ইউপি ভোটের সময় নিয়ে ইসি-সরকারের মতভেদ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৭ বার
ইউপি ভোটের সময় নিয়ে ইসি-সরকারের মতভেদ

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ ভোটের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের মধ্যে মতপার্থক্যের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। নির্বাচন কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাত ধাপে আয়োজনের একটি সম্ভাব্য সময়সূচি প্রকাশ করার এক দিনের মাথায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে, ওই সময়সূচি ঘোষণার আগে সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। পরে নির্বাচন কমিশনও স্পষ্ট করেছে, ঘোষিত তারিখগুলো চূড়ান্ত নয়; সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা শেষে সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে।

এ নিয়ে প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক এখতিয়ার, নির্বাচনী প্রস্তুতি এবং সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে সমন্বয়ের প্রশ্ন সামনে এসেছে। নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব পালন করলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির সঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে ভোটের দিনক্ষণ নির্ধারণের আগে বাস্তব প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় কতটা প্রয়োজন, তা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সোমবার নির্বাচন কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য সাতটি সম্ভাব্য ধাপের সময় ঘোষণা করে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় প্রথম ধাপের ভোট ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপে ১৩ ডিসেম্বর এবং তৃতীয় ধাপে ৩০ ডিসেম্বর করার কথা বলা হয়। পরবর্তী ধাপগুলোর সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২২ এপ্রিল ও ২৭ মে রাখা হয়েছে। তবে কমিশনের পক্ষ থেকেই পরে জানানো হয়, এগুলো প্রাথমিক প্রস্তাব এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত নেওয়া হবে।

মঙ্গলবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ সম্পর্কে সরকার বা তাঁর মন্ত্রণালয় আগে থেকে অবগত ছিল না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে এ বিষয়ে সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা চিঠি আদান-প্রদান হয়নি। তিনি একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক ক্ষমতার কথাও উল্লেখ করেন। তবে তাঁর বক্তব্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রচলিতভাবে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে সমন্বয় ও প্রস্তুতিমূলক আলোচনা হয়ে থাকে বলেও উঠে আসে।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, ঘোষিত সময়সূচি একেবারেই প্রাথমিক। ১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে বৈঠকের পর ভোটের সময়সূচি চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে—এটি নিশ্চিত; তবে কখন, কোন পদ্ধতিতে এবং কোন পর্যায়ে নির্বাচন হবে, তা নিয়ে তখনও আলোচনা চলছিল।

সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যের এই পার্থক্য থেকেই মূলত সমন্বয়হীনতার প্রশ্নটি সামনে এসেছে। সরকারের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি যখন বলেন, সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার আগে সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়নি, তখন কমিশনের পক্ষ থেকে সময়সূচিকে প্রাথমিক বলে ব্যাখ্যা করার বিষয়টি আলোচনায় আসে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনের বাস্তব প্রস্তুতির জন্য প্রশাসনিক সমন্বয়ের প্রয়োজন—এই দুটি বিষয়কে কীভাবে একসঙ্গে পরিচালনা করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আইনি দিক থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপরই রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন-সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালায় নির্বাচন আয়োজন, পরিচালনা এবং ভোটগ্রহণের তারিখ ও সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে কমিশনের দায়িত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক আইন ও বিধিমালা সংক্রান্ত নথিতেও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন পরিচালনার কাঠামো বিদ্যমান রয়েছে।

তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বাস্তব আয়োজন শুধু ভোটের দিন নির্ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, প্রয়োজনীয় জনবল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বাজেট, নির্বাচনী সামগ্রী, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বয়ের মতো বিষয় এতে যুক্ত থাকে। ফলে নির্বাচন কমিশন আইনগতভাবে সময় নির্ধারণের ক্ষমতা রাখলেও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মতামত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ কারণেই ১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠককে সম্ভাব্য সময়সূচি চূড়ান্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এর আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছিল। আগস্টের শেষ দিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছিলেন, কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রস্তুত এবং সেপ্টেম্বরের মধ্যে সময়সূচি ঘোষণা করার আশা করছে। তিনি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিলেন।

এদিকে সম্ভাব্য সময়সূচির কয়েকটি তারিখ নিয়েও বাস্তব সমস্যা তৈরি হতে পারে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রস্তাবিত ১৩ ডিসেম্বরের তারিখে শিক্ষা কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা থাকার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। একইভাবে ৩০ ডিসেম্বরের তারিখটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক স্মরণীয় দিনের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় কোনো কোনো রাজনৈতিক মহলে আপত্তির বিষয়টি সামনে এসেছে। এসব বিষয় চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ধারণের আগে কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করতে পারে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইউনিয়ন পরিষদ সরাসরি গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় সড়ক, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, জন্মনিবন্ধন, স্থানীয় উন্নয়ন এবং বিভিন্ন নাগরিক সেবার সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম সম্পৃক্ত। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকলে বা নির্বাচন দীর্ঘদিন পিছিয়ে গেলে স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে তার প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে একটি নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে আয়োজনের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতিরও প্রয়োজন রয়েছে। ভোটার তালিকা, কেন্দ্র, আইনশৃঙ্খলা, নির্বাচনী কর্মকর্তা, ব্যালট বা ভোটিং ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের মতো প্রতিটি বিষয় সময়মতো প্রস্তুত করতে হয়। তাই শুধু দ্রুত নির্বাচন আয়োজন নয়, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সময়সূচিকে প্রাথমিক হিসেবে ব্যাখ্যা করার পর ১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ওই বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মতামত নেওয়ার পর কমিশন পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানাবে বলে জানিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের মধ্যে যোগাযোগের ধরনও আলোচনায় এসেছে। কমিশন তার সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব পালন করবে, অন্যদিকে নির্বাচন বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা সহায়তা সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকেই দিতে হবে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে দায়িত্বের সীমা অক্ষুণ্ন রেখে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি এক বিবৃতিতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং সরকারের সঙ্গে কমিশনের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দলটি কমিশনের স্বাধীন ভূমিকা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। তবে এটি রাজনৈতিক দলের একটি মূল্যায়ন; নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক অবস্থান ও বাস্তব কার্যক্রম নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট আইন, সরকারি বক্তব্য এবং কমিশনের সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সাত ধাপের যে সময়সূচি সামনে এসেছে, সেটি চূড়ান্ত তফসিল নয়। কমিশন নিজেই এটিকে প্রাথমিক সময়সূচি হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

ফলে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে প্রকাশ্যে আসা মতপার্থক্যকে আপাতত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সংঘাত হিসেবে দেখার চেয়ে নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় সমন্বয় নিয়ে তৈরি হওয়া একটি বিরোধ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পর সম্ভাব্য তারিখগুলোর পরিবর্তন, সংশোধন বা বহাল রাখার বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে নির্বাচনের ধাপ, ভোটের সময় এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতির বিষয়গুলোও তখন আরও পরিষ্কার হতে পারে।

সব মিলিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি এগোলেও সময়সূচি নিয়ে সরকার ও কমিশনের বক্তব্যে যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে কমিশনের আইনগত দায়িত্ব এবং মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক সমন্বয়ের মধ্যে ভারসাম্য কতটা কার্যকরভাবে তৈরি করা যায়, তার ওপর পরবর্তী প্রক্রিয়ার অনেকটাই নির্ভর করবে। চূড়ান্ত সময়সূচি ঘোষণার পরই এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কমিশনের সমন্বয়ের বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত