেবারে বন্ধ করে দেওয়ার পরিবর্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং নির্ধারিত রুটের মধ্যে পরিচালনার জন্য একটি নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে মঙ্গলবারের প্রেস ব্রিফিংয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক, বিদেশে অবস্থানরত আসামিদের ফেরত আনা, বিচারপ্রক্রিয়া এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন নীতিগত বিষয় নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্তদের দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিষয়টি ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে উত্থাপন করা হয়েছে বলে সরকারের তথ্য উপদেষ্টা জানিয়েছেন। এখন এ বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া আসে এবং প্রত্যর্পণসংক্রান্ত আলোচনায় পরবর্তী সময়ে কী অগ্রগতি হয়, সেদিকেই নজর থাকবে। একই সঙ্গে যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশে মামলা বা সাজা রয়েছে, তাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে আদালতের সিদ্ধান্ত ও প্রযোজ্য আইনগত প্রক্রিয়াই পরবর্তী পদক্ষেপের ভিত্তি হবে।
সরকারের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিদেশে অবস্থানরত অভিযুক্ত ও দণ্ডপ্রাপ্তদের দেশে ফেরানোর প্রশ্নটি শুধু বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে নয়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আলোচনার সঙ্গেও যুক্ত করা হচ্ছে। তবে এর বাস্তব অগ্রগতি নির্ভর করবে কূটনৈতিক যোগাযোগ, সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া এবং দুই দেশের সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর।